• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৮ মহররম ১৪৪০
BK

অসাম্প্রদায়িক জনমানুষের কবি

অসাম্প্রদায়িক জনমানুষের কবি
সংগৃহীত ছবি

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। বিংশ শতকের তিরিশের দশকের পাঁচ মহান কবির পর তিনিই আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান ব্যক্তি হিসেবে প্রসিদ্ধ। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জনমানুষের আবেগ-অনুভূতি প্রবাহিত হয়েছে শামসুর রাহমানের কবিতায়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তার স্বকীয়তা ও সৃষ্টিশীলতার আত্মপ্রকাশ ঘটে। বাংলা কবিতার আধুনিকতার ধারায় শামসুর রাহমান এক নতুন মাত্রা যোগ করেন এবং সমকালকে ধারণ করেছেন সদাজাগ্রত সংবেদনশীলতায়। তাকে ‘নাগরিক কবি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

শামসুর রাহমান লিখেছেন জনমানুষের পক্ষে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য লেখেননি। বাঙালির শোষণ-পীড়ন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি, কখনো আবার সরাসরি। বিভিন্ন সভা, সমিতি, সম্মেলন ও মিছিলে তার অংশগ্রহণ, বক্তৃতা ও বিবৃতি প্রদান তাকে এক অনন্য জনব্যক্তিত্বে পরিণত করে। সব সময়ই তিনি জনগণের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট, দেশকালের প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে তার কবিতার প্রধান বিষয়। একজন কবি কখনো রাজনীতির প্রতি উদাসীন থাকতে পারেন না। শামসুর রাহমানও ছিলেন না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তার দুটি কবিতা অত্যন্ত জনপ্রিয়। একটি ‘স্বাধীনতা তুমি’, অপরটি ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’। মুক্তিযুদ্ধের সময়েই, এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি লেখেন যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত ও বেদনামথিত এ কবিতা দুটো-

১. তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,/সকিনা বিবির কপাল ভাঙলো/...তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,

অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতা-মাতার লাশের ওপর (তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা)

২. স্বাধীনতা তুমি/উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।/স্বাধীনতা তুমি/ বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ। (স্বাধীনতা তুমি)

স্বাধীনতাকে এখানে একজন কবি এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন এবং এমনই সাবলীল ও শৈল্পিক ভাষায় বর্ণনা করেছেন যে, যে কেউ এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারে এবং এ কাব্যের সৌন্দর্যের আলোয় জেগে ওঠে প্রাণ। আমরা অনুধাবন করি, আমাদের রক্তের ভেতর খেলা করে স্বাধীনতার স্বাদ— ‘যেমন ইচ্ছা লেখার আমার কবিতার খাতা’। আমাদের বুকের গভীর হতে ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিক আগুনের স্ফুলিঙ্গ— ‘এই বাংলায়/তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা’। এ কবিতা দুটো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘বন্দীশিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থে। যুদ্ধকালীন লেখা কবিতাগুচ্ছ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শেষে কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থটি অনন্য মর্যাদার অধিকারী। মুহাম্মদ ফরিদ হাসান বলেছেন, ‘শামসুর রাহমানের কবিতায় স্বাধীনতাপ্রত্যাশী মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগ যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি প্রকাশিত হয়েছে হানাদারদের নৃশংসতা ও বর্বরতা।’

‘আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’- ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সর্বোচ্চ আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ছাত্রনেতা আসাদের মৃত্যু। ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে পুলিশের গুলিতে নিহত আসাদের রক্তাক্ত শার্ট উঁচুতে তুলে ধরে প্রতিবাদী এক বিশাল মিছিল দেখে আলোড়িত হন শামসুর রাহমান এবং লেখেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। ১৯৬৮ সালের দিকে সমগ্র পাকিস্তানে ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব করেন আইয়ুব খান। এর প্রতিবাদে ৪১ জন সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী বিবৃতি দেন। এদের একজন ছিলেন শামসুর রাহমান। কবির ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ মর্মস্পর্শী এ কবিতাটি রচনার অনুপ্রেরণাও ছিল এর প্রতিবাদ।

এ কবিতাদুটো কবির ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন আবহমান বাঙলার শহীদদের উদ্দেশে। উল্লেখিত কবিতাদুটো ছাড়াও ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, ‘পুলিশ রিপোর্ট’, ‘হরতাল’, ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়’ কবিতাগুলোর ছত্রে ছত্রে লেগে আছে এক বিক্ষুব্ধ সময়ের ছাপ। তিনি রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও মিছিলে অগ্রবর্তী মানুষের আবেগ-অনুভূতি কবিতায় রূপ দিয়েছেন।

সমকালীন ঘটনার অসাধারণ শিল্পরূপ শামসুর রাহমানের কবিতা। বাঙালির নানা সংকট, আন্দোলন ও সংগ্রামে তিনি স্বতঃস্ফুর্ত সাড়া দিয়েছেন। তার কবিতা হয়ে উঠেছে সর্বসাধারণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, জীবনমুখী এবং একই সঙ্গে হূদয়স্পর্শী। জীবিতকালেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কবিদের প্রেরণার বটবৃক্ষ। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের আলোচিত কবি ব্যক্তিত্ব, আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জগতের কাণ্ডারি। সময়চেতনা শামসুর রাহমানের কবিতায় যেভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে, অন্য কারো কবিতায় এতটা প্রবল হতে দেখা যায় না।

শামসুর রাহমানের আবির্ভাবের সময়টা লক্ষ করা যাক। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এ সময় এবং পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে মোটেই অনুকূলে ছিল না। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগ, ১৯৪৮ সাল থেকে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে চক্রান্ত, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত এবং আশির দশকের সামরিক স্বৈরশাসন তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। এ সময় কবি-শিল্পীরাও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেন। শামসুর রাহমান লিখেছেন মৃত্যু অবধি ২০০৬ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশের নানা আন্দোলন-সংগ্রামকে তিনি কবিতার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন। তার কবিতায় জীবন-দর্শন, সমাজ ও রাজনীতি একাকার হয়ে গেছে।

রাজনীতির দানব বাঙালির ওপর যতবার হামলে পড়েছে ততবার তিনি জনগণের পক্ষে সাড়া দিয়েছেন। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে শামসুর রাহমানের কবিতায়। ন্যায়, যুক্তি ও প্রগতির পক্ষের সাহসী যোদ্ধা ছিলেন তিনি; জনমানুষের কবি, মানুষের কল্যাণ, শান্তি আর স্বস্তি নির্মাণের নিবিড় ভাষ্যকার।