• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৬ সফর ১৪৩৯
BK

গুড টাচ, ব্যাড টাচ

গুড টাচ, ব্যাড টাচ
ছবি : ইন্টারনেট

আজকাল শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দশ বছরের কম বয়সী শিশুরা এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। যাদের মধ্যে ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতাই তৈরি হয়নি, তাদের সঙ্গে কী ঘটছে সে বিষয়েও বুঝে উঠতে পারে না তারা। নিজের পরিচিত জন বা কাছের মানুষের দ্বারাই শিশুরা এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। সতর্ক না হলে এ ধরনের ঘটনায় শিশুর শৈশব বিভীষিকাময় হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই শিশুর শৈশবকে সুরক্ষিত করার পদক্ষেপ গ্রহণের সময়। এখনই গুড টাচ এবং ব্যাড টাচ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার সময়। এ ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলায় এখনো আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে বেশ জড়তা কাজ করে। কিন্তু শিশুকে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং সে সময়ে কী করা উচিত তা জানানো প্রয়োজন।

ছোট বয়স থেকেই শিশুকে বুঝিয়ে বলুন :

শিশুর সঙ্গে গুড টাচ এবং ব্যাড টাচ সম্পর্কে ছোট বয়স থেকেই আলোচনা করুন। যাতে সে দ্রুত এ স্পর্শকাতর বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।

জড়তা কাটিয়ে উঠুন :

আমরা অনেকেই শিশুর সঙ্গে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধাবোধ করি। কিন্তু এ বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষা শুরু হওয়া উচিত বাড়ি থেকেই। তাই সব ধরনের দ্বিধা দূর করে যত সহজ ও সাবলীলভাবে সম্ভব শিশুকে এ বিষয়ে বুঝিয়ে বলুন। খেলতে খেলতেই শিশুকে এ বিষয় সম্পর্কে জানানো সম্ভব।‌ সহজ ভাষায় খুব সাবলীলভাবে গল্পের ছলে ওকে বোঝান ‘‌গুড টাচ’‌ ‘‌ব্যাড টাচ’ কী?‌  এ সময় শিশুর কৌতূহলী কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন না। যতটুকু সম্ভব যথাযথ শব্দ ব্যবহার করে প্রশ্নের উত্তর দিন।

শিশুর শরীরের সীমানা সম্পর্কে ধারণা দিন :

শিশুকে বলুন সাধারণত আমরা শরীরের যে অংশগুলো সবসময় ঢেকে রাখি সে অংশগুলো আমাদের শরীরের একান্ত অংশ। আরো সহজভাবে বোঝাতে সুইম সুট রুলস্ অ্যাপ্লাই করতে পারেন। তাকে জানান, সুইম স্যুটে ঢাকা অংশে কেউ স্পর্শ করতে পারে না এবং শরীরের এ অংশগুলোতে কারো স্পর্শ করার অধিকার নেই। এবং শুধু গোসল আর তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার সময় বাবা-মা স্পর্শ করতে পারবে। এ ছাড়া বাবা-মায়ের উপস্থিতিতে ডাক্তার চিকিৎসার প্রয়োজনে স্পর্শ করতে পারবে।

ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য বুঝিয়ে বলুন :

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুকে আদর করার ছলেই শিশুর সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। ফলে শিশুর পক্ষে গুড টাচ ও বেড টাচের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শিশুকে এর পার্থক্য বুঝিয়ে বলতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিশুকে এভাবে বোঝানো যেতে পারে যে...

গুড টাচ হলো সেই স্পর্শ, যাতে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং এ ধরনের স্পর্শের মাধ্যমে ভালোবাসা, আদর, স্নেহ ইত্যাদি বোঝায়। প্রয়োজনে তাকে নিজেদের কিছু উদাহরণ দিতে পারেন। যেমন মা তোমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। বাবা গালে চুমু খাওয়া, দাদা-দাদুর কোলে নেওয়া, বন্ধুর হাত ধরে খেলা করা ইত্যাদি সবই ভালো স্পর্শ।

ব্যাড টাচ হলো যে স্পর্শে তুমি অস্বস্তিবোধ কর এবং তুমি তাকে বাধা দিতে চাও। যদি কেউ তোমার অনুমতি ছাড়া তোমার শরীরের একান্ত অংশে স্পর্শ করে। সেগুলো হলো ব্যাড টাচ। এ ছাড়া কেই যদি তোমাকে স্পর্শ করে আর এ কথা কাউকে না বলতে অনুরোধ করে তাহলে এগুলোও ব্যাড টাচ।

শিশুর ভালো বন্ধু হোন :

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এ ধরনের আচরণের শিকার অধিকাংশ শিশু কারো সঙ্গে ঘটনা সম্পর্কে বলে না এবং নীরবে তা মেনে নেয়। কারণ বাবা-মায়ের সঙ্গে তার তেমন সম্পর্ক তৈরি হয় না। তাই শিশুর সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করুন। শিশু সারাদিন কী কী করেছে এ বিষয় সম্পর্কে বলতে চাইলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। শিশুকে আশ্বস্ত করুন যে, তার প্রতি আপনি সচেতন এবং নিশ্চিত করুন শিশু যেন আপনার সঙ্গে সব বিষয়ে শেয়ার করে।

অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে শিশুর করণীয় সম্পর্কে শিক্ষা দিন :

অভিভাবক হিসেবে শিশুকে শুধু সতর্ক করেই আপনার দায়িত্ব শেষ নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সে কী করতে পারে, সে বিষয়েও শিক্ষা দিতে হবে। শিশুকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করতে বলুন।

·     কারো ছোঁয়া খারাপ লাগলে প্রতিবাদ করতে শেখান।

·     ঘটনাস্থল থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরে আসার এবং ভবিষ্যতে ওই ব্যক্তির সামনে একা যাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলুন।

·     এ রকম আচরণ কেউ করলে চুপ করে না থেকে কাছাকাছি বিশ্বস্ত কারো কাছে গিয়ে কী ঘটেছে সব খুলে বলতে এবং প্রয়োজনে চিৎকার করতে বলুন।

·     শিশুকে বলুন, যে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে তাকে ভয় না পেতে এবং কোনো কারণে নিজেকে দোষারোপ না করতে। 

সচেতন হতে হবে অভিভাবককেও‌:

আদর দূর থেকেই ভালো। অতিথির মুখের ওপর বলুন, আপনার বাচ্চা গায়ে হাত দিয়ে আদর পছন্দ করে না। আপনারা কেউই সে ধরনের আদরে অভ্যস্ত নন। নিজেরাও অযথা বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে আদর বন্ধ করুন। সে বুঝতে শিখবে, এ রকম করা যায় না। বাচ্চা কাউকে বেশি ভালোবাসছে দেখলেও সজাগ থাকুন। কেন?‌ কারণ খুঁজুন।

·     শিশুর আপত্তি থাকলে তাকে কারো কোলে যাওয়ার জন্য বা চুমু দেওয়ার জন্য জোর করবেন না।

·     আপনার প্রাণচঞ্চল শিশুটি হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে তার কারণ জানার চেষ্টা করুন।

·     খেয়াল করুন কারো নাম শুনলে বা কাউকে দেখে শিশু ভয় পাচ্ছে কি না। তাহলে চেষ্টা করুন শিশুর সঙ্গে কথা বলে তার এই ভীতির কারণ জানতে।

·     বাচ্চাকে কেউ বেশি আদর করছে দেখলেও সতর্ক হোন। 

·     কোনো রকম সঙ্কোচ না রেখে অতিথিকে শিশুর গায়ে হাত দিয়ে আদর করতে নিষেধ করুন।

·     শিশুকে কারো কোলে দেওয়া এবং কোলে বসিয়ে আদর করা থেকে বিরত রাখুন।

·     নিজেরাও শিশুর অপছন্দের গুরুত্ব দিন।