• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১১ মহররম ১৪৪০
BK

রোহিঙ্গা ঢেউয়ে পড়ালেখা লাটে উখিয়া-টেকনাফে

রোহিঙ্গা ঢেউয়ে পড়ালেখা লাটে উখিয়া-টেকনাফে
সংগৃহীত ছবি

কুতুপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রতিদিন ১৫ হাজার রোহিঙ্গার জন্য তৈরি হয় ত্রাণের খাবার। স্কুলের তিন কক্ষও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করেন। এ পরিবেশে স্কুলে উপস্থিতির হার ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। রাস্তাঘাটে চলতে প্রতিনিয়তই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে ক্রমেই দূষিত হয়ে পড়ছে পরিবেশ। রাস্তাঘাটে বেপরোয়া গাড়ি চলাচল বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষক-অভিভাবকরাও পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।

উখিয়া ও টেকনাফ দুই উপজেলায় ১৩১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই অবস্থা মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। এসব এলাকার বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হওয়ায় পাঠদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে শিক্ষক-অভিভাবকরাও পড়েছেন বেকায়দায়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভৌত অবকাঠামোরও। এতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত অভিভাবকরা। পরিস্থিতি উত্তরণে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সঠিকভাবে নিরূপণ ও পরিচালনায় স্কুলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ইউনিসেফের সহযোগিতায় সম্প্রতি হয়ে যাওয়া দুই দিনব্যাপী আবাসিক কর্মশালার মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়। আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উখিয়া-টেকনাফের প্রাথমিক বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য রস্ক প্রকল্পের মাধ্যমে ‘লার্নিং সেন্টার’ চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। এ জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। চুক্তি অনুযায়ী উখিয়া ও টেকনাফে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ এবং রোহিঙ্গা শিশুদের লার্নিং সেন্টার চালুর জন্য বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ‘২৫ মিলিয়ন ডলার’ (আড়াই কোটি ডালার) অনুদান দেবে।

জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, অনুদানের টাকায় উখিয়া-টেকনাফের প্রায় ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হবে। শুধু ভবনই নয়, বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তাও নতুন করে তৈরি করা হবে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য রস্ক প্রকল্পের আওতায় সেখানে লার্নিং সেন্টার স্থাপন করা হবে। এ জন্য রস্ক প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আরো দুই বছর। লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের বার্মিজ ও ইংরেজি ভাষা শেখানো হবে বলে জানিয়েছেন গিয়াস উদ্দিন। এদিকে উখিয়া ও টেকনাফে মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি কর্মশালার মাধ্যমে ইউনিসেফকে সঙ্গে নিয়ে ‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’ নামে একটি প্রকল্প তৈরি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে সেখানকার শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাবের তথ্য সংগ্রহ করতে মাউশিকে নির্দেশ দেয়। মাউশি গত ২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি তাড়াহুড়া করে তথ্য সংগ্রহ করায় বাস্তব চিত্র উঠে না আসায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হন। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাউশি আজকের কর্মশালার আয়োজন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মাউশির প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার আলহাজ আলী আছিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, মাদরাসাসহ ১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও আসবাবপত্রের ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে আনুমানিক সাড়ে ৪৫ লাখ টাকা। উখিয়া উপজেলার উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজসহ ৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র ও অবকাঠামোর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া একাডেমিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে টেকনাফের আলহাজ আলী আছিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ২০১৬ সালের তুলনায় শিক্ষার্থী কমেছে। এ স্কুলে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় আগের বছরের চেয়ে পাসের হার ১০ শতাংশ কমেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) জাবেদ আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। নিরূপিত ক্ষয়ক্ষতি পূরণে প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে।

টেকনাফের মৌসুনীর নয়াপাড়া আদর্শ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান বলেন, তাদের এ স্কুলে বহু রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলে দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষা নিতে পারিনি।’

কুতুপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক রমজান আলীর মতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যে ভাটার টান শুরু হয়েছিল, তা আজো বিদ্যমান। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, শুরুতে মানবিকতা দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এখন রোহিঙ্গা আমাদের মাথার ওপর উঠে বসেছে।