• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৭ সফর ১৪৩৯
BK
জার্নাল জনান্তিকে

কাফকার প্রেম

কাফকার প্রেম
সংগৃহীত ছবি

প্রেম যেন এক অগ্নিশিখা। আনন্দ ও অশ্রু। বুকের গহন থেকে তাই বেরিয়ে আসতে পারে এরকম চূর্ণবাক্য : ‘আপনার চিঠি আজ মেঘের বুক চিরে আমার ওপর পুষ্পবৃষ্টির মতো ঝরছে।’ এই কথাগুলো একটা চিঠিতে লিখেছিলেন ফ্রানৎস কাফকা। সদ্য প্রেমে-পড়া প্রেমিকা ফেলিস বাউয়ারকে। কাফকা, আজ আমরা জানি, বিশ্বনন্দিত কথাসাহিত্যিক। লেখকদের লেখক।

কিন্তু শুধু কি ফেলিস? না। অসংখ্য প্রেমিকা ছিল তার। অথবা বলা যায়, অনেক নারীর প্রেমে পড়েছেন তিনি। কাফকার এসব প্রেমকাহিনির কথা ভাবলে মনে হয়, লেখকদের জন্য প্রেম বুঝি এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। কয়েক দিনের চকিত সাহচর্য থেকে দীর্ঘ পাঁচ বছর— অসংখ্য নারীর সঙ্গে প্রসারিত ছিল তার প্রেম।

কাফকার বয়স তখন মাত্র সতেরো বছর। বয়ঃসন্ধিকাল। এক পোস্টমাস্টারের বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য আশ্রয় মিলেছে। তখনই প্রেমে পড়লেন পোস্টমাস্টার কন্যা সেলমা রোবিটশেকের। দুজনে ঘুরেছেন বনের মধ্যে। সেলমাকে নীৎসের লেখা আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন। কিন্তু ওই পর্যন্ত। কাফকার প্রকৃত প্রেমের শুরু এর কয়েক বছর পরে। বাইশ বছরের কাফকা নিমজ্জিত হলেন উনিশ বছরের হেডউইগ থেরেস ওয়েলারের প্রেমে। কী উন্মত্ত সেই প্রেম। দু-বছর অজস্র চিঠি লিখলেন তাকে। চিঠি, হ্যাঁ, চিঠিই ছিল কাফকার প্রেম প্রকাশের মাধ্যম। এ যেন, ‘যাও চিঠি বলো তারে’ এরকমই ছিল তার নিবেদন। ওই প্রেম ছিন্ন হয়ে গেলে পরবর্তী কালের আরেক প্রেমিকা ফেলিসকে লিখেছিলেন, ‘গতরাতে স্বপ্নে ওর ছোট ছোট ভরাট পা দুটি দেখলাম। এভাবেই পরোক্ষে আমি কোনো নারীর সৌন্দর্যে বিহ্বল হই আর তার প্রেমে পড়ি।’ লক্ষণীয়, পরোক্ষ বিহ্বলতা, কাফকার প্রেম ছিল এমনই। হেডউইগকে লিখেছিলেন, ‘তোমার চিঠি তো নয়, পড়তে পড়তে আমি যেন পেরিয়ে যাই অন্তহীন পথ, হেঁটে চলি বনের ভেতর দিয়ে। নিজেকে আমি হারিয়ে ফেলি।’

যৌনকর্মীদেরও সংসর্গে এসেছিলেন কাফকা। সেকালের ইউরোপে এদের সান্নিধ্য দোষণীয় ছিল না। কিন্তু এই যে নারীর প্রতি ঝুঁকে পড়া, তা কিন্তু যৌন কারণে নয়। বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে তখনই জানিয়েছিলেন, আমি নিজে খুব নিঃসঙ্গ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। এইসব নারী আমাকে সুখ দিতে পারেনি, আমিও পারিনি সুখ দিতে। নিজেকে তখন বুঝতে চাইলেন কাফকা। লেখা শুরু করলেন দিনপঞ্জি। আত্ম-আবিষ্কার আর জগৎবীক্ষণের সূত্রপাত ঘটলো তখনই। প্রকাশিত হলো দুটো লেখা ‘ডেসক্রিপশন অফ আ স্ট্রাগল’ আর ‘দ্য এরোপ্লেনস অ্যাট ব্রেশিয়া’। সময়কাল ১৯০৯।

এরপর যে নারীর সঙ্গে সামান্য পরিচয় থেকে গভীর প্রণয়ে জড়িয়ে পড়লেন, তিনিই হচ্ছেন সেই নারী যার চিঠি পুষ্পবৃষ্টি হয়ে তাকে স্নাত করেছিল। ফেলিস বাউয়ার। এক সন্ধ্যায় বন্ধু ব্রডের বাড়িতে পরিচয়, নির্ঘুম কাটলো কয়েক রাত, তারপর চিঠি লেখার শুরু। লম্বা লম্বা সেসব চিঠি। যেদিন চিঠি লিখলেন তার দুদিন পর সারারাত জেগে লিখলেন অবিস্মরণীয় গল্প ‘রায়’। ফেলিস কি প্রেরণা হয়ে এসেছিল কাফকার জীবনে? না হলে গল্পটি কেন তিনি ফেলিসকেই উৎসর্গ করবেন! ফেলিসের সঙ্গে প্রেম চলাকালেই লিখলেন— ‘রূপান্তর’ আর শুরু হলো ‘আমেরিকা’র পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন। ফেলিসের বান্ধবী গ্রেট ব্লখ। মাঝে মাঝে দুজনের মধ্যে দুতিয়ালি করতেন, ব্লখও কাফকার প্রেমে পড়লেন একসময়। ফেলিসের সঙ্গে দু-দুবার বাগদান হলো। কিন্তু দুবারই তা ভেঙে দিলেন কাফকা। তাদের সম্পর্ক ১৯১২ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু বিয়ে না হলে কী হবে, এই বছরগুলোতেই সবচেয়ে বেশি সৃষ্টিশীল ছিলেন কাফকা। প্রকাশিত হয় ‘রায়’, ‘দ্য স্টোকার’, ‘রূপান্তর’ এইসব লেখা। ১৯১৭ সালে টিউবারকুলেসিস রোগ ধরা পড়লে কাফকা সবচেয়ে দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ফেলিসের সঙ্গে প্রেমের ইতি ঘটালেন। ফেলিসের প্রেমে কাফকা এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন যে তাকে কয়েক হাজার চিঠি লিখেছিলেন। কোনো কোনো দিন দুটি করে। পাঠক হিসেবে আমাদের সৌভাগ্য, প্রেমে ব্যর্থ হলেও ফেলিস সেই চিঠিগুলো নষ্ট করেননি। বরং পরবর্তীকালে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে সুদূর আমেরিকায় স্থায়ী হলেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন। তুলে দিয়েছেন ব্রডের হাতে। পরে ব্রড সেগুলো প্রকাশ করেছেন।

ফেলিসের সঙ্গে প্রেমের সূচনাকালেই কাফকা একটা স্বাস্থ্যনিবাসে ভর্তি হলেন। সেখানে পরিচয় হলো অষ্টাদশী সুইস মেয়ে জেরতি ওয়াসনারের সঙ্গে। তার সঙ্গে চলে খুনসুটি আর তাকে শোনানোর জন্য রচনা করেন রূপকথার গল্প। মাত্র দশ দিন ছিল এই প্রেমের আয়ু। কাফকা এরপর রোগাক্রান্ত অবস্থাতেই প্রেমে পড়লেন অপূর্ব সুন্দরী আঠাশ বছরের তরুণী জুলি হোরিজেকের। প্রায় ওই একই সময়ে মিন্জ এসনার নামের আরেক অষ্টাদশীর সঙ্গে কাফকা বন্ধুসুলভ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। জুলির সঙ্গে কাফকার সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি, এসনারের সঙ্গেও নয়।

এরপর যে নারী কাফকার লেখক-জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন, তিনি হচ্ছেন মিলেনা জেসেনস্কা। পারিবারিক জীবনে স্বামীর সঙ্গে অসুখী ছিলেন তিনি। সাধারণ সম্পর্ক নয়, কাফকা আর তার মধ্যে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধিক সাহিত্যিক সম্পর্ক। জেসেনস্কা ছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক নারী। কাফকার একটা গল্প জার্মান থেকে চেক ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে দুজনের মধ্যে সখ্য হয়। সূত্রপাত ঘটে চিঠি লেখালেখির। তাদের বেশিরভাগ চিঠিই ছিল লেখালেখি ও জগৎবীক্ষা নিয়ে। ফলে, জেসেনস্কা-কাফকার সম্পর্ককে প্রেম বলা যাবে কিনা, সন্দেহ। তবে কাফকা যে তার প্রতি দুর্বল ছিলেন সেটা বোঝা যায় যখন জেসেনস্কা স্বামীর কাছে ফিরে গেলেন তখন। ফিরে যাওয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই জেসেনস্কার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন কাফকা। কাফকার প্রতি এরপরও জেসেনস্কার শ্রদ্ধা আজীবন অক্ষুণ্ন ছিল। কাফকার বন্ধু ব্রডকে পরে তিনি লিখেছিলেন, কাফকা যেসব নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন তারা সবাই ছিলেন সাধারণ নারী। বলেছিলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে অসুস্থ। আমাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সুস্থ ব্যক্তি। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সব কিছু সঠিকভাবে দেখতে ও শুনতে পান।’ মিলেনা, বোঝা যায়, হতে পারতেন কাফকার নর্মসহচরী। কিন্তু এই সম্পর্কও স্থায়ী হলো না।

কাফকা সম্পর্কে গবেষকরা বলেছেন, তিনি অদ্ভুত একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বোধের দ্বারা মথিত ছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা, একাকীত্ব, নৈঃসঙ্গ্য আর হতাশায় ভুগতেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে বেশ লাজুক ও অন্তর্মুখী হলেও নারীদের সঙ্গে সহজেই সখ্য গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তীব্র যৌনবিতৃষ্ণা ছিল তার। অসংখ্য প্রেমে পড়লেও বিয়ের কথা ভাবতে পারতেন না। বিয়ে করেনও নি।

কিন্তু প্রেম, কাফকার জীবনে ছিল অনিঃশেষ আনন্দের উৎস। তাই শেষ যে নারীর সঙ্গে তার দেখা হলো সেই নারীর নাম ডোরা ডায়মন্ট। কাফকা তখন টিউবারকুলিসেসে ভুগতে ভুগতে জীবনের অন্তিমে পৌঁছে যাচ্ছেন। তখন ১৯২৩ সালের এক বিকেলে বাল্টিক সাগরতীরে দেখা হলো ডোরার সঙ্গে। কাফকার বয়স তখন চল্লিশ, ডোরার পঁচিশ। দ্রুত তাদের মধ্যে প্রেম বা ঘনিষ্ঠতা হলো। ডোরাই তাকে ভিয়েনার কিয়েরলিঙের একটা স্বাস্থ্যনিবাসে ভর্তি করিয়ে দিলেন। জীবনের শেষ বছর এই ডোরার সঙ্গে তিনি নানান জায়গায় ঘুরেছেন। তাকে বিয়েও করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯২৪ সালের ৩ জুন ডোরার কোলেই মৃত্যুবরণ করলেন কাফকা। বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল এক জ্যোতিষ্ক ঝরে গেল। কান পাতলে ডোরার মর্মন্তুদ রুদ্ধশ্বাস কান্না আজও হয়তো সেই স্যানেটোরিয়ামের চার দেয়ালের মধ্যে গুমরে গুমরে উঠছে, শোনা যাবে হয়তো।