• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

জালিয়াতি অনুসন্ধানে ঝিমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

জালিয়াতি অনুসন্ধানে ঝিমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

তফসিলি ব্যাংকের জালিয়াতি অনুসন্ধান কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে বিশেষ পরিদর্শন পরিচালনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে এই পরিদর্শন গতিহীন।

ব্যাংক খাতে নানা সমস্যার মধ্যে নগদ টাকার টানাটানি, বৈদেশি মুদ্রা-ডলারের কৃত্রিম সঙ্কট, তারল্য সঙ্কট, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, সুশাসন, দৈনন্দিন কার্যক্রমে পর্ষদের হস্তক্ষেপ ব্যাংক খাতের জন্য খারাপ সঙ্কেত। এ পরিস্থিতি উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জোরালো ও শক্ত ভূমিকা জরুরি। ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে অনেক ব্যাংক তাদের ভল্ট প্রায় শূন্য করে ফেলেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ব্যাংকগুলোয় নগদ টাকার টানাটানি শুরু হয়। সঙ্কট থেকে বেড়ে যায় সব ধরনের ঋণ ও আমানতের সুদহার। আমানতকারীকে কোনো কোনো ব্যাংক ১১ শতাংশ হারে সুদ দিতে শুরু করে। আমানতের এ উচ্চ সুদের বিনিয়োগের সুদহার ১৭-১৮ শতাংশে দাঁড়ায়।

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের নীতিগত সহায়তা চান বেসরকারি ব্যাংক মালিকরা। তারল্য সঙ্কট কাটাতে নতুন নিয়মে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পাচ্ছে বেসরকারি ব্যাংক। কমানো হয়েছে নগদ জমার হার (সিআরআর)। সব তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তলবি ও মেয়াদি দায়ের সাড়ে ৬ শতাংশ হারে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে এবং ৬ শতাংশ দৈনিক হারে নগদ জমা সংরক্ষণ করার বিধান ছিল। সেটি পুনর্নির্ধারণ করা হয় সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে ৫ শতাংশ। আগ্রাসী ব্যাংকিং করে তারল্য সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত হার নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, একগুচ্ছ সুযোগ নিলেও জুলাইয়ের শেষে ব্যাংক ঋণের সুদহার দুই অঙ্কের ঘরেই রয়েছে। উৎপাদনশীল খাতেও সুদহার কমায়নি কোনো কোনো ব্যাংক। ফলে অনেকেই বলছেন, গুচ্ছ সুযোগের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে একটি বিশেষ পরিদর্শন জরুরি ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই ব্যবস্থা না রাখায় সৃষ্ট সমস্যার আসল কারণ জানা যায়নি। অনিয়মে জড়িত ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এখন চলছে সরকারের ইশারা-ইঙ্গিতে। মন্ত্রণালয়ের অলিখিত নির্দেশনা এখন তাদের কর্মকাণ্ড ঠিক করে দিচ্ছে। কিন্তু এভাবে চললে পুরো খাত গভীর সঙ্কটে পড়বে। অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলবে।

এই সাবেক গভর্নর আরো বলেন, আইনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা আছে। তার প্রয়োগ করে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন বাড়াতে হবে। যারা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত হচ্ছে তাদের শাস্তি দেওয়া না গেলে জালিয়াতি উৎসাহিত হবে।  

তথ্য বলছে, জালিয়াতি ধরার কার্যকর কৌশল পরিদর্শন কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর জালিয়াতি ধরতে এবং গ্রাহক হয়রানি বন্ধে ২০১২ সালে ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট (এফআইসিএসডি) নামে পৃথক বিভাগ চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরুতে পরিদর্শনের মাধ্যমে বড় আকারের বেশ কয়েকটি জালিয়াতির ঘটনা উদঘাটন করে আলোচনায় আসে বিভাগটি। কিন্তু সেই পরিদর্শন কার্যক্রম বর্তমানে কার্যকর নেই বললেই চলে। কেবল রুটিনমাফিক গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ নিয়ে দিন চলছে শাখাটির।

ব্যাংকের জালিয়াতি ও অনিয়ম অনুসন্ধানে রয়েছে আরো ৭ বিভাগ। এসব বিভাগের আওতায় কিছু পরিদর্শন পরিচালিত হলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখছে না। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক এক অলিখিত নির্দেশনা জারি করেছে, পরিদর্শন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা ডেপুটি গভর্নরের অনুমতি ছাড়া বিশেষ পরিদর্শনে যেতে পারবেন না।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরের কাছে এসব খবর অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আগের মতোই শক্ত অবস্থানে থেকে পুরো ব্যাংকিং খাতের তদারকি করছে। অনিময় ও দুর্নীতি বের হচ্ছে না তা ঠিক নয়। সব তথ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে আসছে না। আমরা অনেক কাজ করছি। পরিদর্শন কার্যক্রম আগের মতোই চলমান রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষ পরিদর্শনে ২০১১ সালে ডেসটিনি গ্রুপের তিন হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি, বিদেশে অর্থ পাচার, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহসহ বড় বড় অনিময় তুলে আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অসৎ ব্যাংকার আর খারাপ গ্রাহকরা মিলেমিশে নথিপত্র তৈরি করে অর্থ বের করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগ না বাড়ার কথা থাকলেও বেড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণের জোগান। অনেকেই বলছেন, ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। নজরদারি না থাকলে এটি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করত।