• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মহররম ১৪৪০
BK

রাজধানীতে ফেরার চাপ বেড়েছে

পৌঁছানোর পর যান সঙ্কটে আরেক দফা দুর্ভোগ
রাজধানীতে ফেরার চাপ বেড়েছে
ছবি -বাংলাদেশের খবর

ঈদ ও সাপ্তাহিক ছুটি শেষে রাজধানীতে ফেরার ঢল নেমেছে কর্মজীবী মানুষের। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস গতকাল রোববার সকালে ঢাকার বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট- সর্বত্রই ছিল ফিরতি যাত্রীদের ভিড়। নৌপথে যাত্রা অনেকটা ভোগান্তিমুক্ত হলেও ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয় এবং ফেরিঘাটে জটের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের।

এদিন সকালে কমলাপুর স্টেশনে আসা সব ট্রেনেই ছিল যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। ঈদের আগে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের অধিকাংশ ট্রেন কয়েক ঘণ্টা করে দেরিতে ছাড়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। ফেরার পথেও তাদের একই অভিজ্ঞতা হয়। রাজশাহীর ধূমকেতু এক্সপ্রেস ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে কমলাপুর আসার কথা থাকলেও পৌঁছায় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে। খুলনার সুন্দরবন এক্সপ্রেস ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের বদলে স্টেশনে পৌঁছে সকাল সাড়ে ৮টায়।

চিলাহাটির নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল ৭টা ১০ মিনিটে আসার কথা ছিল; প্রায় ছয় ঘণ্টা দেরিতে বেলা ১টায় ট্রেনটি স্টেশনে আসে। এই ট্রেনে ঢাকায় আসা সোহেল রানা বলেন, ‘শনিবার রাত ৯টা ২০ মিনিটে নীলসাগর এক্সপ্রেসের চিলাহাটি ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু ছেড়েছে রাত ২টায়। পথেও বিভিন্ন স্টেশনে দেরি করছে।’ একই অবস্থা দিনাজপুরের একতা এক্সপ্রেসের। ট্রেনটি ঢাকা পৌঁছানোর কথা ছিল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে, পৌঁছায় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে। দেরির ব্যাপারে কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রতিটি স্টেশন থেকেই প্রচুর যাত্রী উঠছে। ফলে ট্রেন সময়মতো ছাড়তে পারছে না। আবার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ট্রেনগুলো স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। এ কারণে ঢাকায় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।’

বেলা ১১টা ১০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশনে আসে এগারসিন্ধুর প্রভাতী ট্রেন। আধঘণ্টা দেরিতে পৌঁছানো ট্রেনটি ছিল যাত্রীতে পূর্ণ। এই ট্রেনে কুলিয়ারচর থেকে আসা ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মো. ডালিম হোসেন জানান, ‘ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে আসলাম। দুজনের জন্য দুটো টিকেট কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পেয়েছি একটা। ছেলেকে সিটে বসিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে এসেছি।’ টিকেট না কাটা লোকজনের যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এই ট্রেনে আসা আশরাফুল আলম, ‘টিকেট না কিনে লোকজন কীভাবে ট্রেনে ওঠে বুঝি না। তারা টিকেটওয়ালা যাত্রীদের সিটে বসে পড়ে। ওঠাতে গেলে ঝামেলা করে। আজ (গতকাল) অনেকের সঙ্গে এ রকম ঝামেলা হয়েছে।’

এদিকে নাব্য সঙ্কটের কারণে কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকার পথে রওনা হওয়া বাসযাত্রীরা। বিআইডব্লিউটিসির এজিএম খন্দকার শাহ খালেদ নেওয়াজ জানান, ওই রুটে শনিবার রাতে ফেরি চলাচল বন্ধ হওয়ার পর রোববার ভোরে ৮টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার শুরু হয়। কিন্তু ১০টি ফেরি বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। পদ্মার দুই তীরে আটকে আছ প্রায় সাড়ে ৪০০ যানবাহন।

ঘাট কর্তৃপক্ষ চালকদের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবহার করার পরামর্শ দিলেও গাড়ির চাপে সেখানেও জট তৈরি হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ঢাকার গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সদস্য মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘মাওয়া রুটে নাব্য সঙ্কটের কারণে চাপ পড়েছে দৌলতদিয়ায়। গতকাল (শনিবার) রাতে যে গাড়িগুলো দক্ষিণবঙ্গ থেকে ছেড়ে এসেছিল, সেগুলো সব এখনো গাবতলী পৌঁছাতে পারেনি।’

গাবতলীর বিভিন্ন কাউন্টারের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ ততটা না থাকলেও রোববার সকালে বেশ ভিড় ছিল। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলো থেকে আসা অধিকাংশ বাসের টিকেট বিক্রি হয়েছিল আগেই। এছাড়া ‘লোকাল’ হিসেবে চলা বাসগুলোও ‘সিটিং’ হিসেবে ঢাকার পথে চলাচল করছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

গাবতলীর ঈগল কাউন্টারের কর্মী নাঈমুল ইসলাম বলেন, শনিবার রাতে দক্ষিণবঙ্গ থেকে ছেড়ে আসা তাদের পরিবহনের ৪০টি বাস সকালে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে মাত্র ১২টি। পটুয়াখালী থেকে সাকুরা পরিবহনের বাসে ঢাকায় ফেরা মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘ঘাটে প্রচণ্ড জ্যাম। তারপর সিরিয়াল ব্রেক করে বাস, ট্রাক সব এলোপাতাড়ি ঢুকাচ্ছে।’

ফেরিঘাটের পাশাপাশি পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পারাপারের লঞ্চ ও নৌকাগুলোতেও যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ দেখার কথা বলেন যাত্রী মাসুদ। হানিফ পরিবহনের চালক শুভ বলেন, ‘অনেক জ্যাম আছিল ঘাটে। আমার বাসের অর্ধেক যাত্রী নাইম্যা গেছিল। কইছিল, নৌকায় পার হইব।’

অবশ্য ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে যারা এসেছেন তাদের গাজীপুরের কোনাবাড়ী, জয়দেবপুর চৌরাস্তা, টঙ্গী রেলগেট এলাকায় কিছুটা জট পেরিয়ে আসতে হয়েছে বলে মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, শিমুলিয়া ঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ রয়েছে। তাদের ঢাকায় ফিরতে অতিরিক্ত বাস পাঠানো হয়েছে।

তবে ঢাকায় ফেরার পরও যাত্রীদের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না। ঈদের পর নগর পরিবহনের সংখ্যা কম থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেককেই বাধ্য হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা প্রাইভেটকারে চড়তে হচ্ছে। এই সুযোগে অটোরিকশা ও কার চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। অন্যান্য দিনের চেয়ে গতকাল রোববার দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে বলে জানান মহাখালী থেকে অটোরিকশায় ওঠা শাম্মী আখতার। একই অবস্থা দেখা যায় গাবতলী, সায়েদাবাদেও।

ট্রেন ও সড়কের এই ভোগান্তির চিত্র অবশ্য নৌরুটে ছিল না। বিআইডব্লিউটিএ’র পরিবহন পরিদর্শক (টিআই) এবিএম মাহমুদ বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ছেড়ে আসা ৮১টি লঞ্চ সকালে ঢাকার সদরঘাটে ভিড়েছে। প্রতিটি লঞ্চেই ভিড় ছিল, তবে তা উপচেপড়া বলা যাবে না।’