• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১৪ মহররম ১৪৪০
BK
সিপিডির প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহান

পরিবেশের উন্নতিতে লাভ নেই পোশাক শ্রমিকদের

পরিবেশের উন্নতিতে লাভ নেই পোশাক শ্রমিকদের
ছবি: বাংলাদেশের খবর

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক খাতে কর্মপরিবেশে প্রশংসনীয় উন্নতি হয়েছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান। তিনি বলেছেন, পরিবেশের উন্নতি সত্ত্বেও বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পোশাকের উপযুক্ত মূল্য আদায় করতে না পারায় এ খাতের আর্থিক ও সামাজিক উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তারা এখন ‘হূদয়হীন’ ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছেন। পোশাক খাতের রূপান্তরকালে লাভের অংশ বিতরণে ন্যায় প্রতিষ্ঠা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে পোশাক শিল্পের উন্নতি নিয়ে সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

শ্রম অধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বেশ পিছিয়ে আছে বলে গবেষণাটিতে দাবি করা হয়েছে। দেশের ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ কারখানায় এখনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই বলেও উঠে এসেছে গবেষণায়। রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বাণিজ্য সচিব শুভাশিষ বোস। এ ছাড়া  এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা বিভাগের পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে দেশে পোশাক শিল্পের ৩ হাজার ৮৫৬ কারখানায় ৩৬ লাখ শ্রমিক রয়েছেন। পাঁচশোর কম শ্রমিক কাজ করেন এমন ছোট কারখানার হার ৪৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের দক্ষতা তুলনামূলক কম।

মূল প্রবন্ধে আরো বলা হয়, অর্থনৈতিক উন্নতির সূচকে আমাদের দেশের কারখানাগুলোর দক্ষতা একেবারেই কম। এ সূচকে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প পেয়েছে ২১ পয়েন্ট। এ বিষয়টি দেশের পোশাক খাতে প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া ও পণ্যে দারিদ্র্যের বিষয়টি চরমভাবে ফুটে ওঠে। সামাজিক উন্নতি সূচকে পোশাক শিল্পের অর্জন ৫৯ পয়েন্ট। লিঙ্গ বৈষম্য সংক্রান্ত সূচকে রয়েছে ৫১ পয়েন্ট।

গবেষণা উন্নয়ন ও পণ্যের ডিজাইনে দেশের পোশাক শিল্পে চরম দৈন্যদশা বিরাজ করছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্য উন্নয়ন সূচকে পোশাক খাতের অর্জন মাত্র ৭ পয়েন্ট। সার্বিক উন্নতির সূচকে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। কিছু কারখানায় সার্বিক সূচকে অর্জন ৬০ শতাংশের বেশি। আর গ্রিন কারখানাগুলো দক্ষতায় অনন্য। ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলো এ বিষয়ে বেশ পিছিয়ে আছে।

শ্রম অধিকার সূচকেও পোশাক শিল্প অনেক পিছিয়ে আছে বলে জানান গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তায় যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তবে অধিকার সূচকে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে অর্জন মাত্র ১৮ পয়েন্ট। শ্রম পরিবেশের অবস্থা খুবই খারাপ। ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ কারখানায় কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই। তবে ৭১ শতাংশ কারখানায় নির্বাচিত শ্রমিক কমিটি রয়েছে।

লিঙ্গ সমতা সূচকে ৫১ পয়েন্ট থাকলেও অধিকাংশ কারখানা এ খাতেও বেশ পিছিয়ে আছে বলে জানান গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, মহিলা শ্রমিকরা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারে বেশ পিছিয়ে আছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে পুরুষরাই এগিয়ে। নারীদের দক্ষতা কম থাকায় নতুন যন্ত্রের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না। ফলে অনেক নারী শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন।

পোশাক পণ্য উৎপাদন থেকে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোতে লাভের অংশ বিতরণে গত পাঁচ বছরে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর আগে লাভের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ বিদেশি ক্রেতারা নিয়ে যেত। আর পোশাক প্রস্তুতকারকরা পেতেন লাভের মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। লাভের অংশে এখনো একই ধারায় রয়েছে বলে তিনি জানান। কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বাড়তি অর্থ বিনিয়োগ করেও লাভের বাড়তি অংশ না পাওয়ায় শ্রমিকরা লাভবান হচ্ছে না বলেও তিনি মনে করেন।

সভাপতির বক্তব্যে ড. রেহমান সোবহান বলেন, পোশাক শিল্পে লাভের বড় একটা অংশ বিদেশি ক্রেতারাই নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ ডলারে শার্ট কিনে তারা ২৫ থেকে ৩০ ডলারে ইউরোপ ও নিউইয়র্কে বিক্রি করছে। এ বিষয়টি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে অনেকবার আলোচনা হয়েছে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ক্রেতাদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট সমাধান পাওয়া যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় হচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে তা ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে রফতানির গতি আরো বাড়াতে হবে।