• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

প্রসঙ্গ যখন চিকিৎসাসেবা

প্রসঙ্গ যখন চিকিৎসাসেবা

চিকিৎসাসেবা নিয়ে হয়তো এটা আমার ৫-৬ নম্বর লেখা। একবার ‘ঢাকামুখী নাকি টাকামুখী ডাক্তার’ আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। সে লেখায় কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গেও কথা বলি। লেখার শিরোনাম শুনে ঢাকা শহরে বসবাসরত ডাক্তাররা বলেছিলেন, ‘ঢাকাও মুখী টাকাও মুখী’। কারণ জানতে চাইলে বললেন, ‘ঢাকায় আছে টাকা’। সুন্দর জবাব। ‘পেশেন্ট প্রেসক্রিপশন এবং কসাইখানা’ লেখাটি লিখতে গিয়ে কথা বলেছি হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিদের সঙ্গে। এখন সে হাসপাতালে আমি গেলেই দ্রুত কাজ সারিয়ে দিয়ে বিদায় দেয়, কারণ উপস্থিত থাকলেই টিকটিকির মতো এদিক ওদিক তাকাই বলে।

একটা গল্প বলি— শায়লার বুকের ব্যথা ৬-৭ বছর। এই রাজধানীতেই চিকিৎসা করানো হয়েছে। ডাক্তার বলেছে ওর হার্টের সমস্যা। এরই মাঝে রিংও পরানো হয়েছে। আবারো ব্যথা, এবার আর দেশে নয়, বাইরেই যাবে, একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসবে। স্বামী হায়দারসহ যায় সিঙ্গাপুরে, যাওয়ার সময় নিয়ে যায় আগের সব কাগজপত্র। ওখানকার ডাক্তাররা শায়লাকে দেখে আর কাগজপত্র দেখে জিজ্ঞেস করে এসব কার কাগজপত্র। শায়লার কাগজপত্র শুনে ওদের মাথায় বাজ পড়ে যেন। শায়লার কখনো হার্টের সমস্যাই ছিল না, ওকে রিং পরানোর তো কথাই না। আসলেও রিং পরায়নি। তাহলে শায়েলার এখানকার ডাক্তার কার এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালো? কাকে রিং পরালো? কেন চিকিৎসা বাবদ ৫-৬ লাখ টাকা নিল। শায়লা দেশে এসে ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করে। ডাক্তার উল্টো ভয় দেখায়, মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। এমনকি, মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বলে, যে ৫-৬ লাখ খরচ হয়েছে, তা ডাক্তার দিয়ে দেবে। কিন্তু মামলা তুলে নিতে হবে। ঘটনা জানতে পারি স্কুল জীবনের সহপাঠীর কাছে, শুনেছি বছর খানেক আগে। এটা বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার সামান্য নমুনা।

এই চিত্রই বলে দেয়, কেন দেশের মানুষ দেশে চিকিৎসা না করিয়ে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করায়। এখন এর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, চিকিৎসার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিমালা এবং কৌশল নির্ধারণ করা আছে বলে জানা নেই। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বিদেশগামীদের বিষয়ে কোনো তথ্যও সংরক্ষণ করা নেই। ভারতের হেলথ সার্ভিস এক্সপোর্ট ২০১৫-১৬ জরিপে দেখা যায়, ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪ লাখ ৬০ হাজার রোগীর মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজারই বাংলাদেশের। যাদের টাকা-পয়সা বেশি, তারা ভারতে না গিয়ে চলে যান থাইল্যান্ডে, সিঙ্গাপুরে। অপেক্ষাকৃত ভারতের হাসপাতালগুলোয় বাংলাদেশের রোগীরা যান বেশি।

চিকিৎসকদের সঠিক রোগ নির্ণয়, ভালো আচরণ, প্রয়োজনের বাইরে একগাদা টেস্ট না করানো, সর্বোপরি তুলনামূলক কম খরচে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নিশ্চয়তা বাংলাদেশের মানুষের বিদেশে চিকিৎসা নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। রোগীর যত বড় লাইন হোক না কেন, একজন রোগীকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ ও দেখার জন্য যতক্ষণ সময় লাগবে, ততক্ষণই সেখানকার চিকিৎসকরা দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশে একটা রোগ নিয়ে যাবেন, আপনাকে তারা ৮-১০টা টেস্ট ধরিয়ে দেবেন। শুধু কি তাই? ৮-১০টা টেস্ট দিয়ে নিচে আবার লিখে দেবেন কোথা থেকে করাবেন, তাও। ৮-১০ টেস্ট দিয়ে হাসি মুখে বলবেন— ‘এই ঠিকানায় যাবেন, এটা দেখালেই ১০%-২০% কমিশন দেবে আপনাকে।’ ১০% কমিশন দিয়ে ডাক্তার যে ৩টি টেস্ট বেশি করিয়ে নিলেন, তা তো কেউ টেরই পায় না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে বলেন, ‘ভারতের অন্তত ৩০০ হাসপাতালের এজেন্ট এদেশে কাজ করছে। যেসব রোগী ভারতে চিকিৎসা নিতে যান তাদের ৮০ শতাংশকেই আমরা চিকিৎসা দিতে সক্ষম। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, এর মধ্য থেকেই আমরা আমাদের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন করছি।’ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব মনে করেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে এটা মানসিকতার বিষয়। তবে কখনো-কখনো চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিছু চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোয় উন্নত প্রযুক্তি এখনো আসেনি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।’ অনেকের মতে অন্য দেশে না গিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা দেশের ভেতরের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেন না বিধায় বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার মান নিম্নগামী। তারা যদি দেশের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেন, তাহলে এখানকার ডাক্তাররা তাদের কর্মস্থলের প্রতি মনোযোগী হতেন। শুধু তাই নয়, হাসপাতালগুলোয়  সেবার মান কেমন হচ্ছে তাও বুঝতে পারতেন। এক হিসাবে বলা হয় সারা দেশে যে ১৫ হাজার বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে তার অর্ধেকই ঢাকায়। এত এত চিকিৎসা কেন্দ্র, তারপরও মানুষ কষ্ট করে বিদেশ চলে যাচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, এগুলোর সিংহভাগই চিকিৎসার নামে ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে চিকিৎসা গৌণ, ব্যবসাই মুখ্য। তবে এ থেকে উত্তরণ জরুরি। কেননা, সিংহভাগ সাধারণ মানুষের যথাযথ চিকিৎসা প্রদানে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। আমাদের চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধিতে এখন এটিই জরুরি।