• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৮ সফর ১৪৩৯
BK
এনইসিতে উঠছে শত বছরের পরিকল্পনা

ডেল্টা প্ল্যানে গুরুত্ব পাচ্ছে সুন্দরবন

ডেল্টা প্ল্যানে গুরুত্ব পাচ্ছে সুন্দরবন
সংগৃহীত ছবি

পদ্মা, মেঘনা আর যমুনার মিলনস্থলে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বৃহৎ বদ্বীপ বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে ছোট আর বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০০ নদী। সমুদ্র উপকূলের আয়তন ২৭ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটার। সমুদ্র, নদী আর স্থলভূমির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অপরূপ সৌন্দর্যের আধার সুন্দরবন। তবে শিল্পায়নের ছোঁয়া আর নদীপথে পণ্য পরিবহনের কারণে সুন্দরবন সৌন্দর্য হারাচ্ছে। প্রক্রিয়াধীন কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা এ সুন্দরবন। ঝুঁকিতে রয়েছে বনটির জীববৈচিত্র্য। এ অবস্থায় সুন্দরবন রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। আগামী একশ বছরের জন্য প্রণয়ন করা ডেল্টা প্লানেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সুন্দরবন রক্ষার বিষয়টি।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ডেল্টা প্ল্যানের খসড়া ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করেছে সরকার। নেদারল্যান্ড সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে প্রণয়ন করা পরিকল্পনাটি ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১৯ নির্দেশনা পালন করে খসড়াটি সংশোধন করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) পরবর্তী সভায় অনুমোদনের জন্য খসড়াটি উপস্থাপন করা হবে। আগামী মঙ্গলবার এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় দেশের ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর দেশের মোট আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। এ হিসাবে ৯১ শতাংশের বেশি ভূমি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। মোট ছয়টি হট স্পটের আওতায় জলবায়ু সংক্রান্ত ভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে পরিকল্পনায়। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের আয়তন ২৭ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটার। আর বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ২২ হাজার ৮৪৮ বর্গকিলোমিটার। এর বাইরে হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ১৬ হাজার ৫৭৪ বর্গকিলোমিটার, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার, নদী ও মোহনা অঞ্চলে ৩৫ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার এবং নগরাঞ্চলের ১৯ হাজার ৮২৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে পরিকল্পনায়।

পরিকল্পনাটির খসড়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, নদী ও উপকূলীয় এলাকার ভাঙন, স্বাদুপানির প্রাপ্যতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং পরিবেশের অবনমনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের ৫ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে স্বাদুপানির দুষ্প্রাপ্যতা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পরিবেশের অবনমন। এ ছাড়া হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী এবং মোহানা অঞ্চল ও নগরাঞ্চলের জন্য ৫টি করে চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে।

হট স্পটগুলোর এসব চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে প্রস্তাবিত কৌশলে নদী ও পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা, পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা, পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্মত স্বাদুপানি সরবরাহ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা করা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা এবং বন্যা ও জলাবদ্ধতাজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় জলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা ও সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনায়।

এসব অঞ্চলে ঝুঁকি মোকাবেলায় কর্মকৌশল বাস্তবায়নে ১৪ বছরে ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার সুপারিশ করা হয়েছে পরিকল্পনায়। ২০১৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের ২৩টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ৯ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ৬ প্রকল্পে ২ হাজার ৭৯৮ কোটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৮ প্রকল্পে ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি, নদী ও মোহনা অঞ্চলে ৭ প্রকল্পে ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি ও নগর অঞ্চলের জন্য ১ প্রকল্পে ৬৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনায়।

পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৫ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে জলাভূমি রয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪০০ হেক্টর। এ অঞ্চলের নদীর নাব্য রক্ষায় ঘষিয়াখালী চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছে। ড্রেজিং পরিচালনা করার কথা রয়েছে অন্যান্য চ্যানেলেও। সুন্দরবনের আশপাশে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ সৃষ্টি, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা ও দ্বীপগুলোর উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় নতুন ভূমি জেগে উঠলে ম্যানগ্রোভ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বনায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের পানিসম্পদ নিয়ে ১০০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কাজ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ শীর্ষক এ পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। পরিকল্পনা তৈরির জন্য ৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে দেশটি। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে চলতি বছর। এতে মোট ব্যয় হবে ৮৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জিইডির সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পানিবিজ্ঞান ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এক্ষেত্রে দেশের আটটি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকিমাত্রার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন জেলাগুলোকে একেকটি গ্রুপের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সমস্যা মোকাবেলার উদ্যোগও পরিকল্পনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।