• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৮ সফর ১৪৩৯
BK

আস্থার প্রতীক বঙ্গবন্ধু

আস্থার প্রতীক বঙ্গবন্ধু
সংগৃহীত ছবি

মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের সেতু গড়ে না উঠলে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা যায় না। এই সহজ সত্যটি জানতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তিনি মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের দিকে নজর দিয়েছিলেন। তিনি একদিকে যেমন মানুষের সঙ্গে মানুষের উন্নতির দিকে নজর দিয়েছিলেন, তেমনিভাবে মানুষে মানুষে যে সমানাধিকারের নীতির প্রতি যুগ যুগ ধরে শাসক শ্রেণি উপেক্ষার দৃষ্টি হেনেছে, তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছিলেন। আর তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একই সঙ্গে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। যা তাঁকে করে তুলেছিল গণমানুষের নেতা। শুধু ব্যবহারিক এবং ব্যক্তিস্বার্থের দিকে তাকিয়ে তিনি রাজনীতি করেননি। তাই লাখো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বলতে পেরেছিলেন— ‘আমার প্রতি তোমাদের বিশ্বাস আছে?’ বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ রেসকোর্সে সেদিন সমবেত মানুষ হাত তুলে বিনা তর্কে জানিয়ে দিয়েছিল তাদের আস্থার কথা। এই আস্থা বঙ্গবন্ধু একদিনে অর্জন করেননি। এর পেছনে রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সুষ্ঠু পরিচয়। টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া শিশু, আবহমান প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা কিশোর নিজেকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অক্লান্তভাবে কাজ করেছেন। সেই পরিশ্রমের প্রতিদান তিনি পেয়েছেন মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের মধ্য দিয়ে।

পরাধীনতার যে শেকল আমাদের পায়ে আটকে ছিল, সেই শেকল ছিন্ন করার জন্য যুগে যুগে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। মানুষকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা কখনো কখনো অঙ্কুরেই বিনাশ করে দিয়েছে শাসকগোষ্ঠী। কখনো কখনো আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু তাতে গণমানুষের সম্পৃক্ততা তৈরির আগেই তার যবনিকা ঘটেছে। ফলে সাধারণ মানুষ হিসেবে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসার পথ আমরা পাইনি। আমাদের সেই সীমাবদ্ধতাকে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যান্ত্রিক দাসত্বের যে শেকল আমাদের তার কঠিন পায়ে আঁকড়ে রেখেছিল, বঙ্গবন্ধু সেই শেকল ভাঙার গান শোনালেন। ব্রিটিশ তাড়ানোর পরও যে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার সন্ধান মিলবে না, এ সত্যও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ভৌগোলিক ব্যবধান আর শোষিতের মনোভাব থেকে যে বৈরিতা গড়ে উঠেছিল, তাকে ছিন্ন করার জন্য মানুষ পথ খুঁজছিল। সেই পথের সন্ধান প্রথম মিলল। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মধ্য দিয়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠল। আর সেই ঐক্যবদ্ধতার প্রতীক হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি উদভ্রান্ত জনতাকে সুচিন্তিত ভাষা দিলেন। তাদের মুক্তির পথের সন্ধান দিলেন। ফলে সত্তরের নির্বাচন তাঁকে গণমানুষের নেতা হিসেবে স্থান নির্ধারণ করে দিল। ঘটনা পারস্পর্যের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলার মানুষকে শেখালেন কী করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, কী করে শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হয়। এই কথামালা— চোখে চোখ রাখার এই সাহস বাঙালিকে একাত্তরে উজ্জীবিত করে তোলে স্বাধীনতার মন্ত্রে। সব বৈপরীত্যকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে করে বাঙালি জাতি নিজের ঠিকানার সন্ধান করতে পেরেছে, যে অস্তিত্ব সঙ্কট তাদের তাড়া করে ফিরেছে প্রতিনিয়ত, সেই সঙ্কট দূর করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সব নির্যাতন, আর ইতিহাসের জঘন্য গণহত্যা, শাসকের হিংসাশ্রয়ী উদ্ধত সঙিনের মুখে দাঁড়িয়ে বাঙালি তার আত্মপরিচয় খুঁজে নিতে সক্ষম হয়েছে। রেসকোর্স থেকে যে মন্ত্র বঙ্গবন্ধু মানুষকে শিখিয়েছিলেন, সেই মুক্তির সংগ্রামে কারাগারের অন্ধকারে থেকেও তিনিই ছিলেন কাণ্ডারির ভূমিকায়। তাঁরই নামে পরিচালিত হয়েছে সরকার। ফলে সারা পৃথিবীর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যেমন, তেমনি নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভূমিকাতেও তিনি নিঃসন্দেহে প্রধান নেতাদের একজন। স্পষ্ট চিন্তা, গাঢ় উপলব্ধি আর মানুষের জন্য প্রগাঢ় ভালোবাসার সমন্বয় তাকে জাতীয় নেতা থেকে পরিণত করেছিল বিশ্ব নেতায়।

বঙ্গবন্ধু আমাদের কেবল একটি পৃথক আবাসভূমির স্বপ্নই দেখাননি, বিশ্বের মানচিত্রে শুধু একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের সীমারেখা তৈরির জন্য মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হননি; শুরুতেই বঙ্গবন্ধু ভৌগোলিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করেছিলেন। তিনি এমন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন যে রাষ্ট্র সম্পদে সম্মানে বিশ্বসভায় গৌরবের আসনে একদিন সমাসীন হবে। সেই স্বপ্নসাধ অপূর্ণ থাকতেই হিংস্র হায়েনারা তার প্রাণ সংহার করে। নৃশংস ও নির্মমভাবে হত্যা করে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে। সেই ভয়ঙ্কর রাতের দৃশ্যপট বর্ণনায় কবি বলেছেন, ‘সেদিন আকাশে শ্রাবণের মেঘ ছিল, ছিল না চাঁদ।’ সেই নিকষ কালরাতের অন্ধকার শুধু ৩২ নম্বরেই নয়; ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে।

অথচ মেহনতি মানুষের আরেক গণনায়ক ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ তাঁর এ কথাটি আজ কিংবদন্তি। বঙ্গবন্ধু বললেই যেন সারাবিশ্বের মানুষের চোখেও গোটা বাংলাদেশের মানচিত্রটি ভেসে ওঠে। হিমালয়ের চেয়েও মাথা উঁচু করে তিনি যেন দেশটির পাহাড়, পর্বত, সাগর, নদী, খাল-বিল, শহর-বন্দর সবকিছুতে জড়িয়ে আছেন পরম মমতায়। বঙ্গবন্ধু বললেই একটি দেশ আর বাংলাদেশ বললেই একটি মানুষের ছবি চোখে ভেসে ওঠে। বাঙালি হূদয়ে ধ্বনিত হয় একটি নাম— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সব সময় বিদ্রোহ আর বিপ্লব সমার্থক হয়ে ওঠে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে বিদ্রোহ ও বিপ্লব একার্থবোধক অর্থেই সমান্তরালভাবে এগিয়ে গেছে। তিনি পাকিস্তানি শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া সব দাসত্বের শেকল ভাঙার জন্য বিদ্রোহ করেছেন। আবার জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঠিক মুক্তির লক্ষ্যে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ভেঙে নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখানেই তার সার্থকতা। আর এ জন্যই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির জাতির পিতা।

সত্য প্রতিষ্ঠায়, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সব ভ্রান্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক কর্তব্য পালন করেছেন। সত্যের ভিত্তি যে কখনই সাময়িক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যবহূত হতে পারে না, এই সত্যকেও তিনি আস্থার সঙ্গে বাস্তবায়ন করেছেন। ফলে সাধারণ মানুষ যেমন পরিতৃপ্ত হয়েছে, তেমনিভাবে ভীরু প্রবঞ্চকের দল ভীত হয়েছে। আর এই ভীতি থেকেই রচিত হয়েছিল ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়। দীর্ঘ সময় পর সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তি মিললেও পঁচাত্তরের পর আমরা জাতি হিসেবে যে বিচ্ছিন্নতার দিকে ধাবিত হয়েছিলাম, তা থেকে উদ্ধারেও তাঁর মহৎ কর্মই যুগে যুগে আমাদের প্রেরণার উৎস।

লেখক : সাংবাদিক, কবি