• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ সফর ১৪৩৯
BK

কম দামে চামড়া কিনেও শঙ্কায় আড়তদাররা

কম দামে চামড়া কিনেও শঙ্কায় আড়তদাররা
সংরক্ষিত ছবি

রাজধানীর হাজারীবাগে সিইটিপি ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চামড়া শিল্প পরিচালনা করা ট্যানারি মালিকরা সাভারের ট্যানারিপল্লিতে সেই সিইটিপি না থাকার অজুহাতেই চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন। এদিকে, চট্টগ্রামের ট্যানারিগুলোও একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নামমাত্র দামে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ মানুষ। তবে কম দামে চামড়া কিনেও অনেকটাই বেকায়দায় আড়তদাররা। কারণ, মৌসুুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেনা দামের সঙ্গে প্রক্রিয়াকরণ খরচ মিলালে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি হবে। আবার অনেক এলাকায় চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এ অবস্থায় চামড়া পাচারের আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারা দেশ থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে জানা গেছে,  পুঁজির সঙ্কট ও বকেয়া টাকা আটকে যাওয়ায় অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত চামড়া সংগ্রহ করা যায়নি। তিন থেকে চার বছর ধরে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা আড়ৎদারদের পাওনা টাকা আটকে রেখেছেন। এ কারণে আড়তদাররাও ফড়িয়াদের অর্থ দিতে পারছেন না। আবার চামড়া সংগ্রহের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও তা কেবল ট্যানারি মালিকদের জন্য। এমন পরিস্থিতিতে লোকসান দিয়ে মূলধন হারিয়ে অনেক আড়তদার ব্যবসাও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

ফেনী প্রতিনিধি জানান, চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। পল্লী এলাকায় এবার চামড়া বিক্রি হয়েছে গত বছরের অর্ধেক দামে। ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ছাড়লের চামড়া। ক্রেতা না থাকায় অনেকে চামড়া বিক্রি করতে পারেনি। ফুলগাজীর বন্দুয়া দৌলতপুর গ্রামের কাজী জামাল উদ্দিন জানান, এক লাখ ৬৩ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন ৩৮০ টাকায়। ৭০ হাজার টাকার গরুর চামড়ার ক্রেতা না থাকায় তিনি ক্ষোভে দুঃখে সে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন। মহিষের চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ৪০০ টাকায় উঠেছে বলে ছাগলনাইয়ার রাধানগর ইউনিয়নের আবুল কাশেমসহ একাধিক ব্যক্তি জানান।

জানা যায়, ফেনীর মূল চামড়া বাজার পাঁচগাছিয়াসহ আশপাশের বাজারের অর্ধশত আড়তদার গতবার ৮০ থেকে ৯০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। এবার আড়তদারের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে; আর চামড়ার সংগ্রহ ৫০ হাজারে। ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা বলছেন, তিন বছর ধরে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চামড়ার দাম পরিশোধ করছেন না। ফলে অনেকেই পুঁজি সঙ্কটে রয়েছেন। ব্যাংকে দায় বাড়ছে অনেকের। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। পাঁচগাছিয়া বাজারের চামড়া আড়তদার নূর নবী জানান, তিন বছর চামড়া বিক্রি বাবদ ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রায় দুই কোটি টাকা পাবেন। এ বছর ওই ট্যানারি মালিকরা কোনো টাকা পরিশোধ করেননি। গত বছর মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তিনি প্রায় ছয় হাজার চামড়া কিনেছিলেন। এবার মাত্র আড়াই হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছেন।

সিলেট ব্যুরো জানিয়েছে, ট্যানারি মালিকদের কাছে টাকা আটকে থাকায় সিলেটেও চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। সিলেট শাহজালাল চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শামীম আহমদ জানান, এবার সিলেটে এক লাখ পিস লক্ষ্যের বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ৪৫ হাজার। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার মূল কারণ পুঁজি সঙ্কট। চার বছর ধরে ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করায় অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। পাওনা টাকা পরিশোধে ট্যানারি মালিকদের ‘গড়িমসি’ সম্পর্কে জানতে চেয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। মোবাইল ফোনে এসএমএস করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। সিলেটের দয়ামীর দারুল কোরআন মাদরাসার অধ্যক্ষ মোশাহিদ আলী বলেন, সিলেটে এ বছর পানির দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি জানান, মাদরাসায় অনুদান হিসেবে পাওয়া চার শতাধিক চামড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা করে কয়েকটা চামড়া বিক্রি হয়েছে। গত ২০ বছরে এত কম দামে চামড়া বিক্রি হয়নি বলে মনে করেন তিনি। কয়েক বছর ধরে চামড়া ব্যবসায়ীদের দুর্দিন চলছে জানিয়ে সমিতির সহসভাপতি শাহিন আহমদ বলেন, সিলেটের তিন শতাধিক চামড়া ব্যবসায়ীর বেশিরভাগই এবার ক্ষতির আশঙ্কায় চামড়া কেনেননি। এই সুযোগে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কম দামে চামড়া কিনে নিয়েছেন। তবে কম দামে কিনলেও তারা লাভ করতে পারবে, তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সংগৃহীত পশুর চামড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় চট্টগ্রামের আড়তদাররা। স্থানীয় সব ট্যানারি বন্ধ থাকায় তারা তাকিয়ে আছেন ঢাকার ট্যানারি মালিকদের দিকে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেনা চামড়া প্রক্রিয়াজাত শেষে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রির সময় আশানুরূপ দাম মিলবে কি না- তা নিয়ে শঙ্কিতও তারা।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও প্রক্রিয়াজাতের পর উপযুক্ত দামে তা বিক্রি করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন আড়তদাররা। কারণ চট্টগ্রামে কোনো ট্যানারি চালু না থাকায় ভরসা এখন ঢাকার ট্যানারি মালিকরা। তাদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে আমরা এক প্রকার বাধ্য। তাই তারাও সুযোগ নিতে চাইবে। তিনি দাবি করেন, মৌসুুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেনা দামের সঙ্গে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ খরচ মিলালে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি হবে। ট্যানারি মালিকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে অটল থাকলে আড়তদাররা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। চট্টগ্রামের আড়তদারদের অনেকেই ঢাকার বিভিন্ন ট্যানারির কাছে গতবার বিক্রি করা চামড়ার টাকা পায়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জানা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে একে একে ২১টি ট্যানারি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে তিনশ’র বেশি চামড়ার আড়ত হয়। যেগুলোর বেশিরভাগই নগরীর আতুরার ডিপো এলাকায়। তবে নানা কারণে একে একে সবক’টি ট্যানারিই বন্ধ হয়ে যায়।