• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ২৩ সফর ১৪৩৯
BK

প্রযুক্তির জাঁতাকলে গ্রামীণ বৈচিত্র্য

প্রযুক্তির জাঁতাকলে গ্রামীণ বৈচিত্র্য
সংগৃহীত ছবি

প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে আবিষ্কৃত হলেও কোনো কোনো সময় মানুষের অকল্যাণ ডেকে আনে। মোবাইল ফোন বর্তমান সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। মোবাইল ফোন সহজলভ্য হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হয়েছে বটে, কিন্তু এই মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের শিকারও মানুষ কম হচ্ছে না। তেমনি ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগের একটি অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু সেখানেও বিপত্তির অভাব নেই। কত রকমের অঘটন ঘটছে এই দুটি প্রযুক্তির মাধ্যমে। তাই বলে কি প্রযুক্তির দোষ? না, প্রযুক্তির উদ্ভব মানুষের কল্যাণে। শুধু ব্যবহার বিধির যথাযথ নিয়মকানুন না থাকায় অপকর্মের সৃষ্টি হচ্ছে; ঘটছে হাজার রকমের দুর্ঘটনা।

আজকের প্রযুক্তি মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে অনেক গুণ বৃদ্ধি করেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানুষ বিশ্বজগৎটা হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পেরেছে। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তের খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রের উন্নতি হয়েছে। হাজার রকমের কর্মক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষিত সমাজ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নিজেকে তুলে ধরতে পারছে। ফুটিয়ে তুলছে নিজের কর্মদক্ষতা। তবুও প্রত্যেকটি ভালো কিছুর পেছনে অনেক খারাপ কর্মকাণ্ড লুক্কায়িত থাকে। ভালোগুলো গ্রহণ করতে হয় খারাপগুলো পরিত্যাগ করতে হয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেউ কলঙ্কিত অধ্যায় রচনা করে আবার কেউ সমাজ ও জাতির মাথা উঁচু করে।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামে এখন শহুরে ভাবের উদয় হয়েছে। গ্রামীণ বৈচিত্র্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ইট, পাথর গ্রামীণ জীবনকে বদলে দিচ্ছে। সেই মাটির ঘর, ছনের ঘর এখন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিভিন্ন ডিজাইনের বিল্ডিং এবং টাইলসের কারুকার্য গ্রামের মানুষগুলোর মনে যেন নেশা ধরিয়েছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি। ভরাট হচ্ছে ফসলি জমি, মুক্ত জলাশয়। খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট হয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনোটি যদিও রয়েছে, তবে তা অর্ধমৃত। যেসব পুকুর রয়েছে সেগুলোর মধ্যে পূর্বের বৈচিত্র্য এবং জলের স্বাদ, গন্ধের অস্তিত্ব নেই। মাছ চাষিরা বিষাক্ত খাবার প্রয়োগ করে জলগুলোকে কেমন যেন বিষাক্ত করে ফেলেছে। গোসল করা যায় না, সাঁতার কাটার প্রশ্নেই ওঠে না। পানিতে কিছুক্ষণ থাকলেই শুরু হয়ে যায় চুলকানি। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ এখন আর পুকুরের জল ব্যবহার করে না। ধোয়া, মোছাসহ গৃহস্থালি কোনো কাজেই পুকুরের জল ব্যবহার করে না।

ঘরে ঘরে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগে গেছে। ইলেকট্রিক মোটরের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে জল উত্তোলন করে ট্যাঙ্ক ভর্তি করে রাখে এবং প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে থাকে। অথবা উন্নতমানের টিউবওয়েলের জল ব্যবহার করে থাকে। ফলে পুকুরে জল ভালো থাকুক আর না থাকুক, তাতে কারো কিছু আসে-যায় না।

মাছ চাষ লাভজনক হওয়ায় মানুষ কোনো পুকুর আর খালি রাখতে চায় না। যাদের পক্ষে সম্ভব হয়, নিজেরাই মাছ চাষ করে। অথবা লিজ দিয়ে থাকে। লিজ গ্রহীতারা অধিক ফলনের প্রত্যাশায় যা-তা খাবার ফেলে পানির প্রকৃত অবস্থা নষ্ট করে ফেলে। এমন অবস্থাও দেখা যায়, মরা মুরগি, মরা গরু, মরা হাঁস, মল-মূত্র, গরুর গোবর অবাধে পুকুরে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই।

গ্রামের মধ্যে শহুরে ভাব চলে এসেছে। নেই গ্রামীণ মেঠো পথ, খোলা আকাশ আর মুক্ত হওয়া। কেমন যেন আবদ্ধ আবদ্ধ মনে হয়। বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালার বাগান বৃদ্ধি হওয়ায় সকাল-বিকাল পাখিদের কলরব শোনা যায় না। দেশি ফলজ বৃক্ষের অভাবে তারাও যেন পর হয়ে গেছে। ছেড়ে গেছে আমাদের গ্রামীণ জনপদ। পাখিদের কলরবে এখন আর ঘুম ভাঙে না; মানুষের কলরবেই ঘুম ভাঙে। আমরা আজ বাঙালিয়ানাকে ক্রমান্বয়ে ছেড়ে দিয়ে বিদেশিয়ানায় মশগুল হয়ে গিয়েছি। খাওয়া-দাওয়া, ওঠা-বসা, চাল-চলন, কথাবার্তায় বাঙালির সরল প্রকৃতির ছোঁয়া নেই। আত্মার আত্মীয়তার বন্ধনে ছেদ পড়েছে, মানুষগুলো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ধর্মকর্ম পালনের ক্ষেত্রেও আগের মতো সামাজিক বন্ধন নেই; প্রত্যেকটি মানুষ নিজের মতোই ধর্মকর্ম পালন করতে চায়। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানগুলো জাঁকজমকপূর্ণ হয় না। গুটি কতক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

বিভিন্ন কারণে গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েই চলেছে। অপরিকল্পিত গৃহায়ন নির্মাণের ফলে খাল-বিলগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় দেশি মাছগুলো হারিয়ে গেছে। এখন ইচ্ছে করলে দেশি মাছ পাওয়া কঠিন ব্যাপার। দেশি মাছের আদলে চাষের মাছ পাওয়া যায়, কিন্তু দেশি মাছের স্বাদ পাওয়া যায় না। সেই সঙ্গে দেশি ফলগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারাসহ দেশি ফলের গাছগুলো ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় দেশি ফলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে বিষাক্ত ফরমালিনযুক্ত ফল বাধ্য হয়ে খেতে হয়।

কাজী খোরশেদ আলম

সাধারণ সম্পাদক, বুড়িচং প্রেস ক্লাব, কুমিল্লা