• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৭ সফর ১৪৩৯
BK

আঞ্চলিক ভাষায় সমৃদ্ধ ‘হাইফেন’

আঞ্চলিক ভাষায় সমৃদ্ধ ‘হাইফেন’

ফেসবুকে পোস্ট দেখি ‘আঞ্চলিক ভাষা সংখ্যা’ প্রকাশ করতে চায় সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক ছোটকাগজ ‘হাইফেন’। হাইফেন-এর কর্ণধার প্রত্যয় হামিদ। আমার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী আর বিয়ে হয়েছে কুড়িগ্রামে। দুই এলাকার আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত আমি। তবে নোয়াখালীর ভাষা নিজে যতটা পারি কুড়িগ্রামের ভাষা অতটা রপ্ত করতে পারিনি। তাই অনুগল্প লিখি কুড়িগ্রামের ভাষায় আর বড় গল্প লিখি নোয়াখালীর ভাষায়— লেখা দুটোই পাঠিয়ে দিই। পত্রিকা প্রকাশের পর সূচি দেখে নিজেই ফেসবুকে পোস্ট লিখি— ‘বাবার বাড়ি নাকি শ্বশুরবাড়ি, জিতে গেছে শ্বশুরবাড়ি।’ পত্রিকাটি হাতে পেয়ে অবাক হয়েছি, কতটা পরিশ্রম করলে এমন একটি সংখ্যা করা সম্ভব। ২৪০ পৃষ্ঠার সংখ্যাটিতে ২৯ জেলার আঞ্চলিক ভাষার লেখা স্থান পায়।

শুরুতেই পুনঃপাঠে কবিতা লেখেন ওমর আলী। ‘সাহিত্যে কোনো উপদেশ নেই’ শিরোনামে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের। সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘লেখক যে ধরনের আঞ্চলিক ভাষাই ব্যবহার করুন না কেন, তা যেন পাঠক বুঝতে পারে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কমিউনিকেশনটা হতে হবে।’ আবার আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে সাহিত্য কাগজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সাহিত্যে আঞ্চলিকতা নিয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ একটা কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু খুব একটা সফল হননি। ভাষা তো সাহিত্যের প্রাণ। ভাষার দ্বারাই চরিত্র তার ধরন নির্ধারণ করে।’

প্রমিত বাংলায় ‘লালনগীতির তত্ত্বকথা’ নামের প্রবন্ধটি লেখেন ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল। অসাধারণ লেখাটি না পড়লেই সাহিত্যের অনেক কিছুই অজানা থেকে যাবে। ভাস্কর চৌধুরী, মাহমুদ কামাল, মতিন বৈরাগী, বিমল গুহ, হাসান হাফিজ, আমিনুল ইসলাম, শিবলী মোকতাদিরসহ মোট ২৩ জন নবীন-প্রবীণ কবির কবিতা রয়েছে এ সংখ্যায়। গল্পে রয়েছেন তিনজন— রফিকুর রশীদ, সখিনা সুলতানা ঝর্ণা, নাহিদ হাসান রবিন। এ ছাড়া আঞ্চলিক ভাষায় গল্প লিখেছেন— সপ্তদ্বীপা অধিকারী, মনি হায়দার, নূরুন্নবী নূর, মিলন বণিক, সোহেল মাহবুব, কাজী লাবণ্য, আনিফ রুবেদ, শান্তা মারিয়া, আহম্মেদ পিন্টু, লতিফ জোয়ার্দার রহিমা আক্তার মৌসহ আরো অনেকে। ‘ভাটির টানে’ নামে দীর্ঘ গল্প লেখেন এলিজা খাতুন। আর আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত মোট ২৮ জন কবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- আনোয়ার কামাল, আশরাফ পিন্টু, প্রত্যয় হামিদ, বঙ্গ রাখাল, চন্দনকৃষ্ণ পাল, স. ম. শামসুল আলম, দ্বীপ সরকার প্রমুখ।

‘নওগাঁর বিয়েবাড়ির গান’ নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন সাদ্দাম হোসেন এবং ‘নোয়াখালীর প্রবাদ প্রবচন’ নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ সফিউল হক। এই প্রবন্ধের মধ্যে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার ১২৪টি প্রবচন রয়েছে, যেগুলোতে উঠে এসেছে আঞ্চলিকতার অনেক দিক। মনি হায়দারের লেখা ‘আসমানী মেওয়া’ গল্পটি পড়তে গিয়েই মনে পড়ে জসীম উদ্দীনের লেখা ‘আসমানী’ কবিতাটি। কবিতার কথা মনে হলেও এখানে বিষয় ভিন্ন। যতটা কৌতূহল নিয়ে ‘আসমানী মেওয়া’ গল্পটি পড়া শুরু করি, ঠিক ততটাই বেড়ে যায় উত্তেজনা। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মিনহাজের বাবা জালালউদ্দিন আঙুরফল খেতে চায়। তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে কত জায়গায় ঘুরে সংগ্রহ করা হয় আঙুরফল। উত্তেজনা এটাই যে, শেষ পর্যন্ত জালালউদ্দিন খেয়ে যেতে পারবে তো? গল্পটি বরিশালের ভাষায়, ওই এলাকার মানুষ আঙুরফলকে বেহেশতের ফল হিসেবেই জানে। এ জন্যেই মনি হায়দার গল্পের নামকরণ করেন ‘আসমানী মেওয়া’। গল্পের জালালউদ্দিন তো খেতে চেয়েছে, কিন্তু গোটা গ্রামের সবার কৌতূহল চোখ দিয়ে দেখবে আঙুরফল। পড়তে যাই, শেষ পর্যন্ত খেতে পেরেছে তো! হতাশ হতে হয়। আঙুরফলের রস দেওয়ার পর গাল বেয়ে পড়ছে আঙুরের রস...। উপস্থিত লোকগুলো, প্রথমবারের মতো আঙুরফল আর মৃত জালালউদ্দিনের মুখ একসঙ্গে দেখতে থাকে।

অন্যদিকে পাবনার ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া অঞ্চল নিয়ে ‘সুগন্ধি আতরের গল্প’ লিখেছেন লতিফ জোয়ার্দার। কিশোরগঞ্জের ভাষায় ‘মিডুরি কনটেস্ট’ শিরোনামে রম্য রচনা করেন শামসুল হক শামস্। শুরুতেই না হেসে পারলাম না মোবাইলে নাম্বার সেভ করার নাম শুনে। হরমুজ আলী নিজের শ্বশুরবাড়ির নাম্বার সেভ করে ‘দিল্লিকা লাড্ডু’ নামে। শ্বশুরবাড়ির তৈরি (চালের গুড়া, নারিকেল ও গুড়ের তৈরি মিষ্টি বিশেষ) খাবার মিডুরি না খেতে পেরে ফেসবুকে ইভেন্ট খোলে। পুরস্কার ঘোষণা করে মিডুরি খাওয়ার স্বাদ মিটায়।

রবীন্দ্র গবেষক, প্রবন্ধকার প্রফেসর গোলাম কবির বলেছেন, ‘হাইফেন-এর আঞ্চলিক ভাষার সংখ্যাটা খুবই ভালো হয়েছে। এটা একটা সার্থক সংখ্যা। ধন্যবাদ সম্পাদককে এ ধরনের একটা উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।’ আমারও ধারণা, হাইফেন-এর আঞ্চলিক ভাষা সংখ্যার লেখকরাও এর সাফল্যের অংশীদার। হাইফেন-এর জন্য শুভ কামনা।