• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১২ মহররম ১৪৪০
BK
ভিন্নমত

নমনীয়তা ও নৈতিকতার লাইসেন্স জরুরি

নমনীয়তা ও নৈতিকতার লাইসেন্স জরুরি
ছবি : ইন্টারনেট

সাঈদ চৌধুরী

বড় অসময়ে বাস আমাদের। চারদিকে এত বেশি হইহুল্লোড় যে, কেউ কারো খবর রাখাই ভুলে যাচ্ছে। যখন ঈদ আসে তখন অনেক আনন্দ হয় চারদিকে। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো, সবাই একসঙ্গে ঈদ করার জন্য বাড়ি ফেরা। এই আনন্দ এতটাই বেশি যে, যেকোনো মূল্যেই যেতে হবে বাড়ি, প্রিয়জনের কাছে। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি, এই আনন্দ অনেক সময় ইচ্ছে করে আগুনে পতিত হওয়ার মতো হয়ে দাঁড়ায়! প্রতিবার যখন ঈদ আসে তখন আরেকটি ব্যাপারও আসে, তার নাম হলো মৃত্যুর মিছিল।

প্রাচীনকালে মানুষ ভূত-পেত্নি বিশ্বাস করত। অনেক অনৈতিক ঘটনাকে চালিয়ে দেওয়া হতো ভূত-পেত্নির কাজ বলে। এমনো বলা হতো পূর্ণিমার রাতে বাইরে গেলে প্রসূতি মায়েরা সন্তান হারাতে পারে। একটি নির্দিষ্ট দিনে বাইরে গেলে ভূতে ধরতে পারে আর এখন সে বিশ্বাসগুলোই আবার আমাদের ওপর জেঁকে বসতে যাচ্ছে! ঈদ আসছে তো মৃত্যুও আসছে! এ যেন এক অমোঘ নিয়ম! যাচ্ছেতাইভাবে সড়কে মানুষ মরছে। এই ঈদেও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক। এর পেছনে দায় অনেকের, তবে বড় দায় হচ্ছে চালক-হেলপারদের অমানবিক ও অমনোযোগী হয়ে ওঠা। এই তো ঈদের দুদিন আগেই প্রথম আলোতে একটি শিরোনাম ছিল এমন- ‘গাড়ির সহকারীর হুঙ্কার, ও...রে দে মাইরা, বামে চাপ দিয়া দে!’

আমি নিজেও এমন অনেক ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছি। কোনো ছোট যানবাহন দেখলেই হেলপাররা সরাসরি বলে, ‘এই সর সর নইলে উঠাইয়া দেব’-এমন ধরনের কথাবার্তা! অনেক সময় এমনো হয়, নারীরা রিকশায় যাচ্ছে টিজ করার জন্য গাড়িটা একটু চাপিয়ে বিভিন্ন খারাপ কথা বলে চলে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রচণ্ড রকম নেশা করেও গাড়ি চালাচ্ছে অনেকে। মোবাইল ফোনে কথা বলা তো সেখানে খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপারই ধরে নিচ্ছে এরা।

এমন অবাক করা ঘটনাগুলো আপনি যখন পথে চলবেন, তখনই দেখতে পাবেন অহরহ। কিন্তু কিছু বলতে গেলে আপনিই অপরাধী এ মানুষগুলোর কাছে। দুর্ঘটনায় শুধু যে যাত্রী মারা যাচ্ছে তা কিন্তু নয়, মারা যাচ্ছে চালকরাও। মৃত্যুর পর কে আর কার খবর রাখে। আইন মানা, লাইসেন্স প্রদান সবই আপনি করতে পারবেন হয়ত, কিন্তু নমনীয়তা আর নৈতিকতার লাইসেন্স দেবে কে- বলতে পারেন? চালকদের কে বোঝাবে, তাদের সব কাজই ঠিক নয়। রাস্তায় যত চালক আছে তার মধ্যে কতজন চালক বা হেলপার এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক- যারা মানুষের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দিতে শঙ্কিত নয়? অনেক চালককে বলতে শুনেছি, একটি কুকুরকেও তারা ইচ্ছে করে মারে না। তবে কারা অমানবিক? হ্যাঁ, অমানবিক চালক খুঁজে বের করা খুব দরকার।

এই তো সেদিন, যখন বাসটির সঙ্গে লেগুনার সংঘর্ষ হয়, তখন লেগুনার চালক ছিল মোবাইল ফোনে ও বাসটি ছিল খুব দ্রুতগতির। ফল দাঁড়াল অনেক নিরীহ মানুষের মৃত্যু। আমরা যতটা না বধির হয়েছি, তার চেয়েও বেশি হয়ে গেছি বোধহীন। কোনো কথায় কারো কিছু যায় আসে না। যত নীতি কথাই বলুন, যার যার ক্ষেত্রে তার তার কাজটুকু করে যাওয়াই এখন বড় ক্ষমতা মনে হয়।

অসততা আর অনমনীয়তার যে বড় বড় ভূত-পেত্নি মানুষের মধ্যে আছর করে ফেলছে দিন দিন তা যেমন স্পষ্ট, তেমনি স্পষ্ট আমরা অসহনীয় হচ্ছি আর তার ফল গুনছে প্রাণগুলো। যত লাইসেন্স বা আইনের কথাই বলা হোক না কেন, মানসিকতার উন্নয়নই বড় বেশি প্রয়োজন এখন। যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্য মানুষের প্রতি একজন সহনশীল না হবে, ততক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ করেও সঠিক ফল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। চালকদের মানসিকতা উন্নয়নে হাইওয়ে পুলিশদের কাউন্সেলিংয়ের ভার দেওয়া হোক। প্রয়োজনে চালকের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটি গাড়ি চালানোর সময় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার ব্যাপারে কঠোরতা বাড়ানো হোক। দূরপাল্লার গাড়িগুলোতে বিআরটিএর নির্দিষ্ট ডিভাইস রাখার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে, যাতে কোনো গাড়ি নিয়মের বাইরে চালালেই তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মৃত্যু আর অনিয়ম যখন সমান হয়, তখন তা থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে— আবার সবকিছু নতুনভাবে শুরু করা। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে আর অবহেলা নয়। একে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার সময় এসে গেছে। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আমাদের সবার সহযোগিতা এবং সচেতনতায় আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারব অচিরেই। এই আশা আমাদের সাধারণ নাগরিকের।

লেখক : সদস্য, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, শ্রীপুর, গাজীপুর