• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৮ মহররম ১৪৪০
BK

শালবনে শিশুদের আলোঘর

শালবনে শিশুদের আলোঘর
ছবি : বাংলাদেশের খবর

হাবিবুর রহমান, মধুপুর

লালমাটির বন বেষ্টিত শালবন। শাল, সেগুন, আজুলি, হরীতকী, বহেড়া ও হিজল-তমালের বন মধুপুর। মধুপুর বন শালবন নামে সমধিক পরিচিত। লালমাটির বুকে সারি সারি শাল-গজারি বৃক্ষ। নানা চেনা-অচেনা বৃক্ষে লতায় ভরা এ বনের চারপাশে রয়েছে নৃগোষ্ঠী গারো-কোচ-বর্মণদের বসবাস এবং বৈচিত্র্যময় বর্ণাঢ্য জীবনধারা। ভিন্ন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এই নৃগোষ্ঠীর জীবনযাপন নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর। খাদ্য প্রণালি থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ, উৎসব, শিক্ষাদীক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। মধুপুর বন এলাকায় প্রায় ১৭ হাজার নৃগোষ্ঠীর বসবাসের পরিসংখ্যান পাওয়া গেলেও বসবাসরত অধিবাসীদের দাবি সংখ্যাটা আরো বেশি। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার গারোদের শিক্ষাদীক্ষা, নীতিনৈতিকতা, সামাজিক উৎসবসহ নানা বিষয়ে কারিতাসের আলোঘর প্রকল্প শিশুদের পাঠদান করে যাচ্ছে। ২০১২ সালে কারিতাসের তত্ত্বাবধানে আলোঘর প্রকল্পটি চালু হয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ছাড়া সিলেটেও চলছে এ প্রকল্পের কার্যক্রম। মধুপুরে আলোঘর প্রকল্পের আওতায় ৩৪টি শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে মধুপুর উপজেলায় ২৫টি, ফুলবাড়িয়ায় ১টি, ঘাটাইলে ২টি, মুক্তাগাছায় ৩টি ও ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় ৩টি শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। মধুপুর এরিয়া অফিসের আওতাধীন মোট ২৫টি স্কুলে চলছে আলোঘর প্রকল্পের শিক্ষা কার্যক্রম। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর এ শিশুরা যেন পড়াশোনায় আগ্রহী হয় এবং বাংলা ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি নিজের মাতৃভাষাটাও রপ্ত করতে পারে, সেজন্য রাখা হয়েছে ব্যবস্থা। সে লক্ষ্যে পাঠদানের জন্য স্কুলগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর ৪৭ শিক্ষক। এর মধ্যে পুরুষ ৯ জন, নারী ৩৮ জন। নৃগোষ্ঠীসহ নানা গোষ্ঠী-জাতির শিশুরা এসব শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠ গ্রহণ করে। মধুপুরেই মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯৮৫ জন। এর মধ্যে গারো শিক্ষার্থী ১২৯৫ জন। ছেলে ৬৫৮, মেয়ে ৬৩৭ জন। কোচ বর্মণ শিক্ষার্থী ১৪১ জন। এদের মধ্যে ছেলে ৬১, মেয়ে ৮০ জন। অন্যান্য ৪৪৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছেলে ২২৫, মেয়ে ২২৪ জন। এ ছাড়া বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে ৩৩ জন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য একই জাতি-গোষ্ঠীর শিক্ষক থাকার কারণে শিশুদের পড়তে কোনো সমস্যা হয় না। ভাষা বুঝতেও সহজ। ক্লাসে তারা শিক্ষকের সঙ্গে সহজে মিশে যায়, লজ্জা বোধ করে না। বাড়ির পাশের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী থাকায় পড়াশোনায় শিশুরা আনন্দ পায়। মনোযোগী হয় পাঠে। নিজেদের মান্দি ভাষা (গারো ভাষা) শিখতে সুবিধা হয়। শিক্ষাকেন্দ্রে শালবনের আলোঘর শিশুরা তাদের নিজেদের শিক্ষক পেয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে। জানা যায়, ধরাতি, মমিনপুর, ভুটিয়া, নয়নপুর, মহিষমারা, সাইনামারি, কেজাই, চুনিয়া, বন্দরিয়া, বেদুরিয়া, কাকড়াগুনি, বাগ্রা, সুবকচনা, চাপাইদ, গাছাবাড়ি, ইদুলপুর, আমলিতলা, গেৎচুয়া, রাজাবড়ি, জালাবাধা, সাধুপাড়া, গজারিচালা, টেলকি, জলই গ্রামের গারো পল্লীতে আলোঘর শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মুক্তাগাছা উপজেলার নালিখালী, লাঙ্গলভাঙ্গা, সাতাইরা। ঘাটাইল উপজেলার চারিয়াবাইদ, ইছারচালা। ফুলবাড়িয়া উপজেলার হাইদ্রাবাইদ, ভালুকা উপজেলার পাঁচগাঁও, মামারিশপুর ডুমনিঘাট এলাকা গারো অধ্যুষিত এলাকায় আলোঘর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে নৃগোষ্ঠীসহ নানা জাতি-গোষ্ঠীর শিশুরা পড়ালেখা করছে। এসব শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুদের জন্য পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ভাষায় বইও পড়ানো হয়। এতে তাদের বই, খাতা, কলম, পেনসিল, রাবার, কাটার, চক, ডাস্টারসহ সব শিক্ষা উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজি নকরেক জানান, কারিতাসের আলোঘর শিক্ষাকেন্দ্র পাহাড়ি বন এলাকার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। এই স্কুলগুলো থাকায় শিশুরা ঝরে পড়ছে না। নিজেদের ভাষাভাষী শিক্ষক থাকায় তারা আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা পাচ্ছে। নৃ-ভাষাও সহজে শিখতে পারছে।

গাছাবাড়ি আলোঘর শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষিকা ঝুমুর আজিম জানান, নিজেদের শিশু নিজেরাই মায়ের মমতা দিয়ে পড়াই। প্রতিদিন সমাবেশ ছাড়াও আবৃত্তি, গান, নৃত্যসহ ধর্মীয় বিষয়েও শিক্ষা প্রদান করে যাচ্ছি। নৃগোষ্ঠীর শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকায় পড়াশোনায় অনেকটা সহজ হচ্ছে। এ ছাড়া এ প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত জলছত্র প্রতিবন্ধী ডে কেয়ার সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিনা পারভিন জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ২৫ জন ও ওয়ার্কশপে ১৪ জন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) শিশুদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। কুটির শিল্প, শারীরিক কসরত, ক্রীড়াসহ নানা বিষয়ে উন্নয়নের জন্য কাজ করছে।

আলোঘর মধুপুর এরিয়া কো-অর্ডিনেটর উজ্জ্বল কুমার চক্রবর্তী জানান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহযোগিতায় কারিতাসের আলোঘর প্রকল্পটি চলছে। সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য অনুকূল শিখন পরিবেশ ও কার্যকরভাবে ক্রিয়াশীল শিক্ষাকেন্দ্রে নৃগোষ্ঠী শিশুদের জন্য বাংলা ভাষার পাশাপাশি নিজস্ব ভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি করাই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এ ছাড়া পিছিয়ে পড়া শিশুদের স্কুলমুখী করা, অভিভাবকের জন্য সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করার জন্যও কাজ করে যাচ্ছে আলোঘর। সমাজভিত্তিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গঠনের মাধ্যমে সুযোগবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসার জন্য কার্যকর অ্যাডভোকেসি উন্নয়ন করাও তাদের লক্ষ্য। এ ছাড়াও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কার্যকর একত্রীভূত শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য আলোঘর কাজ করে যাচ্ছে। মধুপুর শালবনে শিশুদের এই আলোঘর আলো বিলিয়ে দিচ্ছে শত শত প্রদীপে। একদিন এসব শিশুরূপী প্রদীপের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে পুরো শালবন । বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর এসব শিশুও অবদান রাখবে দেশের উন্নয়ন এবং অগ্রগতিতে।