• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ২৪ সফর ১৪৩৯
BK

নজরুলের গান

নজরুলের গান
সংরক্ষিত ছবি

বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লিখিত গানগুলো হচ্ছে নজরুলসঙ্গীত বা নজরুলগীতি। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, নজরুল তার সীমিত কর্মজীবনে প্রায় ৪,০০০ (চার হাজার)-এর মতো গান রচনা করেছেন। পৃথিবীর কোনো ভাষায় এককভাবে এত বেশিসংখ্যক গান রচনার উদাহরণ নেই। নজরুলের গানের বড় একটি অংশ তারই নিজের সুরারোপিত। নজরুলের জীবদ্দশায় তার গানের কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তার মধ্যে রয়েছে— গানের মালা, গুলবাগিচা, গীতি শতদল, বুলবুল, চন্দ্রবিন্দু, রাঙা-জবা, মহুয়ার গান, সন্ধ্যা ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে আরো গান গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে গান লিখতেন, এ কারণে অনুমান করা হয় প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অভাবে বহুগান হারিয়ে গেছে। নজরুলের ‘সন্ধ্যা’ গ্রন্থ থেকে ‘চল চল চল ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল’ গানটিকে বাংলাদেশের ‘রণসঙ্গীত’ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। শ্রোতাদের পচ্ছন্দানুসারে বিবিসি বাংলার গান সর্বকালের সেরা ২০টি গানের মধ্যে ‘কারার ওই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ গানটি ১৬তম স্থান এবং ‘চল চল চল ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল’ গানটিকে ১৮তম হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

নজরুলের গানকে বাংলা গানের বিচিত্র সুরের উৎস বলা হয়ে থাকে। নজরুল একই সঙ্গে গান লিখেছেন, সুরারোপ এবং কণ্ঠ দিয়েছেন। সঙ্গীতাঙ্গনের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কথা প্রচলিত যে, নজরুল রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে গেছেন তাঁর গানের সংখ্যাগত দিকে দিয়ে। নজরুলের গানগুলোকে ১০টি ভাগে বিভাজন করা হয়েছে। এগুলো হলো— ভক্তিমূলক গান, প্রণয়গীতি, প্রকৃতিবন্দনা, দেশাত্মোবোধক গান, রাগপ্রধান গান, হাসির গান, ব্যঙ্গাত্মক গান, সমবেত গান, রণসঙ্গীত এবং বিদেশিসুরাশ্রিত গান। তাছাড়া নজরুল বিশেষজ্ঞ আবদুল আজীজ আল আমান নজরুলের গানের বিষয় ও সুরগত বৈচিত্র্য বর্ণনা করতে গিয়ে নজরুলের গানগুলোকে এক গোত্রের নয়, বিভিন্ন শ্রেণির বলে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘নজরুল একাধারে গজল গান, কাব্য-সঙ্গীত, প্রেমগীতি, ঋতু-সঙ্গীত, খেয়াল, রাগপ্রধান, হাসির গান, কোরাস গান, দেশাত্মবোধক গান, গণসঙ্গীত, শ্রমিক-কৃষকের গান, ধীবরের গান, ছাদপেটার গান, তরুণ বা ছাত্রদলের গান, মার্চ-সঙ্গীত, লোকগীতি, শ্যামা, কীর্তন, ভক্তিগান, ইসলামী সঙ্গীত, শিশুসঙ্গীত, নৃত্যসঙ্গীত, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, সাম্পানের গান, ঝুমুর, সাঁওতালি, লাউনী, কাজরী, বাউল, মুর্শেদী এবং বিদেশি সুরের আদলেও গান রচনা করেছেন। এছাড়া লুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় রাগ-রাগিণীকে অবলম্বন করে ‘হারমণি’ পর্যায়ের গান ও নতুন সৃষ্ট রাগ-রাগিণীর ওপর ভিত্তি করে লেখা ‘নবরাগ’ পর্যায়ের গানগুলো নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভার অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় বহন করে।’ নজরুল নিজেই তার গানের স্বরলিপি নির্মাণ করেছেন। নজরুলের গানে সুর, তাল, লয়, ভাষা, ব্যঞ্জনা, গীতরস এক কথায় সঙ্গীতের ক্ষেত্রে যত ধরনের সুরের মাত্রা আছে এ সবকিছুর সমন্বয়ে সঙ্গীত জগতে নজরুল এক কিংবদন্তি গীতিকার হিসেবে সমাদৃত।

সুরকার এবং গীতিকার এই দুটো গুণসহ সঙ্গীতকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ললিতকলা শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন অদ্বিতীয়। জাতীয় জাগরণে এবং গণমুক্তির আহবানে নজরুলের গানের অবদান অনস্বীকার্য। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত নজরুলের বৈপ্লবিক চেতনার সঙ্গীত ও সুর অন্যন্য অবদান রেখেছে। অন্য কোনো কবি বা গীতিকার ও সুরকারের ক্ষেত্রে এসব বিষয় পরিলক্ষিত হয়নি। এই সৃষ্টিশীল তূর্য নিনাদের বৈপ্লবিক ধারায় অবিরাম সুরের মাধ্যমে অর্ধমৃত দেশ, জাতি ও সমাজকে জাগিয়ে তুলেছেন নজরুল। নজরুলের অভীষ্ট লক্ষ্য সেই সুরে বেজে ওঠে— ‘এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী/আর এক হাতে রণতূর্য’। যুবসমাজ এবং পথহারা পথিকের উদ্ভ্রান্ত গতিকে রুখে দিয়ে নজরুল গেয়ে উঠেছিলেন জীবনের দুর্বার এক আহবান— ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে/কালবোশেখীর ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর’।

নজরুলের সমসাময়িককালে অন্যান্য কবি সাহিত্যিক যারা ছিলেন তারা প্রায়ই নজরুলের বিস্ময়কর প্রতিভার নানা দিক সমালোচনা করতেন। নজরুল নিজেও এ ব্যাপারগুলো স্বীকার করতেন। নজরুলের উক্তি— ‘রবীন্দ্রনাথ আমাকে প্রায়ই বলতেন, দেখ উন্মাদ তোর জীবনে শেলীর মত, কীটসের মত খুব বড় একটা ট্রাজেডি আছে। তুই প্রস্তুত হ।’ নজরুল ঠিক সেরকম ট্র্যাজেডিতে পড়েছিলেন বরীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরে। নজরুল নিজের সঙ্গীত সম্পর্কে বলতে গিয়ে  বলেছেন, ‘সাহিত্যে কতটুকু দিতে পেরেছি জানি না, তবে সঙ্গীতে যা দিয়েছি তা অসীম।’ নজরুলের সব গানের মধ্যে রেকর্ডবদ্ধ হয়েছে দেড় সহস্রাধিক গান। এই রেকর্ডগুলো একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে পাওয়া যায় না। আঙ্গুর বালা, ইন্দুবালা, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ, গোস্বামী, হরিমতি, দিপালী নাগ, ধীরেন দাস, মোহাম্মদ কাসেম, কে মল্লিক, আব্বাস উদ্দিন প্রমুখ শিল্পীরা নজরুলের গান গেয়েছেন।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামী  ১২ ভাদ্র ১৪২৫ বাংলা অর্থাৎ আগামী ২৭ আগষ্ট ২০১৮। যতটুকু জানা যায়, নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর বাংলাদেশে নজরুল সঙ্গীতের চর্চা বাড়তে থাকে এবং নজরুলের সঙ্গীত নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। তবে যথেষ্ট নয়, নজরুল সঙ্গীতের চর্চা ব্যাপক আকারে করার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। দীর্ঘদিন যাবৎ নজরুল ইনস্টিটিউট, ছায়ানট, নজরুল শিল্পী সংস্থা, নজরুল একাডেমি, নজরুল সঙ্গীত পরিষদসহ একাধিক সংগঠন নজরুলসঙ্গীতের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। নজরুলের গান হূদয়তন্ত্রীতে ভাব বিহ্বলতায় অনিন্দ্য প্রকাশের অপরূপ সুর মূর্ছনায় সঙ্গীত ও মানবিক সব মন্ত্রের অনন্য সংযোজনের এক মোহন প্রকাশ। নজরুলের গান আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনকে করেছে পরিশীলিত ও পরিশুদ্ধ।

নজরুল এবং নজরুলের গান আমাদের সকল কাজের অনুপ্রেরণার উৎস। নজরুল আমাদের নতুন করে জানতে, শিখতে ও চলতে শেখাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। যুগে যুগে নজরুলের সঙ্গীত আমাদের অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করবে। নজরুলের গান নিয়ে ব্যাপক গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এমনটা প্রত্যাশা করা যেতে পারে। নজরুল তাঁর গানের অমিত বাণী ও সুরের ঝরনাধারায় সিঞ্চিত করেছেন বাঙালি জাতিকে। নজরুল বাঙালি মনীষার এক মহত্তম বিকাশ, বাঙালির সৃষ্টিশীলতার এক তুঙ্গীয় নিদর্শন। নজরুলের গান হোক আমাদের অলঙ্কার। ৎ