• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১৪ মহররম ১৪৪০
BK

রোহিঙ্গাদের ভুয়া ছবি দিয়ে মিথ্যাচার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর

রোহিঙ্গাদের ভুয়া ছবি দিয়ে মিথ্যাচার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি ছবি ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ঐ ছবিতে ‘বাঙালি’দের নির্মম হত্যার শিকার স্থানীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষের মৃতদেহ দেখা যাচ্ছে৷ সেনাবাহিনীর একটি বইতে এই দাবি করা হয়৷

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রকাশিত এই বইয়ে বেশ কিছু ভুয়া আলোকচিত্র ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ভুয়া ছবি ব্যবহার করলেও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রকাশিত সেই বইয়ের নাম কিন্তু ‘ট্রু নিউজ’ বা ‘আসল খবর’।

রয়টার্স জানায়, গত জুলাইয়ের প্রকাশিত ১১৭ পৃষ্ঠার ওই বইটিতে ৮০টি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে আটটি ছবি রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে, আর সেই আটটির অন্তত তিনটি ছবিই ইতিহাসের মিথ্যাচার। এর মধ্যে একটি ছবি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার।   

চিহ্নিত ভুয়া সাদাকালোয় ছাপা তিনটি ছবির মধ্যে একটিতে দেখা যাচ্ছে, একটি কৃষিযন্ত্র দিয়ে নদীতে ভাসমান দুটি মরদেহ পরখ করছেন লুঙ্গি পরিহিত এক ব্যক্তি। ছবিটির ক্যাপশনে রোহিঙ্গাদের অভিযুক্ত করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী লিখেছে : ‘বাঙালিরা স্থানীয় অধিবাসীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে’।

এই ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে ১৯৪০ সালে মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গার ইতিহাস অধ্যায়ে। সেই অধ্যায়ে রোহিঙ্গারা বৌদ্ধদের হত্যা করেছে সেই তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী বোঝাতে ‘বাঙালি’ বলেও উল্লেখ করা হয়।

রয়টার্স তদন্ত সূত্রে ছবিটির মূল উৎস উদ্ধার করে জানায়, প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ওই ছবিটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি ছবি, যে যুদ্ধে লাখ লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হয়।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মিয়ানমারে ঢুকছে। অথচ ওই ছবিটির মূল সত্য হলো, রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে পালাচ্ছে।

চিহ্নিত ভুয়া তিন ছবির মধ্যে অপর ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে ন্যুব্জ শরীরের অনেক মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে কোথাও যাত্রা করেছে। সে ছবিটিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ক্যাপশন লিখেছে, ‘ব্রিটিশ উপনিবেশের আওতায় মিয়ানমারের নিম্নাঞ্চল দখল হওয়ার পর বাঙালিদের সেখানে অনুপ্রবেশ করে’।

ছবিটিতে পরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারে ব্রিটিশ আমলে অনুপ্রবেশ করে, তার আগে তারা সেখানে ছিল না এমন তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ রয়টার্স জানাচ্ছে, ওই ছবিটি আসলে একটি রঙিন ছবি, যেটিকে সাদাকালো হিসেবে পরিবেশন করা হয়েছে। ছবিটির পেছনের সত্য এই যে, ১৯৯৬ সালে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় গণহত্যার সময় যখন শরণার্থীরা পালিয়ে যাচ্ছিল, এটি তখন তোলা হয়। পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া মার্থা রিয়াল এটির আলোকচিত্রী, তিনি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদপত্র পিটসবার্গ পোস্ট-গেজেটে কাজ করছিলেন।

রয়টার্স জানায়, এ বিষয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা।

ছবিগুলোর সত্যতা নিয়ে জানতে চাওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারে মুখপাত্র জা হাতয়ে ও দেশটির এক সামরিক মুখপাত্রর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব য়্যু ম্যো মিন্ট মং এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বইটি পড়েননি বলে উল্লেখ করেন।