• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK
জাক প্রেভের

কেঁপে উঠছে প্রেম

কেঁপে উঠছে প্রেম

‘নিজের নৃগোষ্ঠীর লোকভাষাকে বিশুদ্ধ করে তুলেই কবিতা লিখতে হবে কবিদের।’ মালার্মের সূত্র ধরে এলিয়ট যখন তার ‘কাব্যচতুষ্টয়ে’ এই কথাগুলো বললেন, তখনই আধুনিক ফরাসি কবিতার প্রতি দৃষ্টি পড়ল আধুনিক পাঠকের। তারা আবিষ্কার করলেন আত্মভাবনার দ্বারা প্রাণিত ‘প্রথম দ্রষ্টা, কবিদের রাজা’ বোদলেয়ারকে। তবে বোদলেয়ার নয়, বস্তুপৃথিবীর পরিবর্তে তার উদ্ভাসকে কবিতায় প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছিলেন মালার্মে। কবিতার ভাষা তখন থেকে হয়ে উঠতে থাকল ইঙ্গিতময়। এই পথে ক্লদ মনে, প্রতীতিবাদী (ইমপ্রেশনিস্ট) এই চিত্রশিল্পীর ‘অন্তর্গত পৃথিবীর কল্পলোক’ ফরাসি কাব্যতত্ত্ব বলে চিহ্নিত হলো। আমূল বদলে দিল ফরাসি কবিতার মানচিত্র। কবিতায়, ভূমণ্ডলজুড়ে, প্রায় শুরু থেকেই ছিল ধ্বনিমূর্ছনার প্রাধান্য। কিন্তু ফরাসি কবিতা সরে এলো গদ্য আর চিন্তনের দিকে। তবে পুরোপুরি যে সরে আসতে পেরেছে তা নয়। সুরিয়্যালিস্ত মনোবাস্তবতার গহনে শুরু হলো কবিদের পরিভ্রমণ : ‘রোদ্দুরে কিছু পাথর/দম-ফুরানো এক চাকা/বসে যাওয়া চাকার কেন্দ্র যাতে সে ঘুরে চলে/আলো করে তোলে লিখে চলে।’ এরকমই বলতে পারেন ফরাসি এক তরুণ কবি জাক দ্যুপ্যাঁ।

ফরাসি কবিতা প্রথম থেকেই আমার খুব প্রিয়। সে কি ওই ইঙ্গিত বা উদ্ভাসের জন্য? উদ্ভাস, আছে উৎপল কুমার বসুর মধ্যে, আছে এই সময়ের বাংলাদেশের তরুণ কবিদের মধ্যেও। এ নিয়ে পরে কোনো একসময়ে লেখা যাবে। কিন্তু এখানে বলছি এক ফরাসি কবির কথা, ঠিক ১৯০০ সালে যার জন্ম। জাক প্রেভের। ‘ও মাথা দিয়ে বলে না/কিন্তু হূদয় দিয়ে বলে হ্যাঁ/ও যা কিছু ভালোবাসে তাকে বলে হ্যাঁ।’ প্রেভের জন্মের আটচল্লিশ বছর পরে বেরিয়েছিল তাঁর প্রথম কবিতার বই চধৎড়ষবং বা ‘কথা’। নামটা কথা বটে, কিন্তু কথার কবিতাকে নিয়ে এসেছিলেন গানের কাছে। ফ্রান্সে বা ফ্রান্সের বাইরে তার কবিতাকে গান হিসেবে গেয়েছেন এডিথ পিয়াফ ও জোন বায়েজের মতো শিল্পীরা। গান বেঁধেছেন হাঙ্গেরির প্রখ্যাত সুরকার জোসেফ কসমা। বব ডিলানের ‘আ হার্ড রেইন্স্ আ-গনা ফল’ গানটির সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে প্রেভেরের সমধর্মী একটি কবিতার। ফরাসি শিল্পী জুলিয়েৎ গ্রেকো ও ইভ মত্যাঁ গেয়েছেন কসমার সুর দেওয়া ‘ঝরাপাতা’ গানটি, প্রথমে যা লেখা হয়েছিল কবিতা হিসেবেই। ফরাসি অভিজ্ঞানে ঋদ্ধ কবি অরুণ মিত্র প্রেভের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘গল্পচ্ছলে কবিতা পড়িয়ে নিতে তিনি জানেন কিংবা গানের মতো করে কবিতা গাইয়ে নিতে।’

গল্প বলেন প্রেভের ঠিকই, কিন্তু তা আমাদের খুব চেনাজানা মানুষের গল্প। তুঙ্গস্পর্শী ভাবনার রেখাচিত্র ফুটে ওঠে কবিতার শেষের কিছু বাক্যে। সেই যে একটা কবিতায় লিখেছেন, পাখির বাজার, ফুলের বাজার আর লোহার বাজারে গিয়ে প্রিয়ার জন্য সবই কিনতে পারলেও বাঁদীর বাজারে গিয়ে খুঁজে পাননি স্বয়ং প্রিয়াকে। বোদলেয়ারের বিবমিষা বা পঙ্ক নেই তাঁর কবিতায়। আছে মানুষের জন্য ভালোবাসার করুণাধারা। আর সেই কুকুরটা? ‘হাসপাতালের করিডোরে এক বোকা কুকুর/খুঁজে বেড়ায় তার প্রভুকে যে গত গ্রীষ্মে মারা গেছে।’ ভীষণ কেঁপে উঠি এই কবিতাটা পড়তে পড়তে। অথবা এটা, কী-যে প্রশান্তি এনে দেয় : ‘যে শিশুরা ভালোবাসে/তারা যে রাত্তিরের চেয়ে অনেক দূরে/দিনের অনেক ওপরে/প্রথম প্রেমের চোখ-ধাঁধানো আলোর ঢেউয়ের ভেতর’ সঞ্চারিত হয়ে যায়। মমত্ব ছিল কুকুরের প্রতি, কিন্তু স্বপ্ন ছিল শিশুদের নিয়ে। আরেকটি কবিতার শুরু তাই কী এরকম হতে পেরেছে : ‘একটি শিশু স্বপ্ন দেখতে দেখতে হাঁটছে, তার পেছনে হাসতে হাসতে যাচ্ছে স্বপ্ন।’ কাছের আর দূরের স্বপ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে, বেদনার ভার তাকে বিষণ্ন করে রেখেছে কিন্তু ভালোবাসা সরে যায়নি এতটুকু। প্রেভের এভাবেই জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন প্রতিকূলতার রূপ আর রহস্য, রক্ত আর উদ্দীপনা, সংহার আর সৌন্দর্য। লিখে রেখেছেন প্রায় সবই, গল্পের ঢঙে, চারপাশে প্রসারিত জগতের কথা। ‘যে জগৎ বিষণ্ন আর আনন্দিত/কোমল আর হিংস্র/বাস্তব আর পরাবাস্তব/ ভয়ঙ্কর আর মজাদার/ রাত্রিকালীন আর দিবাকালীন/ স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক/ দারুণ সুন্দর।’

গল্প বেশ ঘনিয়ে ওঠে দু-দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ এই কবির কবিতায়। এ কারণেই চলচ্চিত্রের প্রতি ঝুঁকেছিলেন তিনি। চমৎকার সব চিত্রনাট্য লিখেছেন। বব ডিলান ১৯৭৫ সালে ‘রেনালডো অ্যান্ড ক্লারা’ নামে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। তাতে অভিনয় করেছিলেন জোন বায়েজ, সারা ডিলান প্রমুখ। ছবিটি ম্যানহেইম-হাইডেলবার্গ চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃতও হয়। অনেকে মনে করেন, এই ছবিটি ১৯৪৭ সালে মার্সেল কার্নে আর প্রেভেরের যৌথসৃষ্টি ‘জাঁফা দ্যু পারাদি’র (স্বর্গে শিশুরা) অনুসৃতি। ছবিটি অস্কার নমিনেশনও পেয়েছিল চিত্রনাট্যের জন্যে, যার রচয়িতা ছিলেন প্রেভের। আসলে গত শতকের পুরো তৃতীয় ও চতুর্থ দশক জুড়ে চিত্রনাট্যকার হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন কবি জাক প্রেভের। তার চিত্রনাট্যগুলোও ছিল কাব্যিক ও মর্মস্পর্শী।

প্রেভেরের কবিতার ঐশ্বর্য বিশুদ্ধ সারল্য আর অন্তরঙ্গ স্বরের কারণে মুগ্ধ করে আমাকে। একসময় প্যারির কাছে থাকতেন যে নইয়িসুর স্যেনে, পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন যেসব ভবঘুরে গায়ক আর ভাঁড়েদের সঙ্গে, তাদের স্মৃতিচারণায় বিধুর বিষণ্ন মনস্তাপ আর পরিহাসে স্মৃতিময় তার অনেক কবিতা। অনেক কবিতায় চলিষ্ণু মানুষ : ‘আমি দেখেছি একটি লোককে যে কুকুর নিয়ে চলেছে/আমি দেখেছি একজনকে যে কাঁদছিল/আমি দেখেছি একজনকে যে একটা চার্চে ঢুকছিল/আমি দেখেছি আরেকজনকে যে চার্চ থেকে বেরুচ্ছিল...।’ কবিতায় অনেক মানুষের এই যে একের পর এক সচল দৃশ্যায়ন ঘটল, একে মনে হবে কোনো নাটক বা চলচ্চিত্রেরই দৃশ্য। এই দৃশ্যগুলো নির্মাণ করা হয়েছে যেন কাট-শট ব্যবহার করে। একই সঙ্গে বাস্তব ও পরাবাস্তব। আঁদ্রে ব্রেতোঁকে ঘিরে তিনিও যুক্ত হয়েছিলেন সুরিয়্যালিস্ত আন্দোলনে। চিত্রনাট্য রচনা ও কবিতা লেখা ছাড়াও লিখেছেন ছোট ছোট নাটিকা। পরাবাস্তবধর্মী শিল্পের প্রতিও ঝোঁক তৈরি হয়েছিল তাঁর। কোলাজধর্মী কৌতুকপ্রদ শিল্পকর্মের প্রদর্শনীও হয়েছে দক্ষিণ ফ্রান্সের আঁতিবে।

প্রেভেরের রচিত ও নির্মিত সবকিছুই ছিল মানবিকতায় উদ্ভাসিত। বাবা গরিবদের জন্য কাজ করতেন। তিনি নিজেও খুব কাছ থেকে দেখেছেন যে ব্রাত্যজনদের, তাদের কথাই উঠে এসেছে তার লেখায়। সাহিত্য রচনার জন্য যে শিক্ষাদীক্ষার দরকার আছে, তাও মনে করতেন না : ‘তারাই সবচেয়ে ভালো সাহিত্য বোঝেন যারা সাহিত্য ভালোবাসেন।’ দীর্ঘ রোগভোগের পর ক্যানসার আক্রান্ত এই মহান কবি ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ১৯৭৭ সালে মারা যান। মৃত্যুর পর একসময়ের সহযোগী কার্নে লিখেছিলেন : ‘তিনি ছিলেন ফরাসি সিনেমার এক এবং একমাত্র কবি, যার রসবোধ এবং কবিতা শিল্পের শিখর স্পর্শ করেছিল।’ একটা কবিতায় বলেছিলেন, প্রেমের মাঝেই ‘মৃত্যু কান্নার আড়ালে আর শিশুটি জীবনে।’