• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১০ মহররম ১৪৪০
BK

গণতন্ত্রের চোরাবালি

গণতন্ত্রের চোরাবালি

যত দিন যাচ্ছে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর মানবাধিকারের বিষয়গুলো ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন-সংসদ, আইন-আদালত, সংবাদমাধ্যম প্রতিটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান জন-আস্থা ও মূল্যবোধ হারাচ্ছে। ক্ষমতাশালী ও বিত্তবানরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের চোরাবালিতে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছি।

ম্যানবুকার পুরস্কারজয়ী ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রায় তার ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাবলিক’ বইয়ে একটি প্রশ্ন তুলেছেন- গণতন্ত্রের পরে কী? অতিসাধারণ এই প্রশ্নটি বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে প্রত্যেক শান্তিকামী মানুষের মনে। ৭২ বছরের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রবাদীরা (যারা লিবারেলইজমে বিশ্বাসী) অস্ত্রশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জোর করে ভিন্ন আদর্শবাদী জাতি ও দেশগুলোকে স্বঘোষিত সভ্যতার লেবাস পরাতে গিয়ে রক্ত-মাংস-লাশের বীভৎসতা দেখাচ্ছে। যার ফলে প্রজন্ম পরম্পরায় গণতন্ত্র এখন একটা দানবীয় রূপ নিচ্ছে। ২০১৬ সালে বৈশ্বিক গণতন্ত্র মূল্যবোধ জরিপ একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ বছর বয়সীদের মন্তব্য হচ্ছে, সুন্দর জীবন ব্যবস্থার জন্য গণতন্ত্রই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। তবে ৩০ বছরের নিচে যাদের বয়স, তাদের অর্ধেক এ কথা মানতে নারাজ। আমেরিকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ তরুণ মনে করে, দেশ চালানোর জন্য গণতন্ত্র একটি বাজে ব্যবস্থা। ইউরোপীয় তরুণদের ১৭ শতাংশ এই মতের সমর্থক। ১৯৯৫ সালেও যেখানে এই মতে বিশ্বাসী তরুণের সংখ্যা ছিল অর্ধেকের কম। জার্মানি, স্পেন, জাপান ও আমেরিকার গড় ৪০ শতাংশ জনগণ মনে করে, একজন শক্তিধর রাষ্ট্রনায়কের সংসদ কিংবা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়। তার উচিত, কঠোরভাবে শাসন চালিয়ে যাওয়া।

নারীদের ভোটাধিকারসহ সর্বজনীন ভোটাধিকার বিবেচনায় রাখলে গণতন্ত্রের শুরু বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে। মাত্র একশ’ বছরেই জনমুক্তির মতবাদ বুড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের ৪৩ শতাংশ মানুষ গণতন্ত্রের চাইতে সমাজতন্ত্রকেই অধিকতর ভালো মতবাদ বলে বিশ্বাস করে। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রতি মানুষ কেন বীতশ্রদ্ধ হচ্ছে, সে বিষয়ে একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন, স্বল্পপরিসরের এই নিবন্ধে যেটা বিশদভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে কিছু আলোচনা হতে পারে। আমরা যদি ‘পোস্ট কলোনিয়াল’ যুগ থেকে লক্ষ করি, তাহলে উপনিবেশবাদী শক্তির হাত থেকে যে দেশগুলা স্বাধীন হয়েছে, সে দেশগুলোর ক্ষমতায় আরোহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাবেক উপনিবেশের একটা প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পাব। আর দেখতে পাব গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো স্বাধীনতা দিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্য গুটিয়ে নিলেও সে দেশগুলোর ওপর তাদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রেখেছে।

স্থানীয় জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে যখন ব্যর্থ হয়, তখন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো কথিত সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ শুরু করে। যেমনটা ২০০১ সালে আফগানিস্তানে দেখেছি, যা এখনো চলমান। ২০০৩ সালে ইরাকে দেখেছি। ১৫ বছর যুদ্ধের পরও শান্তি বা গণতন্ত্র কোনোটাই প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। উল্টো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জনগণের জয় হয়েছে। তেমনি লিবিয়ায় আক্রমণ চালিয়ে কথিত স্বৈরাচারী মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে গোটা দেশকে এখন সন্ত্রাসের রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায়ও একই অবস্থা। ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেন এখন মৃত্যুর নগরী। আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া, সুদান, সিয়েরা লিওন, কঙ্গো, নাইজেরিয়া, মিসরের জনগণ বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত হারিয়েছে।

এ তো গেল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কথা। এবার যদি আমরা প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি লক্ষ করি, তাহলে সেখানেও গণতন্ত্রের বিপন্ন অবস্থা দেখতে পাব। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো যারা নিজেদের সভ্য, উদার ও গণতান্ত্রিক বলে পরিচয় দেয়। অথচ তাদের দেশগুলোতে প্রতিনিয়ত আইন করে সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। মুসলিম নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা পর্যন্ত হরণ করছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা এখন নেই বললেই চলে। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোতে সম্প্রতি উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে, যা উদার গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পপুলার ভোটে হেরেও ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক মানসিকতাসম্পন্ন ট্রাম্পের মতো ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, যিনি একের পর এক দেশে ও বিদেশে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করছেন। এখন ইরানের সঙ্গে আবার একই খেলা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কোনো আস্থা নেই। গণতন্ত্র, মানবতা ও মানবাধিকারের প্রতি যারা নিজেদের শ্রদ্ধাশীল ও রক্ষক বলে দাবি করে, বর্তমানে গণতন্ত্রের প্রতি দেশের ভেতরে ও বাইরে তাদেরই এমন অবস্থা।

তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশের, যে দেশগুলো গণতন্ত্রকে তাদের দেশে শাসনের মূলনীতি হিসেবে নিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর হস্তক্ষেপের ফলে জনগণের কাছে আবেদন হারাচ্ছে। অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীও ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখতে নানা অপকৌশল অবলম্বন করে গণতন্ত্রকে নিজেদের মতো করে নিয়েছে। জনগণ ক্ষমতার উৎস হলেও জনগণ তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না। গণতন্ত্রের শিক্ষা ও সচেতনতা না থাকায় সে দেশের জনগণও নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে এসব দেশে নামসর্বস্ব গণতন্ত্র থাকলেও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত নেই। ফলে এসব দেশেও গণতন্ত্র মার খাচ্ছে।

প্রদত্ত তথ্য ও বিশ্লেষণগুলোর উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া তথা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকেও চোখ ফেরাতে পারি। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের প্রায় সবকটি দেশেই গণতন্ত্র এখন প্রহসনে রূপ নিয়েছে। মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ প্রথাগত ব্যাপার। সেনাবাহিনীর হাত থেকে পাকিস্তানের গণতন্ত্র আজো মুক্ত হতে পারেনি। সর্বশেষ নির্বাচনও এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আফগানিস্তান একটি মানচিত্রসর্বস্ব দেশ। গণতন্ত্র বা বৈধ সরকার বলে কোনো বিষয় নেই। সম্প্রতি এই দেশগুলোতে (ভারত বাদে) চীনের প্রভাব বাড়ছে। তাই এ দেশগুলোর গণতন্ত্র তথা নির্বাচন, সংসদ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকাংশেই চীন-ভারতের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল; জনগণ থেকে উৎসারিত নয়। তাই বলছি, আমরা আটকে যাচ্ছি গণতন্ত্রের চোরাবালিতে। যেখানে শুধুই গণতন্ত্রের নাম আছে, রূপ-রস-গন্ধ বলতে কিছু নেই।

 

লেখক : সাংবাদিক