• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৮ মহররম ১৪৪০
BK

উন্নয়নের ঢিলেমিতে ভোগান্তি

# এডিপির আওতায় ২২ ও স্থানীয় সরকারের ১২ প্রকল্প স্থবির # বার বার মেয়াদ বাড়ানোয় বাড়ছে ব্যয় # সামর্থ্য বিবেচনা না করে প্রকল্প গ্রহণ এ অবস্থার মূল কারণ
উন্নয়নের ঢিলেমিতে ভোগান্তি
সংরক্ষিত ছবি

প্রতিবছরই দুই ঈদসহ নানা ছুটিকে কেন্দ্র করে যাত্রীর চাপ বাড়ে মহাসড়কে। সঙ্গে বাড়ে ভোগান্তিও। রাজধানী ঢাকা ছাড়তে ও ঢুকতে দীর্ঘ যানজটে পড়তে হয়। তীব্র যানজটের মুখোমুখি হতে হয় মহাসড়কের কিছু চিহ্নিত অংশেও। বিভিন্ন সময় সরকার এ ব্যাপারে নানা উদ্যোগ নিলেও তা ব্যর্থ হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, সড়ক উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়া ও বাস্তবায়নে ধীরগতি। এক্ষেত্রে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন শেষে কার্যকারিতা হারায়। ফলে ভোগান্তি থেকেই যায়।

এবার ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ সয়েছেন উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রীরা। গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা হয়ে যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে রাজশাহী বা রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে যাতায়াতে সময় লেগেছে দ্বিগুণেরও বেশি। গাবতলী থেকে নবীনগর-আশুলিয়া হয়ে উত্তরাঞ্চলের জেলায় যাতায়াতে আরো বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। সিলেটগামী যাত্রীরা অন্তত তিন ঘণ্টা যানজটে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকায়। সিলেট বা রূপগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসতেও এখানে ১২ থেকে ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাড়ির ধীর গতি দেখা গেছে। চট্টগ্রামমুখী যাত্রীদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্মাণাধীন তিনটি সেতু। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় এসব এলাকায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানায়, এবারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সড়ক পরিবহন ও মহাপরিবহন বিভাগের স্থবির প্রকল্প রয়েছে ২২টি। এসব প্রকল্পের অধিকাংশের মেয়াদ পার হয়ে গেছে। কয়েকবার মেয়াদ বাড়ানোর পরও কিছু প্রকল্প শেষ হয়নি। অপরদিকে সড়ক উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের এমন স্থবির প্রকল্প রয়েছে ১২টি। সংশোধন করে মেয়াদ না বাড়ালে এসব প্রকল্পের বিপরীতে কোনো অর্থ ব্যয় করা যাবে না। দ্রুত এসব প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পরিকল্পনা কমিশনে কিছুটা চাপও রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সামর্থ্য বিবেচনা না করেই অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতির সংস্থান না হওয়ায় কিছু প্রকল্পের কাজ ঝুলে থাকছে। এর ফলে পূর্ত কাজের রেট শিডিউলের কথা বলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের তহবিল থেকে গচ্চা যাচ্ছে বড় পরিমাণের অর্থ।’ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ প্রবণতার অবসান হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরে সাসেক কানেকটিভিটির আওতায় এলেঙ্গা থেকে হাটিকুমরুল হয়ে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ২০১৬ সালে। তবে সর্বশেষ হিসাবে প্রকল্পের আওতায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে ১৮ মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার মাত্র শূন্য দশমিক ০২ শতাংশ। ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে গত বছর তা ৬০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। চলতি অর্থবছর গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে।

একই অঞ্চলের অপর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা জয়দেবপুর থেকে চন্দ্রা হয়ে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন প্রকল্পের কাজ ঝুলে আছে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। ২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকার প্রকল্পে দুই দফায় সংশোধনের কারণে ব্যয় উঠেছে ৫ হাজার ৯৯৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকায়। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটিতে অর্থ ব্যয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পরিকল্পনা কমিশন। সর্বশেষ হিসাবে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। পাঁচ বছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৩৪ শতাংশের কম। দুই বছরে ৩ হাজার ৯৬৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় কাজ করতে না পারলে ২০২০ সালের জুনের পর আবারো প্রকল্পটি ঝুলে যাবে।

এ বিষয়ে জয়দেবপুর থেকে চন্দ্রা হয়ে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন প্রকল্পের পরিচালক দিলিপ কুমার গুহ বাংলাদেশের খবরকে জানান, ২০১৩ সালে একনেকে অনুমোদন হলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালে। প্রকল্পের পুরনো কাজগুলো বর্তমানে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। তবে সর্বশেষ সংশোধনীতে আরো কিছু কাজ এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে কাজে হাত দিতে কিছুটা সময় লাগবে। সংশোধিত মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা থেকে বের হওয়ার প্রায় প্রত্যেকটি সড়কের উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প অযাচিত বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছে। ঢাকা থেকে ভৈরব বাজার হয়ে সিলেটগামী যাত্রীদের যানজটের কবল থেকে মুক্তি দিতে ২৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরে ভুলতায় ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে। স্থবিরতার কারণে সম্প্রতি ৩৫৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি অর্থবছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৪৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে প্রকল্পের অগ্রগতি ৪১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ করতে হলে চলতি অর্থবছর ২০৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে। যদিও এডিপিতে প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ আছে মাত্র ৬৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এ অবস্থায় অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আবারো ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে প্রকল্পটির পরিচালক প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের বাংলাদেশের খবরকে বলেন, শুরুতে বিলম্ব হওয়ায় প্রকল্পের কাজ কিছুটা পিছিয়ে ছিল। তবে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক কাজ চলছে। সংশোধিত মেয়াদের আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া কাজ শেষের উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এডিপি প্রণয়নের সময় প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়নি। একনেক সভায় প্রকল্পটির সংশোধনী অনুমোদন দেওয়ায় বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ হয়েছে।’

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভুলতা এলাকায় মহাসড়কের বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে চার লেন ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ। রাস্তার পাশে একটি লেন রাখা হয়েছে গাড়ি চলাচলের জন্য। ফলে কাঁচপুর থেকে ভুলতা পর্যন্ত ১৩, মাধবদী থেকে ৩৭ কিলোমিটার ও রূপগঞ্জ থেকে ১৪ কিলোমিটার এলাকায় থাকছে গাড়ির বিশাল চাপ।

দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকার চার লেন সড়কের সুফল পেতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি সেতু। পরিস্থিতির উত্তরণে মেঘনা ও গোমতী নদীর পাশাপাশি কাঁচপুরে দ্বিতীয় একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১৩ সালে। জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার সহায়তায় নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৩৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ছয় বছরে এ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩৮ শতাংশ।

২০২১ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। এ সময়ে কাজ শেষ করতে হলে দুই বছরে ৩ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। গত অর্থবছরের এডিপিতে এ প্রকল্পে ১ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত এডিপিতে বাড়িয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। চলতি এডিপিতে আবারো কমিয়ে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা।

ঢাকা সিলেট মহাসড়কে ২১৯ মিটার দৈর্ঘ্যের বরকতিয়া সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে। ৬২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। এ হিসাবে মেয়াদ শেষে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সংশোধন না করে এ প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা যাবে না।

দুইবার সংশোধন করা কুষ্টিয়া শহর বাইপাস নির্মাণ প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৬৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০১১ সাল থেকে চলে আসা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জুনে। ১০৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকার প্রকল্পে আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩৭ দশমিক ৬১ ভাগ। সংশোধনের মাধ্যমে মেয়াদ বাড়ানো না হলে এ প্রকল্পেও কোনো অর্থ ব্যয় করা যাবে না। স্থবির হয়ে থাকা পাগলা জগন্নাথপুর রানীগঞ্জ আউশকান্দি সেতু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জুনে। ২০১৪ সালের শুরুতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল। একই সময়ে শুরু হওয়া মতলব সেতুর কাজও শেষ হয়নি নির্ধারিত মেয়াদে।

এলজিইডির তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ২০১০ সালে নেওয়া প্রকল্প ২ দফায় সংশোধন করে মেয়াদ বাড়ানো হলেও গত জুনে শেষ হয়ে গেছে। ৪০৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পে অর্থ ছাড় করতে হলে সংশোধন করে মেয়াদ বাড়াতে হবে। ২০১১ সালে অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পের বাড়তি মেয়াদও শেষ হয়েছে গত জুনে। মেয়াদ না বাড়িয়ে এলজিইডির এমন ১২টি স্থবির প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা যাবে না।