• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১১ মহররম ১৪৪০
BK

উত্তাপ পেঁয়াজ বাজারে উদ্যোগ নেই সরকারের

উত্তাপ পেঁয়াজ বাজারে উদ্যোগ নেই সরকারের
সংরক্ষিত ছবি

গত কয়েক বছরই সিন্ডিকেট করে কারসাজির মাধ্যমে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েও বহাল তবিয়তে রয়েছেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা; উল্টো আরো দাম বাড়াতে উসকানি দেয়। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। কোরবানির ঈদের আগে গত দুই মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে নিত্যপণ্যটির এই দাম বাড়াকে সম্প্রতি ‘স্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন গতকাল বৃহস্পতিবার বাজার পরিদর্শন করে পেঁয়াজের দাম ‘স্থিতিশীল পেয়েছেন’।  সরকারের এমন ভূমিকাকে নেতিবাচক মনে করেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। বাংলাদেশের খবরকে তিনি বলেন, দেশের সরকার যদি পণ্যমূল্য নিয়ে মাথাব্যথা না দেখায়, সেটা বড় সমস্যা। সরকারের সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তা রয়েছে। কিন্তু একক পণ্যমূল্যের দিকে কোনো নজর নেই। ক্যাব সভাপতি বলেন, প্রতিবছরই পেঁয়াজ নিয়ে এমন সিন্ডিকেট হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কিন্তু সাধারণ মানুষের তো সমাধান দরকার। যেটি শুধু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকারই করতে পরে। নতুবা এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা আরো বেপরোয়া, সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হবে। এক সময় তাদের আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গত কয়েক দিন ২-১ টাকা করে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। খুচরা বাজারে এখন প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। আর ভারতের পেঁয়াজ ৪০ টাকার বেশি। যদিও দেশের সাধারণ মানুষ ৩০ টাকার বেশি দরে পেঁয়াজ কিনতে অভ্যস্ত নয়।

কয়েকটি সংস্থার তথ্য বলছে, গত ঈদুল ফিতরের পর (জুন মাস) বাজারে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ ৩০ টাকায় এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ২৫ টাকায় বিক্রি হয়। এখন আর সে সময়ের মধ্যে আমদানি মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং ভারত থেকে কোরবানির ঈদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে আরো বেশি পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। তার পরও গত এক মাসে দেশি পেঁয়াজের দাম ২২ শতাংশ এবং আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ১১ শতাংশ বেড়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি)।

পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ যে নেই সে প্রমাণ মেলে আমদানি করা পেঁয়াজের বিভিন্ন স্তরের পাইকারি ও খুচরা দাম দেখে। আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে জানা গেছে, বেনাপোল দিয়ে প্রতি টন পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে ২০৫ ডলারে। সে হিসাবে কেজিপ্রতি পেঁয়াজ পড়ে ১৮ টাকা। অন্যান্য খরচসহ এ পেঁয়াজ বেনাপোল স্থলবন্দরে পৌঁছাচ্ছে ২০ টাকার মধ্যে। কিন্তু এই পেঁয়াজই রাজধানীর পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৩৬ টাকায়। এদিকে আমদানিকারকদের আরেক পছন্দের বন্দর দিনাজপুরের হিলিতে গত কয়েক দিনে পেঁয়াজের দাম ৫ টাকা কমেছে। সেখানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২-২৫ টাকায়। কিন্তু এর কোনো প্রভাব দেশের বাজরগুলোয় পড়েনি। হিলির আমদানিকারকরা বলছেন, ঈদে পেঁয়াজের বাজার সহনীয় রাখতেই প্রচুর এলসি জমা দিয়েছেন তারা। ফলে ভারত থেকে প্রতি দিন ৭৫-৮০ ট্রাক পেঁয়াজ আসছে, যা অন্য সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ।

হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রফতারিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর রশিদ বলেন, আমদানির চাপে বন্দরে দাম কমলেও খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা নিজেদের যোগসাজশে পেঁয়াজের দাম কমাচ্ছেন না। তারা ঈদে অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করছেন। না হলে বন্দর থেকে বাজার পর্যন্ত যেতে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হতো না। 

পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে রাজধানীর শ্যামবাজারের এক আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বলেন, দীর্ঘ সময় নিয়ে বাজারে এ কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছেন কিছু বড় ব্যবসায়ী। প্রতিবছর সিন্ডিকেট করে সফল হচ্ছেন তারা।  সরকারও তাদের পক্ষে রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু বড় ব্যবসায়ী নয়, ছোট ব্যবসায়ীরাও এখন পেঁয়াজ মজুত করেন। প্রতিবছর দাম বৃদ্ধি স্বাভাবিক ঘটনা হওয়ায় এখন মজুতের জন্য পেঁয়াজ ‘হট আইটেম’। তবে এ বাজারের কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সভাপতি হাজী মো. সাঈদ বলেন, সবাই অযথা আড়তদারদের দোষারোপ করেন। বাজারের সব স্তরেই এখন সমস্যা রয়েছে। পাইকারি থেকে কম দামে পেঁয়াজ কিনে খুচরা ব্যবসায়ীরাও এখন দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার মনোবৃত্তিই পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ বলে জানা গেছে ফরিদপুর এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেও। দেশি পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় কারবার সেখানেই। সেখানকার কানাইপুর হাটের ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান বলেন, ফরিদপুরের পাইকারি বাজারে গত এক-দেড় মাস পেঁয়াজ কেনার হিড়িক ছিল। সেসব কোরবানির সময় ভালো দাম পাওয়ার আশায় মজুত রাখা হয়। তারা এখন দাম বৃদ্ধির সুযোগকে ‘ভালোমতো’ কাজে লাগাচ্ছেন।