• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK
প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮

উপেক্ষিত যাত্রী অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব

উপেক্ষিত যাত্রী অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জোরালো দাবির মুখে বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন সংস্কার করে নতুন আইন প্রস্তাব করেছে মন্ত্রিসভা। সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সম্মান রেখে দ্রুত আইনটি হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইন সংস্কারে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপকে সাধুবাদ এবং কিছু কিছু নতুন সংযোজন অবশ্যই প্রশংসনীয়। নিরাপদ সড়কের দাবি হলো সড়ক নিরাপত্তা ও যাত্রী অধিকারের মূল বিষয়গুলো।

দেশে আইনের অভাব নেই। কিন্তু আইন প্রয়োগে সীমাহীন দুর্বলতার কারণে জনগণ এসব আইনের সুফল পায় না। আইনগুলো অনেকটাই ‘কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’ সেরকম।

কারণ দেশে বাড়ি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০০ আছে, কিন্তু আইন বাস্তবায়নে কোন কর্তৃপক্ষ কাজ করবে, আজ পর্যন্ত তা নির্ধারণ করা হয়নি, যার কারণে বাড়ি ভাড়া খাতে চলছে চরম নৈরাজ্য। ইতঃপূর্বে সড়ক পরিবহন আইন বিদ্যমান থাকলেও ট্রাফিক বা বিআরটিএ আইন প্রয়োগে তৎপর ছিল না। এটা অনেকটা ধূমপানবিরোধী আইনের মতো। যারা আইন প্রয়োগ করবে তারা যত্রতত্র ধূমপানে লিপ্ত। সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দেখা গেছে, অধিকাংশ সরকারি যানবাহনের ফিটনেস নেই, চালকদের লাইসেন্স নেই অথবা হালনাগাদ নেই। ট্রাফিক আইন মানছে না সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্ষমতাধর লোকজন।

আইন প্রয়োগে বিআরটিএ’র সক্ষমতা বাড়ানো বিশেষ করে ৩৬ লাখ মোটরযানের পর্যাপ্ত পরিদর্শকের ব্যবস্থা করা। প্রতি হাজারে একজন পরিদর্শকের ব্যবস্থা করা হলে ট্রাফিক পুলিশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। প্রস্তাবিত আইনে একটি যুগান্তকারী সংযোজন হলো দুর্ঘটনায় ক্ষতগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ট্রাস্ট গঠন করা। এসব দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতে তহবিল গঠন ও ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। ট্রাস্টি বোর্ড গঠনে সরকারের কর্মকর্তা ও পরিবহন খাতে জড়িত মালিক-শ্রমিকদের সংশ্লিষ্টতা থাকলে এটা আবারো পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যাবে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত নাগরিক সংগঠনগুলো আঞ্চলিক পরিবহন কমিটিতে ভোক্তাদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করে আসছিল। বিদ্যমান মোটরযান আইন, ১৯৮৩ অনুযায়ী কমিটিতে মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের একজন করে প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও সব স্থানেই তিন-চারজন করে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি আছেন। প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে এই কমিটিতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ন্যূনতম একজন করে প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব করা হলেও সেখানে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি, যার কারণে প্রস্তাবিত আইনে ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষিত হয়নি।

প্রস্তাবিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। হত্যা প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গণপরিবহন খাতে জড়িত নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের জনদাবি ছিল সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর বা তারও বেশি করা। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল সাত বছর করার। খসড়া আইনে সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড করায় যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা হয়নি, বরং বাসমালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে দুর্ঘটনায় কেবল চালকের সাজার কথা বলা হয়েছে। এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালকের অদক্ষতা, বেপরোয়া গাড়ি চালনা, যাত্রী ওঠানামা এবং ওভারটেকিংয়ের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। তবে দুর্ঘটনার জন্য চালক ছাড়াও ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থাপনা বা অন্য কোনো অবকাঠামো, এমনকি দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিও দায়ী হতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে সাজার বিষয়টি উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু খসড়া আইনে তা  নেই।

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কিন্তু বাস চলাচলের অনুমোদন প্রক্রিয়া সংস্কারের দাবি এই আইনে উপেক্ষিত। সব বাস-মিনিবাস অল্প কিছু কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসা এবং তা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করার জন্য ‘রুট ফ্র্যান্সাইজ’ পদ্ধতি দাবি দীর্ঘদিনের। ঢাকার গণপরিবহনের জন্য সরকারের করা ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) এবং জাপানি সংস্থা জাইকার সমীক্ষায়ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলার জন্য এই ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল। মালিক-শ্রমিকদের ইচ্ছা অনুযায়ী অপেশাদার ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিবহনের অনুমোদন দেওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

প্রস্তাবিত আইনে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গণপরিবহনের জন্য ভাড়ার হার ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল ও বিশেষ সুবিধার গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু এই বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলে ঢাকায় ‘সিটিং সার্ভিস’, গেটলকের মতো বিশেষ ব্যবস্থায় চলা বাসগুলোয় উঠলেই সর্বনিম্ন ১০-২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অথচ সরকার ঢাকায় মিনিবাসের ন্যূনতম ভাড়া ৫ টাকা এবং বড় বাসের জন্য ৭ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও পরিবহন মালিকরা তা কোনোভাবেই মানছে না। অন্যদিকে দূরপাল্লার পথে প্রচুর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস, ঢাকায়ও বেশ কিছু কোম্পানির এসি বাস চললেও তারাও নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া ঠিক করছে।

এ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রাখার কথা বলা হলেও যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার বক্তব্য না থাকলে সেখানে ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে না। ফলশ্রুতিতে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বরাবরের মতো উপেক্ষিত থেকেই গেল।