• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

মালয়েশিয়ার সিদ্ধান্তে ধাক্কা আসবে প্রবাসী আয়ে

মালয়েশিয়ার সিদ্ধান্তে ধাক্কা আসবে প্রবাসী আয়ে
সংরক্ষিত ছবি

বর্তমানে যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে সেগুলোর মধ্যে শীর্ষ ৫টির একটি মালয়েশিয়া। সম্প্রতি দেশটির সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মী নিয়োগ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের এই ঘোষণায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার এবং প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেননা বিদেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের ৮ দশমিক ৩১ শতাংশই মালয়েশিয়াতে অবস্থান করছেন। এ হিসাব খোদ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর- (বিএমইটি)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রবেশ স্বাভাবিক করতে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ নতুন শ্রম বাজার খুঁজে বের করার নানা উদ্যোগের কথা সরকার বললেও কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মী নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত একদিকে উদ্বেগজনক ও অন্যদিকে সম্ভাবনাময়। এজন্য সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছে টিআইবি।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবিলম্বে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে অভিবাসী কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ সিন্ডিকেটমুক্ত করে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যয় নির্ধারণ করে পুনরায় শ্রমিক প্রেরণের উদ্যোগ বাংলাদেশকেই নিতে হবে। অন্যথায় বিশাল এই শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে বন্ধের ঝুঁকি সৃষ্টি হবে, যা ক্রমবর্ধিষ্ণু বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির জন্য সীমাহীন গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্স অর্জন বাধাগ্রস্ত করবে।

বিএমইটির হিসাব মতে, বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকের প্রতি চারজনের তিনজন কাজ করছেন পাঁচটি দেশে। দেশগুলো হলো- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও মালয়েশিয়া। প্রবাসী আয়ের সিংহভাগও আসে এই কয়েকটি দেশ থেকে। সর্বশেষ গত ২১ আগস্ট মালেশিয়া সরকার বাংলাদেশকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় শ্রমিক নেবে না তারা।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় মোট ৯ লাখ ৯০ হাজার ১৪৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছে; যাদের একটি অংশ অবশ্য অবৈধভাবে দেশটিতে বসবাস করছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ১১০ কোটি ডলার। সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় আসা ১০টি দেশের মধ্যে এর অবস্থান চতুর্থ। এর পরের অর্থবছরে দেশটি থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১১১ কোটি ডলার। আর চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে এসেছে প্রায় ১০ কোটি ডলার।

এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান সচিব ড. নমিতা হালদার এ প্রতিবেদককে বলেন, এখনই উদ্বেগের কিছু নেই। কারণ দেশটি চিঠিতে শিগগিরই শ্রমিক নেওয়ার নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানাবে বলে উল্লেখ করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৭৯ জন। আর ১৯৭২ সাল থেকে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ১৩ লাখ ১৩ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা; যা দেশের সর্বশেষ বাজেটের প্রায় তিনগুণ।

সরকারের তথ্য পর্যালোচনায় আরো দেখা গেছে, মোট জনশক্তির সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ আছে সৌদি আরবে। দেশটিতে ৩৫ লাখ ২৪ হাজার ১৭১ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে কাজ করছেন। অর্থাৎ মোট প্রবাসী নাগরিকের এক-তৃতীয়াংশই আছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে। তবে সম্প্রতি দেশটিতে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ঘটনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে দেশটি থেকে নারী শ্রমিকরা ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

টিআইবি বলছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্তের সংবাদে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তবে জনশক্তি রফতানিতে একচেটিয়া ও সিন্ডিকেটভিত্তিক অনৈতিক ব্যবসা বন্ধে মালয়েশিয়া সরকারের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখার জন্যও সরকারের কাছে আহ্বান জানাই। কারণ এর মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইতিবাচক ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় অভিবাসী কর্মী প্রেরণের সুষম সুযোগ তৈরির পথ সুগম হয়েছে। তবে এটাও পরিষ্কার যে, এ সুযোগ গ্রহণের পূর্বশর্ত হচ্ছে- পুরো খাতকে সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করা এবং যারা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।