• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মহররম ১৪৪০
BK

শিক্ষক সঙ্কটের মধ্যেই বাড়ছে মেডিকেল কলেজ

শিক্ষক সঙ্কটের মধ্যেই বাড়ছে মেডিকেল কলেজ
প্রতীকী ছবি

দেশের চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় মূল সমস্যা শিক্ষক সঙ্কট। মেডিকেল কলেজগুলোতে এ সঙ্কট দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর তুলনায় বেসরকারিগুলোতে সঙ্কট বেশি। শিক্ষক সঙ্কটে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে মৌলিক বিষয় পড়ানোর মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই বেশিরভাগ মেডিকেল কলেজে। সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মিলিয়ে অন্তত ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষক দরকার হলেও আছে মাত্র ৯ হাজার ৪০৩ জন।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অনেক শিক্ষকের অভিযোগ, ঐতিহ্যবাহী থেকে শুরু করে নতুন প্রতিষ্ঠিত- সব মেডিকেল কলেজে কম-বেশি শিক্ষক সঙ্কট রয়েছে। শিক্ষক না থাকায় শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে পাঠদান হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা ভালো প্রস্তুতি নিতে পারছে না। শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে এ অবস্থায় তারা বিভিন্ন পরীক্ষায় ঠিকই অংশ নিচ্ছে। পরীক্ষায় কেউ কেউ ভালো ফল করলেও যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পড়াশোনা শেষ করে বের হলেও চিকিৎসক হিসেবে তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সঙ্কট দূর করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

এ অবস্থায় নতুন করে একের পর এক বেসরকারি ও সরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন পাচ্ছে। নওগাঁ, নেত্রকোনা, মাগুরা ও নীলফামারীতে সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সম্প্রতি অনুমোদন দিয়েছে সরকার। চাঁদপুরে একটি মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোয় শিক্ষক স্বল্পতা ও অবকাঠামো সঙ্কটের মধ্যে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন চিকিৎসা পেশার সঙ্কট আরো ঘনীভূত করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মনে করে, নতুন চিকিৎসক সৃষ্টির লক্ষ্যে মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন কলেজ হওয়ায় ও মেডিকেল কলেজে আসন বাড়ায় প্রতি বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি চিকিৎসক বেরিয়ে আসবে। ফলে চিকিৎসক ও শিক্ষক সঙ্কট দূর হবে। দেশে চিকিৎসকের চাহিদা ও জোগান নিয়ে ‘উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের’ (বিআইডিএস) পরিচালিত এক জরিপ বলছে, মেডিকেল কলেজ বেশি হওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়বে। বিআইডিএসের ওই জরিপের সঙ্গে অনেক বিশেষজ্ঞও একমত পোষণ করেন। ১৯৯২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৪৯টি আর ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪৭টি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন পায়। সব মিলিয়ে এখন সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৬টি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাইরের কর্মস্থলে একশ্রেণির চিকিৎসকের যেতে না চাওয়া, মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা ছেড়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হওয়া ও উচ্চ শিক্ষার জন্য অনেকের ছুটিতে থাকার কারণে শিক্ষক সঙ্কট আরো প্রকট হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ-উপাচার্য ডা. রশিদ-ই-মাহবুব এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘শিক্ষক সঙ্কট দূর করতে নতুন করে ভাবতে হবে। বিদ্যমান বিষয়গুলোর আধুনিকায়ন দরকার। না হলে সঙ্কট দূর হবে না।’

মেডিকেল কলেজের শিক্ষকতা ছেড়ে অনেকের ঝোঁক স্বাস্থ্য অধিদফতর, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরসহ মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হওয়া। কর্মকর্তা হয়ে অনেকে আর শিক্ষকতায় ফিরে যেতে আগ্রহী হন না। এতে শিক্ষক সঙ্কট বাড়ে বলে অনেকে মনে করেন। তবে ডা. রশিদ-ই-মাহবুবের মতে, ‘শিক্ষকতা ছেড়ে কর্মকর্তা হয়েছেন এ সংখ্যা বেশি নয়। এতে খুব বেশি সঙ্কট হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া দক্ষ কর্মকর্তাও দরকার।’

জানা গেছে, মেডিকেল কলেজগুলোতে মৌলিক বিষয় পড়ানোর শিক্ষকেরও সঙ্কট। চিকিৎসাশাস্ত্রের মৌলিক বিষয়গুলোর (বেসিক সায়েন্স) পাঠদানের বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের একই নীতিমালা আছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এ নীতিমালা ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল’ (বিএমডিসি) ২০০৯ সালে প্রণয়ন করে। নীতিমালা অনুযায়ী, মৌলিক বিষয় পড়াতে ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে উঠে এসেছে, বেশিরভাগ সরকারি মেডিকেল কলেজে বিএমডিসির নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক নেই। মৌলিক বিষয়ের শিক্ষক সঙ্কট দূর করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পরই উদ্যোগ নেন। ঢাকার বাইরের সরকারি মেডিকেল কলেজে বদলি করেন চিকিৎসকদের। অনেকেই ঢাকার বাইরে না গিয়ে নানা তদবির চালিয়ে ঘুরেফিরে ঢাকাতেই রয়ে গেছেন।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাজ করতে অনাগ্রহী এসব চিকিৎসকের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। ঢাকার বাইরে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকরা কাজে যোগ না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারিও উচ্চারণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপরও ঢাকার বাইরে না যাওয়ায় মেডিকেল কলেজে মানসম্মত চিকিৎসক তৈরিতে যেমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি তাদের কাছ থেকে মানসম্মত সেবাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তাও পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জামালপুর, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, যশোর, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ (কিশোরগঞ্জ) ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজে (গাজীপুর) মৌলিক বিষয়ের শিক্ষক সঙ্কট রয়েছে। পাবনা মেডিকেল কলেজে অ্যানাটমি, ফরেনসিক ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে কমপক্ষে ছয়জন করে শিক্ষকের প্রয়োজন থাকলেও মাত্র একজন করে শিক্ষক আছেন। অ্যানাটমি বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। বেশিরভাগ কলেজের চিত্র একই রকম।