• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

গণতন্ত্র বিধ্বস্তকারী কয়েকটি প্রক্রিয়া

গণতন্ত্র বিধ্বস্তকারী কয়েকটি প্রক্রিয়া
আর্ট : রাকিব

সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ— সাংবিধানিকভাবে এটিই সত্য। অথচ আজ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়েছে চারটি প্রক্রিয়ায়— ১. গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক দল বা শক্তির মাধ্যমে; ২. গৃহযুদ্ধের ফলে; ৩. সামরিক বাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে; এবং ৪. রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ও কার্যক্রম দ্বারা। কাল ও স্থানভেদে আরো অনেক প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিধ্বস্ত হতে পারে।

গণতন্ত্র বিধ্বস্তকারী প্রথম প্রক্রিয়াটি হচ্ছে গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক দল বা শক্তির উত্থান। ১৯২২ সালে ইতালির জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে বেনিটো মুসোলিনির ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি। ইতালির ৪০তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ গ্রহণ করেন। ১৯২৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ফ্যাসিজম। তখন থেকেই বিশ্বের ইতিহাসে ফ্যাসিবাদের জন্ম। এটা প্রতিষ্ঠিত ছিল ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এলেও মুসোলিনি ইতালিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিলেন। একইভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন জার্মানি দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও হাজারো সমস্যায় জর্জরিত তখন সংগঠিত হয় হিটলারের নাৎসি দল। দলটি ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনী প্রচারের সময় দলটির প্রধান স্লোগান ছিল- ‘ব্যর্থ গণতন্ত্র নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্রের মূলোৎপাটন চাই’। নির্বাচনে জয়ী হয়ে নাৎসিরা তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিল। গণভোটের মাধ্যমে হিটলার সংসদীয় ব্যবস্থাকে ভেঙে প্রতিষ্ঠা করেন একনায়কতন্ত্র। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে কোনো গণতন্ত্র ছিল না। ফ্রান্সে তৃতীয় নেপোলিয়ন গণভোটের মাধ্যমে ফরাসি প্রজাতন্ত্রকে বিলুপ্ত করেন। ধ্বংস করেছিলেন ফ্রান্সের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

দ্বিতীয় প্রক্রিয়া হচ্ছে গৃহযুদ্ধ। বিশ্বের অনেক দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধ্বংস হয়েছে গৃহযুদ্ধের ফলে। ১৯৭৫ সালে লেবাননে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয় গৃহযুদ্ধের কারণে। লেবাননে দীর্ঘদিন খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। সম্প্রতি ইয়েমেনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই গৃহযুদ্ধ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে গৃহযুদ্ধের ফলে লিবিয়ার পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না গৃহযুদ্ধের কারণে। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু কারণ থাকে, যেমন— বাইরের আগ্রাসন তথা হস্তক্ষেপ, সাম্প্রদায়িক তিক্ততা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাব, গণতান্ত্রিক মূলবোধ হ্রাস, শাসকশ্রেণি কর্তৃক নাগরিক অধিকার তথা মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে— এমন কোনো কাজ করার ফলে গৃহযুদ্ধ বাধে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিধ্বস্তকারী তৃতীয় প্রক্রিয়াটি হচ্ছে সামরিক বাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখল। উন্নত গণতান্ত্রিক প্রথম বিশ্বের দেশ ও পরিকল্পিত অর্থনীতির দ্বিতীয় বিশ্বের দেশগুলো বাদে তৃতীয় বিশ্বের (যে কোনো ধরনের সরকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে) দেশগুলোতে এই প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা লুণ্ঠিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। সামরিক বাহিনী বেশকিছু কারণে ক্ষমতা কব্জা করে। যেমন— সামরিক বাহিনীর সাংগঠনিক দক্ষতার বলে; সামরিক বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ হাসিলের জন্য; রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে; এবং বৈদেশিক চক্রান্তের ফলে। সামরিক বাহিনীর রয়েছে ঐক্যবোধ, শৃঙ্খলা, সংহতি ও নিয়মতান্ত্রিক নির্দেশনা। যার ফলে তারা যে কোনো কাজ শৃঙ্খলভাবে করতে পারে। ক্ষমতা দখলের কাজটিও তারা এভাবেই করে। দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখা দেয়, সামরিক বাহিনী তখন ক্ষমতা দখলের সুযোগ নেয়। সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে কোনো রাজনৈতিক দলের কাঁধে ভর করে। রাজনৈতিক মহল থেকে নির্দেশনা না পেলে অভ্যুত্থান ঘটাতে সাহস করে না। যখন সামরিক বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বে ও স্বার্থে আঘাত লাগে, তখন তারা অভ্যুত্থান ঘটায়।

আবার অনেক ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্বাস না পেলেও ক্ষমতা দখলে করে বিশেষ কিছু কারণে। যেমন— দুর্বল ও ভঙ্গুর রাজনীতি, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা, নেতৃত্বের প্রতি সন্দেহ, ক্ষমতার শূন্যতা, রাজনৈতিক দল কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কোনো আঘাত এলে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান একটি বড় উদাহরণ। ৭২ বছরের স্বাধীনতার ইতিহাসে ২০১৩ সালের নির্বাচিত সরকার বাদে অন্য কোনো সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। এর মূলে আছে দেশে সামরিক বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ২০১২ সালে মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈদেশিক চক্রান্তের কারণে। তেমনি সম্প্রতি মালদ্বীপে অভ্যুত্থান হয়েছে শাসকশ্রেণির দুর্নীতি ও দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য। সুতরাং দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে অনেক সময় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করতে সাহস পায় না।

 

শেষ যে কারণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয় তা হচ্ছে— রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ও কার্যক্রমের ফলে। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান অনেক সময় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয়ে অথবা বিরোধী দল নিধন করার লক্ষ্যে বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক কাজ করে থাকে। যার ফলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি নষ্ট নয়। অনেক সময় সে দেশের গণতন্ত্রই বিলুপ্ত হওয়ার হুমকির মুখে পড়ে। আর এই ফাঁকেই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। ১৯৩৪ সালে অস্ট্রিয়ান প্রজাতন্ত্রে ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল সরকার বিরোধী দল নিধন করার জন্য নির্বাচনপ্রথা বাতিল করে পেশাভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করেন। ১৯৭২ সালে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্ডিন্যান্ড মার্কোস বিপ্লবী কার্যক্রম বন্ধের অজুহাতে দেশে সামরিক শাসন জারি করেন; কংগ্রেস বাতিল করে মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দেন ও নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রতিপক্ষ দমনের জন্য ১৯৭৫ সালে প্রায় ২০ মাস সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে জ্যামাইকার সরকার বিরোধী দল নিধনের জন্য দেশে সামরিক শাসন জারি করে। বাংলাদেশেও সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা প্রবর্তনের নামে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়।

বিভিন্ন সময়েই দেখা গেছে, শাসকশ্রেণি ক্ষমতা ধরে রাখতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করাসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সরকারের সমালোচনাকে রাষ্ট্রের সমালোচনার সঙ্গে গুলিয়ে মতপ্রকাশের পথ বন্ধ করে। এভাবেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। গণতন্ত্র দেওয়ার বিষয় নয়। গণতন্ত্রের চর্চা করতে হয়। ব্যক্তি ও সমাজজীবনে গণতন্ত্রের চর্চার মাধ্যমে রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টি হয় ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পারস্পরিক শ্রদ্ধালাভ করে। বিশ্বরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিধ্বস্তকারী বিষয়গুলো পৃথিবীব্যাপী দেশে দেশে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া