• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ২৪ সফর ১৪৩৯
BK

জট খুলছে টিআরএম প্রকল্পের

ভবদহের দুঃখ ঘোচাতে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প
জট খুলছে টিআরএম প্রকল্পের
সংরক্ষিত ছবি

অবশেষে যশোরের দুঃখ ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্পের জট খুলছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় টিআরএম প্রকল্প চালুসহ ভবদহের সার্বিক উন্নয়নে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি যশোর পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী নিশ্চিত করেছেন।  টিআরএম চালুসহ ভবদহ সংলগ্ন নদী ও ছোট-বড় খাল খনন এবং ভেড়িবাঁধ কেটে টিআরএম চালুকরণে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিল ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।

যশোর ও খুলনা জেলার বিল কপালিয়া, বিল ভায়না, বিল খুকশিয়া, বিল বোকড়সহ ২৭ বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রবাহ পথ ভবদহ স্লুইসগেট। ভবদহ স্লুইসগেটের বিপরীত পাশে পলিতে ভরাট হওয়ায় ধীরগতিতে বইছে স্রোত। শ্রীনদী ও ছোট-বড় খালগুলো দিয়ে জোয়ারের পানিতে আসা পলিতে ভরাট হচ্ছে ভবদহ স্লুইসগেট। এর ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই প্রতি বছর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পড়ে ভবদহপাড়ের লাখো গ্রামবাসী।

সরেজমিন ভবদহ এলাকায় গেলে চলতি বর্ষা মৌসুমে ভবদহপাড়ের গ্রামবাসীর চোখে-মুখে অজানা আতঙ্কের চিহ্ন চোখে পড়ে। তবে টিআরএম প্রকল্প চালুর সংবাদ পেলেও যতদিন না এর বাস্তবায়ন হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ভবদহের অভিশাপের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত এই পোড় খাওয়া মানুষ কিছুতেই যেন আশ্বস্ত হতে পারছেন না।

এদিকে ভবদহের ৩ নম্বর ভেন্টের স্লুইসগেটের সামনের অংশে (নদী সংলগ্ন) পলি ভরাট হওয়া এলাকায় এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে পলি অপসারণ করা হচ্ছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভবদহ স্লুইসগেট সংলগ্ন নদী ও খালে জোয়ারের পানির সঙ্গে ঢুকছে প্রচুর পরিমাণে পলি। কিন্তু ভবদহের অপর অংশ (বিল সংলগ্ন) উঁচু হওয়ায় জোয়ারের পানি ঢুকতে না পারলেও পলিতে ভরাট হচ্ছে গেটের সামনের অংশ। এভাবে পলিতে ভরাট হওয়ায় এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে তা অপসারণ করা হচ্ছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীরা এটিকে চুল ছাঁটার সঙ্গে তুলনা করছে।

এ সময় কালিশাকুল গ্রামের মৎস্যজীবী পরিতোষ বিশ্বাস ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, মানুষের মাথার চুল বড় হলে যেভাবে ছাঁটা হয়, সেভাবে গেটের সামনে থেকে পলি অপসারণ করা হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কতদিন- প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, বিল কপালিয়ায় পরিকল্পিত টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। একই মন্তব্য করেন স্থানীয় কাটেঙ্গা গ্রামের ফজর আলী।

কথা হয় ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বায়ালীর সঙ্গে। তিনি শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, এ এলাকায় এখন যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, অচিরেই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ভবদহের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে এ এলাকায় চরম মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন এই সংগ্রামী নেতা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত ৫ বছরে মনিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগরের জাতীয় সংসদ সদস্যরা ভবদহ সঙ্কট নিরসনকল্পে জাতীয় সংসদে একবারও কথা বলেননি। তারা সঙ্কট উত্তরণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, পাইবোর নির্বাহী প্রকৌশলীহ সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। তিনি দাবি করেন, ভবদহ সংলগ্ন বিলের ভেড়িবাঁধ কেটে দিয়ে জোয়ার আধার সৃষ্টি করা হলে নদীগুলো নাব্য ফিরে পাবে। তিনি বিল খুকশিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, ২০০৫ সালে ওই বিলে টিআরএম চালু করা হয়। বর্তমানে ওই বিলে ফসল ফলাচ্ছে কৃষকরা। প্রায় সাড়ে ৪ শ কোটি টাকা ব্যয়ে টিআরএম চালুসহ ভবদহের সার্বিক উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প অনুমোদনের কথা তিনিও শুনেছেন। তবে তিনিও অন্যদের মতো এর বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান রয়েছেন।

সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ ভবদহপাড়ের লাখো জনতাকে বাঁচাতে এখনই বিল কপালিয়ায় টিআরএম চালু করতে সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানান।

যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী ইতোমধ্যে টিআরএম চালুসহ ভবদহ এলাকায় সার্বিক উন্নয়নে প্রায় সাড়ে ৪ শ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আপাতত বন্যার হাত থেকে রক্ষায় পানি নিষ্কাশনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাজেট দিয়ে গেটের সামনের ও পেছনের পলি অপসারণ করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, গত ৮ দিনে যশোরে ২৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে রেকর্ড করা হয়েছে। যা ইতোমধ্যে ভবদহ স্লুইসগেটে পৌঁছেছে বলে তিনি জানান।