• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১০ মহররম ১৪৪০
BK

একটি অসামান্য রাজনৈতিক বয়ান

একটি অসামান্য রাজনৈতিক বয়ান
সংরক্ষিত ছবি

একা ও নিঃসঙ্গ। দিনের পর দিন। একটা ছোট্ট ঘরে আটকে থাকা। দরজা বন্ধ। কড়িকাঠও নেই, তাকিয়ে থাকা শুধু দেয়ালের দিকে। কথা বলারও অনুমতি ছিল না। একা একা তাই নিজের ভেতরে থাকা। নিজের নিঃশ্বাসটুকু কেবল শুনতে পাওয়া। বই পড়তে পারতেন কখনো কখনো। কিন্তু কথা বলার ছিল না কেউ। এভাবেই তাঁর কেটে যেত কত-না মুহূর্ত। কত-না দিন। এক জায়গায় লিখেছেন : ‘একাকী কামরায় রাত্রদিন থাকা যে কি ভয়াবহ অবস্থা তাহা ভুক্তভোগী ছাড়া বুঝতে পারবে না। দিন কাটতে চায় না। বাইরে যেয়ে একটু হাঁটাচলা করবো তারও উপায় নাই। সূর্যের আলোও গায়ে স্পর্শ করার উপায় নাই।’ এরকম সময়েই হয়তো জীবনানন্দের মতো বলতে পারতেন, ‘সারা দিন মিছে কেটে গেল;/ সারা রাত বড্ড খারাপ/ নিরাশায় ব্যর্থতায় কাটবে; জীবন/ দিন রাত দিনগত পাপ/ ক্ষয় করবার মতো ব্যবহার শুধু।’ সত্যিই তো, ক্ষয় হয়ে যাওয়ার মতো ব্যবহারই পেয়েছেন তিনি। প্রায় সারাজীবন। জেলজীবন তো কোনো সামাজিক জীবন নয়। শাস্তিটা তো ওইখানেই। একজন মানুষ, যিনি লক্ষ-কোটি মানুষের জন্য সংগ্রাম করছেন, মানুষের সাহচর্যই ছিল যাঁর কাছে পরম প্রার্থিত, তাঁকে যদি একা থাকতে হয়, এর চেয়ে ভয়াবহ আর দুঃসহ কী হতে পারে?

স্বৈরশাসকেরা তাঁকে জেলে পুরে দিয়েছে বার বার। কিন্তু ঔপনিবেশিক সেই পাকিস্তানি শাসকেরা বুঝতে পারেনি, যে-মানুষটির বুকে জেগে থাকে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ, তারা তাঁর কাছে মানুষ তো নয়, এক-একটি নক্ষত্র; তাঁকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখলেও মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় আলোকিত থাকবে তাঁর হূদয়-মন। প্রচণ্ড সাহসী আর প্রত্যয়দীপ্ত ছিলেন বাঙালির এই অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

অসাধারণ রোমাঞ্চকর এই প্রকাশিত রোজনামচার প্রতিটি পৃষ্ঠা। যেন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে উঠবার এক-একটা সিঁড়ি। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত লেখা দিনলিপি। কিন্তু এই দিনলিপিতে তিনি কি শুধু নিজের কথা বলেছেন? না, একেবারেই নয়। এটি একইসঙ্গে শেখ মুজিবুরের আত্মকথন, আত্মদর্শন; আবার বাংলাদেশের হয়ে উঠবার কাহিনী। এরকম আরো কিছু দিনলিপি আমি পড়েছি। মনে পড়ছে এনগুগি ওয়া থিয়োং’ওর লেখা ‘ডিটেইন্ড : আ রাইটার্স প্রিজন’ নামের ডায়েরিটার কথা অথবা আন্তোনিও গ্রামসির ‘প্রিজন নোটবুকসে’র কথা। থিয়োং’ওকে গ্রেফতার করা হয়েছিল মাতৃভাষা কিকুয়ুতে একটি নাটক লিখে জনগণকে ‘উসকানি’ দেওয়ার অপরাধে। হাস্যকর অভিযোগ ছিল যে, তাঁর কাছে চীনা বইপত্র পাওয়া গেছে। সোভিয়েত ও উত্তর কোরীয় কমিউনিস্ট কানেকশনও আবিষ্কার করেছিল সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির কাছে দেশকে বিকিয়ে দেওয়া কেনিয়ার তাঁবেদার সরকার।

তিনি, বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, শেখ মুজিবুর রহমানকেও ষড়যন্ত্রমূলক একটা মামলায় বিচার করা হচ্ছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেটি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। রোজনামচাতেই বাংলাদেশের মহান নেতা, জাতির পিতা লিখেছেন, কীভাবে মধ্যরাতে ঘুম থেকে তুলে ‘মুক্তি দেওয়া’র নাটক করে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

মার্কসই তো বলেছিলেন ‘নিঃশব্দ প্রক্রিয়ার সলিটারি কনফাইনমেন্টে’র কথা। কীভাবে মুক্তিকামী নেতাকে বন্দি করে একাকী নিঃসঙ্গ করে রাখা হয়। দমন করা হয় আন্দোলন-সংগ্রাম। কারাগারের রোজনামচার পাতায় পাতায় শেখ মুজিবুর রহমানের এই বন্দিত্বের কথা আছে। বিশেষ করে শেষ দিকে যে একবছর তাঁকে ‘মিলিটারি কাস্টডি’তে রাখা হয়েছিল, সেই সময়টা ছিল সত্যিকার অর্থেই দুঃসহ। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে তবু চারপাশে নানা ধরনের কয়েদিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হতো; কিন্তু কুর্মিটোলায় তাঁকে রাখা হয়েছিল একা, ছোট্ট একটা অন্ধকার ঘরে, যার দরজা-জানালা থাকত বন্ধ, দরজা-জানালার কাচগুলো ছিল লাল রঙ করা। অর্থাৎ সেই ঘরে আলো পর্যন্ত প্রবেশ করত না।

রাজনীতির বরপুত্র হিসেবে বন্দি করা হয়েছিল যাঁকে, তাঁকেই রাষ্ট্র-বিচ্ছিন্নতার অভিযোগে বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়ে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, আধুনিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে তার তুলনা মিলবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু এই অবস্থাতেও তিনি যে বাংলাদেশের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা একজন খাঁটি বাঙালি, সে কথাও নানা প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। যে ঘরটাতে তিনি থাকতেন সেটি ছিল অবাঙালি সামরিক অফিসারদের মেসের পাশের একটা ঘর। সেখানে কেউ বাংলায় কথা বলত না, কথা বলত হয় ইংরেজিতে অথবা উর্দুতে। রেডিওতে বাংলা গান শুরু হলে রেডিও বন্ধ করে দিত। বাংলা বইও পাওয়ার উপায় ছিল না যে পড়বেন। অবাঙালি মেস থেকে খাবার আসত বলে ভাতও খেতে পারতেন না। এসব প্রসঙ্গের কথা তুলে তিনি ছোট্ট একটা আত্মকথনমূলক বাক্যে লিখেছেন, ‘যদি কেহ মনে প্রাণে বাঙালি হয় তবে তার ভবিষ্যতের দরজা বন্ধ।’ একটু পরে আবার বলেছেন, ‘বাংলায় কথা বলার উপায় নাই- পূর্ব বাংলার মাটিতে থেকেও একেই বলে অদৃষ্ট! প্রাণটা আমার হাঁপিয়ে উঠছিল, সহ্য করা কষ্টকর হয়ে পড়ছিল।’ একে কী শুধু ভাষাপ্রীতি বলা যাবে বা বাঙালিয়ানার আর্তি? খুব স্পষ্ট করেই, এই জায়গাটাতে এসে বোঝা যায়, পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষদের ভাষা আর সংস্কৃতির পার্থক্য কতটা তীব্র আর স্বাভাবিক বাস্তবতা ছিল। থিয়োং’ওর তো এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তাঁর মাতৃভাষায় লেখা নাটকটি তাঁরই মাতৃভাষায় কথা বলে এরকম স্থানীয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা মঞ্চায়িত করেছিল বলে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে জেল খাটতে হয়েছিল। কিন্তু মাতৃভাষায় কথা বলার দুঃখ কিংবা ভাত না খাওয়ার দুঃখ ছাপিয়ে যে বিষয়টি বাঙালির এই নেতার কাছে বড় হয়ে উঠেছিল সেটা হলো কোনো বাঙালির মুখদর্শন করতে না পারার দুঃখ : ‘এখানে থাকবার সুযোগ পেয়ে দেখলাম বাঙালিদের তারা ব্যবহার করতে প্রস্তুত, কিন্তু বিশ্বাস করতে রাজী নয়। আর বিশ্বাস করেও না। সকলকেই সন্দেহ করে। তাদের ধারণা প্রায় সকলেই নাকি আমার ভক্ত। মনে মনে সকলেই নাকি আলাদা হতে চায়। পূর্ব বাংলায় বাঙালির মুখ দেখতে পারি নাই কয়েকমাস একথা কি কেহ বিশ্বাস করবে?’ এই যে একেবারে ভেতর থেকে উঠে আসা অনুভব, বাঙালিদের কয়েক মাস দেখতে না পারার দুঃখ, তা থেকেই বোঝা যায়, তিনি বাঙালিকে কতটা ভালোবাসতেন।

বাংলাদেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসার এই ছবি রোজনামচায়, তাঁর বর্ণিত নানান ঘটনায়, ছড়িয়ে আছে। মানুষের প্রতি কী মমত্ববোধ যে ছিল তাঁর- তথাকথিত সেই চোর, জেলের ভেতরে যার কথা সবাইকে শুনতে হতো বলে সম্মানিত বোধ করতেন, কিংবা ভোলা যাবে না সেই পকেটমার চোর লুদুর কথা, যে একটা অসম সমাজ ব্যবস্থার কারণে কীভাবে চোর হয়ে উঠেছিল। কারাগারের রোজনামচার ভূমিকায় কন্যা শেখ হাসিনা ঠিকই লক্ষ করেছেন, এক জোড়া হলুদ পাখির কথা কী সুন্দরভাবে তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে। একটা মুরগির মৃত্যুও তাঁকে কতটা ব্যথিত করেছিল। কিন্তু এই দিনলিপির যাঁরা পাঠক তাঁরা আরও একজায়গায় এসে থমকে যাবেন, অন্তত আমি থমকে গেছি, যেখানে তিনি বলছেন, বন্দিদের সঙ্গে কেউ দেখা করতে এলে, এমনকি স্ত্রী এলেও দম্পতিরা মাত্র ২০ মিনিট কথা বলতে পারত। পাশেই বসে থাকত জেলের কোনো কর্মচারী। কিন্তু ‘নিষ্ঠুর কর্মচারীরা বোঝে না যে স্ত্রীর সাথে দেখা হলে আর কিছু না হউক একটা চুমু দিতে অনেকেরই ইচ্ছা হয়।’ কী আশ্চর্য রসবোধ। নিষ্ঠুর নির্মম জেলজীবনের মধ্যেও তিনি মানুষের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যের কথা একবারও ভুলে যাননি। কী চমৎকার ঘরোয়া অন্তরঙ্গ ভঙ্গি আর ভাষায় প্রকাশ করেছেন সবকিছু, ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। এই বইয়ের ভাষাভঙ্গিটি তাই বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। আমাদের দেশজ ভাষা কীভাবে নাগরিক ভাবপ্রকাশের বাহন হয়ে উঠেছিল, এই রোজনামচাতেই তার প্রমাণ মিলবে। এর কোথাও কোথাও তাই সাধুরীতির ঈষৎ ব্যবহার আমাদের এতটুকু পীড়িত করে না, বরং খুবই ঘরোয়া আর প্রাণবন্ত লাগে। দিনলিপির ভাষা তো এমনটাই হওয়ার কথা। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাবে ৭ মার্চের সেই অবিস্মরণীয় ভাষণটির কথা। কোনো সন্দেহ নেই, রোজনামচাটি থেকে এক মহান নেতার জেলের জীবনযাপন, কয়েদিদের অজানা কথা, অপরাধীদের কথা ইত্যাদি নানান বিষয়ে জানা যাবে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে তিনি যেমন দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর কারাজীবন থেকে মুক্তজীবনে এসে পৌঁছেছিলেন, বাংলাদেশও তেমনি ঔপনিবেশিক বন্দিত্ব থেকে অর্জন করেছিল স্বাধীনতা। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন তাই আমাদের জাতিগত সংগ্রাম আর স্বাধীনতার সমান বয়সী বললেও বোধহয় এতটুকু ভুল বলা হবে না। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মতো ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থটিও আমাদের একটা অসামান্য রাজনৈতিক ডিসকোর্স হয়ে থাকবে। কীভাবে, কত ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে, বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখা খাতাগুলোকে নানা সময়ে নানা জায়গায় আগলে রেখে, লুকিয়ে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত যেভাবে প্রকাশ করেছেন, পাঠক হিসেবে তাই তাঁকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন। ৎ