• সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১৩ মহররম ১৪৪০
BK

তারল্য সঙ্কটে ১৪ ব্যাংক

বেশিরভাগ ব্যাংকের নিট মুনাফা আগের বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় বেড়েছে
তারল্য সঙ্কটে ১৪ ব্যাংক
প্রতীকী ছবি

চলতি বছরের অর্ধবার্ষিক পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড (এনবিএল) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে ১ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করে। বিপরীতে বিভিন্ন গ্রাহককে ২ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার ঋণ দেয়। এতে বড় ধরনের তারল্য সঙ্কটের মুখে পড়ে ব্যাংকটি। আমানতের চেয়ে ঋণ বিতরণ বেশি হওয়ায় শুধু এনবিএল নয়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ১৪টিই রয়েছে তারল্য সঙ্কটে। মূলত ঋণ বাড়লেও গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ কমায় নগদ প্রবাহে ঋণাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর চলতি বছরের প্রথমার্ধের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।

পর্যালোচনায় আরো দেখা গেছে, ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত তারল্য সঙ্কটে ছিল ১৩ ব্যাংক। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে, যাদের ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে নগদ প্রবাহ ইতিবাচক থাকলেও চলতি বছরের প্রথমার্ধে ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। বিপরীতে সিটি, ট্রাস্ট ও সাউথইস্টসহ চারটি ব্যাংক ২০১৭ সালের তারল্য সঙ্কট কাটিয়ে উঠেছে। চলতি প্রথমার্ধে তারল্য সঙ্কটে থাকা ব্যাংকগুলো হচ্ছে- এবি, আল-আরাফাহ, ব্যাংক এশিয়া, ডিবিবিএল, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি ইসলামিক, ইসলামী, যমুনা, এমটিবি, এনবিএল, এসআইবিএল, ইউসিবি ও ঢাকা ব্যাংক। অবশ্য তারল্য সঙ্কটে থাকা বেশিরভাগ ব্যাংকের নিট মুনাফা আগের বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় বেড়েছে।

২০১৭ সালের প্রথমার্ধে ডিবিবিএলের শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ ছিল ৫৭ টাকা ৪১ পয়সা, যা চলতি প্রথমার্ধে ১৩ টাকা ৭৬ পয়সা ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। ব্যাংকটির চলতি প্রথমার্ধের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময় ডিবিবিএল বিভিন্ন গ্রাহককে ২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকার ঋণ দেয়, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। চলতি প্রথমার্ধে ব্যাংকটি গ্রাহকদের কাছ থেকে ৭১০ কোটি ৮২ লাখ টাকার আমানত সংগ্রহ করে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা। অবশ্য এ সময়ে অন্যান্য ব্যাংক থেকে আমানত ৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬২৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ঋণ বিতরণ বেশি হওয়ায় চলতি প্রথমার্ধে ব্যাংকটির নিট মুনাফা বেড়েছে।

সুদহার কমে আসায় ২০১৭ সাল থেকেই গ্রাহকরা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের আমানত প্রত্যাহার করে নেন। এ সময় সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ভালো থাকায় ব্যাংক আমানতের বড় অংশই সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগে যায়। ব্যাংক আমানতের একটি অংশ পুঁজিবাজারেও বিনিয়োগ হয়। একই সময়ে আমানত প্রত্যাহার হলেও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ঋণ বিতরণ করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত অগ্রিম আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা ছাড়িয়ে যায় অনেক ব্যাংকে। এমন পরিস্থিতিতে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে ও ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নির্ধারণে সরকারের পক্ষ থেকে চাপ আসে। আবার আমানতের তুলনায় ঋণের সীমা বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক এডিআর কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও তা কার্যকরে চলতি বছর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

আমানতের সুদহার কমিয়ে আনা ও এডিআর সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট তীব্র হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আগে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ রাখা যেত। এ ছাড়া ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এ দুই পদ্ধতিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তারল্য সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে জুন মাস পর্যন্ত ১৪টি ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।    

বিভিন্ন ব্যাংকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তারল্য সঙ্কটে থাকা ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগের গ্রাহক থেকে প্রাপ্ত আমানত কমেছে। ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে এনবিএল গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬৩৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার আমানত সংগ্রহ করে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

২০১৭ সাল থেকেই এবি ব্যাংকের গ্রাহকরা তাদের আমানত প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে এবি ব্যাংকের গ্রাহকরা ১ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার আমানত প্রত্যাহার করে নেন। আর চলতি প্রথমার্ধে প্রত্যাহার করেছেন ৯৩০ কোটি টাকার আমানত। ২০১৬ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটি গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকার আমানত পেয়েছিল। চলতি প্রথমার্ধে এবি ব্যাংকের প্রতি শেয়ারে নিট নগদ প্রবাহ ১০ টাকা ৯০ পয়সা ঋণাত্মক, যা আগের বছরের একই সময়ে ১১ টাকা ৭৪ পয়সা ঋণাত্মক ছিল।

এক্সিম ব্যাংক ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে সামান্য কিছু আমানত পেলেও চলতি প্রথমার্ধে ২ হাজার ৬১০ কোটি টাকার আমানত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন গ্রাহকরা, যা ব্যাংকটিকে তারল্য সঙ্কটের মুখে ফেলে দিয়েছে। গত বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকটিতে সঙ্কট না থাকলেও এবার গ্রাহকদের বড় অঙ্কের আমানত প্রত্যাহারের কারণে চলতি প্রথমার্ধে প্রতি শেয়ারে নিট নগদ প্রবাহ ৭ টাকা ৮৬ পয়সা ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। একই অবস্থা আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে। ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে এ ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ ছিল ৪ টাকা ৩৪ পয়সা, যা চলতি প্রথমার্ধে ৭ টাকা ৯৬ পয়সা ঋণাত্মক হয়ে পড়ে।

২০১৭ সালের প্রথমার্ধের ধারাবাহিকতায় চলতি প্রথমার্ধেও তারল্য সঙ্কটে রয়েছে ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। তবে আগের বছরের তুলনায় চলতি প্রথমার্ধে এ সঙ্কট কিছুটা কমেছে ব্যাংক তিনটির। আর ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে তারল্য সঙ্কটে থাকলেও চলতি বছর এ সঙ্কট থেকে বের হয়ে এসেছে শাহজালাল ইসলামী, সাউথইস্ট, ট্রাস্ট ও সিটি ব্যাংক।

জানতে চাইলে ডিবিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী আবুল কাশেম মো. শিরিন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, সার্বিকভাবে আমাদের আর্থিক অবস্থান মজবুত। গত ৬ মাসে অনেক ব্যাংকের আমানত থেকে ঋণের প্রবাহ বেড়েছে। এর কারণ সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদ। আমানতকারীরা ব্যাংকে না এসে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছে। তবে সব সূচকে ভারসাম্য এনে আমরা মুনাফা অব্যাহত রেখেছি। আশা করি, বছর শেষে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা ঠিক থাকবে।