• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৮ সফর ১৪৩৯
BK
ভিন্নমত

কোরবানির মূল বিষয় উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা

কোরবানির মূল বিষয় উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা
সংগৃহীত ছবি

খুব কাছেই কোরবানির ঈদ। মুসলমানদের বছরে দুটি ঈদ রয়েছে। একটি হলো ঈদুল ফিতর- যাকে আমরা রমজানের ঈদ বলি, আর অপরটি হলো ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ঈদ শব্দের অর্থ হলো পুনরাগমন। কিছু নির্দিষ্ট সময় বা দিন পর ঘুরে আসা কোনো একটি ধর্মীয় উৎসব বা অনুষ্ঠান। প্রত্যেক ঈদেরই কিছু না কিছু নির্দিষ্ট নিয়মনীতি রয়েছে। যেমন ঈদুল ফিতরের সময় মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা করা, ফেতরা আদায় করা, ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়া ইত্যাদি। ঠিক তেমনিভাবে ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে গিয়ে সালাত আদায় করা, এরপর কোরবানি করা ও কোরবানির গোশত বিতরণ করা ইত্যাদি।

আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বেকার কথা। ইরাকের ‘ঊর’ নামক স্থানে হজরত ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। ইবরাহীম (আ.) তার পিতা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম, কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির বিরোধিতা করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং তাওহিদ প্রচারে নিজের অবস্থান বজায় রাখেন। একসময় তিনি ইরাক থেকে ফিলিস্তিন হিজরত করেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। ৮৬ বছর বয়সে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে প্রথম পুত্র সন্তান ইসমাঈলের (আ.) জন্ম হয়।

নবীরা পরীক্ষায় ভরপুর। আল্লাহতায়ালা এই পুত্রসন্তান দিয়ে ইবরাহীম (আ.)কে এক পরীক্ষায় ফেলেন। ইবরাহীম (আ.)-কে স্বপ্নে দেখান যে, পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করতে হবে। ইবরাহীম (আ.) নবী ছিলেন আর নবীদের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই নয়। ওটা ছিল আল্লাহর বাণী। ইবরাহীম (আ.) পুত্র ইসমাঈল (আ.) চলাফেরার বয়সে উপনীত হলে তাকে তার স্বপ্নের কথা বললেন। ইসমাঈল (আ.) পিতার এ কথায় একটুও ব্যথিত হননি। বরং তিনি বলেন, ‘হে আমার পিতা আপনাকে মহান আল্লাহ যে আদেশ করেছেন সেটা আপনি পালন করুন। ইনশাল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ ইসমাঈল (আ.)-কে শুইয়ে দিয়ে আল্লাহর আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে ইবরাহীম (আ.) ছুরি চালিয়ে দিলেন। আল্লাহ মহান। তিনি মানুষের অন্তরের খবর জানেন ও বোঝেন। তিনি মানুষের মন পরীক্ষা করেন। তিনি ইসমাঈলকে ছুরির নিচ থেকে সরিয়ে নিয়ে জান্নাতি একটি দুম্বা ছুরির নিচে শুইয়ে দিয়ে কোরবানির কাজ সম্পন্ন করালেন। সেখান থেকেই কোরবানির শুরু। মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আ.) সর্বপ্রথম কোরবানিকারী।

কোরবানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নবীর হাদিসের আলোকে সঠিকভাবে কোরবানির পশু নির্বাচন করা। স্বাস্থ্যবান, দেখতে সুদর্শন পশু কোরবানি করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। রোগ-ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত, অসুস্থ, খোঁড়া, কানা ইত্যাদি দোষে দুষ্ট ত্রুটিযুক্ত পশু কোরবানি দিতে নিষেধ রয়েছে। কোরবানিকারী হজে না গিয়েও হজের সওয়াব পেতে পারেন। এজন্য হাজিদের অনুসরণ করতেই গুরুত্ব আরোপ করে রসুল (সা.) বলেছেন ‘যদি তোমাদের মধ্যে কেউ কোরবানির নিয়ত করে, তবে জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখার পর থেকে সে যেন চুল, নখ স্পর্শ না করে।’

কোরবানির মূল বিষয় ছিল উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা। নিজের সম্পদের কিছু অংশ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পশু জবাই করা হলো কোরবানি। কোরবানির পশুগুলোর গোশত বা রক্ত কোনোটিই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় আমাদের তাকওয়া। আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আল্লাহর রাস্তায় নিজের আবেগ কোরবানি দেওয়াই কোরবানি। সৃষ্টিকর্তা মানুষের মনের আগ্রহ ও আবেগই দেখেন এবং তার ওপরই পুরস্কার দেন। কোরবানির গোশত কে কতটুকু খেয়েছে সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা হলো মনের কোরবানি। আল্লাহর প্রতি মানুষের আনুগত্যই এখানে বিবেচ্য বিষয়।

নিজেদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে আমোদ-প্রমোদে গোশত খাব। সবাই কোরবানি দিচ্ছে আমাদেরও না দিলে লোকে কী বলে, কিছু টাকা-পয়সা হয়েছে এখন কোরবানি না দিলে মানুষ মন্দ বলবে; এমনিতেও গোশত কিনে খেতে হবে, তার থেকে কোরবানি করলে কোরবানিও হয়ে গেল আবার গোশত কেনার খরচটাও বাঁচল— এমন চিন্তাভাবনা নিয়ে কোরবানি করলে সেটা সহিহ হবে না, কোরবানিও হবে না। কোরবানি করতে হবে মনের থেকে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর রাজি, খুশি ও সন্তুষ্টি।

গরিব ও অসহায় দুস্থ মানুষদের খাওয়ানোর উদ্দেশ্য এবং আগ্রহ কোরবানির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোরবানির গোশতকে সমান তিন ভাগ করে এক ভাগ পরিবার, এক ভাগ আত্মীয় ও এক ভাগ দরিদ্র্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। এটাই কোরবানির গোশত বণ্টনের সাধারণ নিয়ম। আর কোরবানির ক্ষেত্রে মূল সুন্নত হলো ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কোরবানি করা।

ইসলামী মতে, মুসলমান মুসলমানের ভাই—এটাই সত্য। আর এই সত্যকে মাথায় রেখে মিলেমিশে কোরবানি করতে হবে। কোরবানির গোশত আশপাশের দুস্থ-দরিদ্র মানুষের হক। এই হক নষ্ট করা যাবে না। কোনো রেষারেষি নয়। মনের দিক থেকে কোমলতম হয়ে চলাই ইসলামের আদর্শ।

এস আর শানু খান

নিবন্ধকার