• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১৪ মহররম ১৪৪০
BK
পাটের বস্তায় পোল্ট্রি ফিডের মোড়ক

নিরাপদ পোল্ট্রি ফিড ও শিল্পের স্বার্থরক্ষা জরুরি

নিরাপদ পোল্ট্রি ফিড ও শিল্পের স্বার্থরক্ষা জরুরি
সংগৃহীত ছবি

পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের মোড়কেও পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট শিল্প-উদ্যোক্তা এবং বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশের সুরক্ষায় পাটের মোড়কের ব্যবহার আবশ্যকীয় ও ভাল উদ্যোগ বটে। তবে একটি শিল্পের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে শিল্প সংশ্লিষ্ঠ নের্তৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত পর্যালোচনা করে নেয়া জরুরি। তা না হলে আরোপিত সিদ্ধান্ত শিল্প বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে যেতে পারে।

আমরা জানি, আমিষ ও পুষ্টি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে দিন দিন বেড়ে চলেছে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান। বাংলাদেশের মোট প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই জোগান দেয় পোল্ট্রি শিল্প। এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই এত বড় একটি শিল্পের যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিল্পের স্বার্থরক্ষাও জরুরি বিষয়। যদিও নিরাপদ খাদ্য ও  পোল্ট্রি বিষয়ে জনমনে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে তারপরও শিল্প বিরোধি এমন কোনো সিদ্ধান্ত গৃহিত হলে শিল্প উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশপাশি দেশীয় প্রাণিজ আমিষের জোগান হুমকির মুখে পড়বে- এ ব্যাপারটিও ভাবতে হবে। আবার দেশীয় প্রাণিজ আমিষের জোগান ঠিক রাখতে পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত পোল্ট্রি ফিড উৎপাদক, ডিলার, খামারি ও ব্রয়লার উৎপাদকদের নিরাপদ ও মানসম্মত পোল্ট্রি খাবার, উৎপাদন, সরবরাহ এবং খুচরা পর্যায়ে লাইভ বার্ড বিক্রিতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশে পোল্ট্রির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান  খোঁজে বের করতে হবে। গবেষণা বলছে, এই মুহূর্তে বিশ্বে পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদন ছাড়িয়েছে ১০০ কোটি টন। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২০৫০ সালে তা বাড়াতে হবে ৬০ থেকে ৭০ গুণ। এই বিশাল বাজারের সার্বিক নিরাপত্তায় যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি।

পাটের বস্তায় পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড মোড়কীকরণে সম্প্রতি বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে সরকার। আর এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে উৎপাদনকারীদের সংগঠন ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব)। প্রস্তুতকারকদের মতে- পাটের বস্তায় ফিডের মান রক্ষা করা সম্ভব  নয়। পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের আইন নেই।

কারণ পাটের বস্তায় স্বল্পতম সময়ে পচন ধরে, ফলে তা মাছ ও মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পিপি ওভেন ব্যাগের মতো করে চটের ব্যাগে ফিড স্তূপ করে রাখলে তা ড্যাম্প হয়ে যাবে। এ ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা অনেক খামারির পক্ষেই সম্ভব হবে না।

প্রতিক্রিয়া

আমাদের দেশে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেশি, বর্ষার সময় তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। বাতাসের সংস্পর্শে এলে ফিডে ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটে এবং ফিড বিষাক্ত হয়ে পড়ে।

-মসিউর রহমান,  ফিআব সভাপতি

 

ফিডের মোড়কে আমরা যে পিপি ওভেন ব্যাগ ব্যবহার করি তা পচনশীল। ৫০ কেজি ধারণ ক্ষমতার একটি পিপি ওভেন বস্তার দাম পড়ে মাত্র ১৫-২০ টাকা। পাটের বস্তার দাম প্রায় ৫০-৬০ টাকা। সাধারণ তৃণমূল খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

-আহসানুজ্জামান, ফিআব সাধারণ সম্পাদক

 

যদি বলা হয় আইসক্রিম তৈরি করা যাবে কিন্তু বিপণনের ক্ষেত্রে ফ্রিজার ব্যবহার করা যাবে না। ঠিক তেমনিভাবে মাছ ও মুরগির খাবার পাটের বস্তায় প্যাকিং করা সম্ভব নয়।

-এহতেশাম বি. শাহজাহান, ফিআব-এর সাবেক সভাপতি

 

পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের জন্য এয়ারটাইট ব্যাগের প্রয়োজন হয়। পাটের ব্যাগে ফিড প্যাকেজিং করলে মাত্র কয়েকদিনেই তাতে ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে।

-ড. মো. গিয়াসউদ্দিন, প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার, বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউট

 

প্রধান চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে ময়েশ্চার এবং ফাংগাস কন্ট্রোল। পাটের বস্তায় ফিড প্যাক করলে ৭ থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত ফিড ভালো থাকবে কিন্তু এরপর তা মাইকোটক্সিনে আক্রান্ত হবে।

- ড. প্রিয় মোহন দাস, অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব প্যাথলজি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 

ফিডের মান ও আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় ধরে রাখতে এয়ারটাইট প্যাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাটের ব্যাগের মাধ্যমে এয়ারটাইট করার প্রযুক্তি আছে কিনা তা আমার জানা নেই।

-ড. আনোয়ারুল হক বেগ, অধ্যাপক,  পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগ, শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 

শুধু পাটের বস্তায় ময়েশ্চার কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তাই পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের প্যাকেজিং-এ পাটের বস্তার ব্যবহার হয়তো বাস্তবসম্মত হবে না।

-শশি আহমেদ, অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর, ভ্যাটেরিনারি অ্যান্ড আনিমেল সায়েন্স বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়