• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১২ মহররম ১৪৪০
BK

কোটা ও নিরাপদ সড়ক : প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য সমাধান

কোটা ও নিরাপদ সড়ক : প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য সমাধান
আর্ট : রাকিব

প্রথমেই বলে নিই দুটো জরুরি বিষয় সম্পর্কে। এক. সড়কের নিরাপত্তা, দুই. কোটা নিয়ে সিদ্ধান্ত। এক্ষণে সরকারের এই দুটো বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেশের মানুষ দেখতে চায়। এতে লাভ-লোকসানের হিসাব কষলে, বলা যায় সরকারের লাভ। এই মুহূর্তে সরকারকে আমরা লাভবান দেখতে চাই। কারণ, সামনে নির্বাচন। সবকিছুর কেন্দ্র এখন নির্বাচন। বিষয়গুলো আবর্তিত হবে নির্বাচনকে ঘিরেই। সেজন্য সরকার সতর্ক থাকুক, নিরাপদ হোক, জনগণকে আশ্বস্ত করুক। সরকার ও ক্ষমতা, ক্ষমতার প্রভাব; রাষ্ট্রকাঠামোয় এখন ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ কথাটা একটু ঝুলে গেছে। সফিল বললে, এ পৃথিবীতে গণপ্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র, কথা সমান কাজ, ওয়াদা সমান পদক্ষেপ— তেমন নেই। খুব বেশি জানতে হয় না, বিনা কারণে খুব অমানবিক জীবনযাপন করে মানুষ, পৃথিবীর অনেক মানুষ বিনা অপরাধে জীবন দিয়েছে, জেল খেটেছে, নির্বাসিত হয়েছে, ক্যু করে মারা হয়েছে, ফাঁসিকাষ্ঠে মারা হয়েছে, নির্যাতন করে করে ধুঁকে ধুঁকে মারা হয়েছে— সবই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে। কিছুদিন আগে মিসরে হোসনি মোবারকের পতনের পর বা ইরাকে সাদ্দামের পতনের পর, লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর কত নিরীহ মানুষ মারা গেছে! তার কোনো হিসাব নেই। এদেশে বঙ্গবন্ধুর পরিবারে নিরীহ শিশু, বধু পরে জিয়া সরকারের সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে নানা অজুহাতে, লক্ষ্যে অলক্ষ্যে প্রাণ দিতে হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রে ‘প্রজাতন্ত্র’ বা ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ কথা লেখা আছে। আবার বিপরীতও হয়। নথুরাম গডসে গান্ধীকে প্রার্থনা মন্দিরে মাত্র তিনটি বুলেটে হত্যা করেন। ইন্দিরা-রাজীব হত্যা কিংবা শ্রীলঙ্কায় জয়বর্ধনে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডিও হত্যা হয়েছে আততায়ী কর্তৃক। বস্তুত, রাষ্ট্রকে ঘিরেই এসব হত্যাকাণ্ড। পাকিস্তানে ভুট্টোকে কিংবা বাংলাদেশে তাহেরকে মারা হয়েছে, সামরিক আদালতে বিচারের নামে। কথাগুলো আসছে, রাষ্ট্র ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে। দুটোই অভিন্ন অর্থ। সেখানে ‘গণ’-মানুষ তো কিছুরই খবর জানেন না। কিন্তু রাষ্ট্র চলে তার নামে। বঙ্গবন্ধু বার বার নানা বক্তৃতায় বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্র চলে, রাষ্ট্র মানে থানা-পুলিশ-র্যাব-আইন-বিচার ইত্যাদি। সেই জনগণকে জবাবদিহি করা, তাদের সেবা দেওয়া প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের কর্তব্য। এ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু কার্যত তা দেখা যায় না। সরকারের ক্ষমতা আছে, বিশেষ ক্ষমতাও আছে— তাও ব্যবহার করা সমীচীন জনগণের সার্বিক কল্যাণে। কার্যত তার অপব্যবহার হয়। এই অপব্যবহারের বিপরীতে ক্ষুব্ধতা দানা বাঁধে। জনতার ঐক্য তৈরি হয়। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন যারা, অতীতে দেখা গেছে তারা ক্ষমতান্ধ থেকেছেন। স্তাবকরা ক্ষমতার ঘি খেয়ে একটা নির্ধারিত বলয় তৈরি করেন। তার ফলে ক্ষমতায় থেকে বাইরের অনেক কিছু দেখা যায় না। ফাঁপা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। গভীর সত্যকে টের পাওয়া যায় না। চোখে দেখা যায় না অনেক কিছু। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। দম্ভ বা অহঙ্কারের কালোছায়া নেমে আসে। এই ভূতছায়া হঠাৎ কিন্তু অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। আর সেটি হয়ে গেলে আশপাশে কেউ তখন থাকবে না। থাকে না। মাত্র দলীয় প্রধান বা নেতৃস্থানীয় দু’একজন ভুবনের ভার বয়ে বেড়ান। খুব নির্মম সত্য, আত্মবিশ্বাসের তীব্রতায় মুজিব-ইন্দিরার অসাবধানী হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল, সেটা গ্রেট লিডার হিসেবে অবশ্য মান্য। কিন্তু ইতিহাসে এটাও তো সত্য যে, নথুরাম গডসে তার স্বীকারোক্তিতে বলেছিল : ‘If I were to kill Gandhiji, the indian politics in the absence of Gandhiji would surely be proved practical, able to retaliate, and would be powerful with armed forces.’ ব্যক্তি-আদর্শ যত কল্যাণমুখীই হোক, কারো কারো কাছে তা অপ্রয়োজনীয় এবং প্রিটেনশাস মনে হয়। গান্ধীজীর মতো ‘অহিংস’ মানুষকেও এমনটা শুনতে হয়েছিল। সুতরাং রাষ্ট্রনায়করা রাষ্ট্রনায়কোচিত হন নানা গুণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাদের ভুলও থাকে।

এই ভুলের ঊর্ধ্বে উঠতেই এমন বিষয়ের অবতারণা। এখন সরকার বা রাষ্ট্র উপরের দুটো দাবিকে কী চোখে দেখছে? যারা সরকারের অনুগ্রহভাজন, তারা কেউই এ দুটো বিষয়ে কথা বলতে চান না। কিন্তু এ দুটো বিষয়ে জনগণের মত পরিষ্কার। এটাকে অন্য পথে পরিচালিত করার সুযোগ কম। কারণ, প্রযুক্তির নানা কল্যাণে সজাগ ও সচেতন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের বিষয়টিও অনেকেই সচেতন দৃষ্টিতে দেখেন। এখন সমাজে যদিও ভোগ ও লালসার মাত্রা অনেক, ঠিক একইভাবে বিশ্বাস ও বিবেকের তাড়নাও কার্যকর। কারণ, মানুষ শেষ পর্যন্ত সত্যটিই গ্রহণ করে এবং অসত্যকে ঘৃণা করে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমছে কই? কেন? এই নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু পরিবারে বা সমাজে একটি মৃত্যু অনেক কষ্টের ও বেদনার। কেউ এটা ভোলে না। এটি একটি সেন্টিমেন্ট! আমাদের পরিবহন সেক্টর অনেক বড়। এটা কারো প্রতিপক্ষ নয়। কিন্তু এর পেছনে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এক অর্থে, মাঝে মাঝে মনে হয়, দেশের পুরো শাসন-কাঠামো বুঝি এর পেছনে জিম্মি। এ জিম্মিত্বের অবসানের কথা ভাবতে হবে। যে কারণে এই ইন্টারেস্ট গ্রুপকে কেউ নাড়াতে চায় না। কিন্তু এটি আয়ত্তে না নিলে ভবিষ্যতে পরিণাম সুখকর হবে বলে মনে হয় না। যেকোনো শক্তি যদি অনিয়মতান্ত্রিকভাবে জনগণকে জিম্মি করে, জনগণ তার পক্ষে থাকবে না। এবং একটা পর্যায়ে তার বহির্প্রকাশ ঘটবেই। যেটা গত আন্দোলনে প্রমাণিত হয়েছে। সরকার আশা ও আশ্বাস দিয়েছে, সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগে শৃঙ্খলার কথা বলেছে, কিন্তু কার্যত তা হয়নি। কারণ, এটা সহজে হওয়ার নয়। যত আশ্বাসই দিক, সম্ভব হওয়া কঠিন। সড়কে জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি, আমজনতা সড়কে চলাচলের ব্যাপারে সচেতন নয়, অনেক ফিটনেসহীন গাড়ি চলে, লাইসেন্সহীন চালক আছেন, অনেক বিকল্প যানবাহন বেশুমার রাস্তায় চলছে— তাদের ওপর কোনোরকম নজরদারি নেই, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চালকরা অধিকাংশই দরিদ্র ও নিরক্ষর এবং এই নানারকম যানবাহনে শ্রেণিমতো মানুষ চলাচল করে। এ ছাড়া প্রাইভেট কার, মাইক্রোও চলে। এই বিরাট সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই কঠিন। দুই একটি অর্ডারে কিছু হওয়ার নয়। যেকোনো দিন স্ট্রাইকে একদিন বন্ধ হলে দেশে কোটি কোটি টাকা লোকসান। তবে এটা নিষ্ঠুর হলেও সত্য, একে ক্রমশ ঢেলে সাজাতে হবে। সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে রেল ও নৌপথকে জনপ্রিয় করতে হবে। স্বল্পমূল্যে, সহজে যোগাযোগের পথ তৈরি করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সড়কে চাপ কমাতে হবে। প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশে রেল জনপ্রিয় হচ্ছে না কেন? মানুষ তো রেলকে প্রাধান্য দিতে চায়। কিন্তু সেখানে টিকেট নেই। অথচ কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনছে— কেন! নৌপরিবহনে কার্যকর উন্নতি নেই। এই বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে সরকারকে তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা অনেক পরিকল্পনা করি, তা কিছুটা লোক দেখানোও বটে। মেট্রোরেলসহ বড় বড় যে প্রকল্পগুলো সরকারের হাতে আছে, তা কখন কার্যকর হবে আর তা হলেও সচল থাকবে কীভাবে? পরিকল্পনা আছে কী? সব কাজ তো মনে হয় অ্যাডহকভিত্তিক। সন্দেহ নেই, ট্রাফিক ব্যবস্থা দুর্বল এবং দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। এটাকে কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। বিআরটিএ থেকে হয়রানি ও দুর্নীতি রোধ করতে হবে। এগুলো করার জন্য সুশাসনই যথেষ্ট। আমরা দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এক রাতেই ফুটপাথ পরিষ্কার হয়। অথচ এখন হয় না। কারণ কী? দলীয়করণ বা দলবাজি আর ক্ষমতার ব্যবস্থা ফুটপাথ পর্যন্ত চলে গেছে। এই যখন পরিণতি, তখন সড়কে শান্তি আসার কোনো কারণ নেই। এ জন্য কিছু স্বল্পমেয়াদি এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনই জরুরি। এবং তা প্রয়োগে সরকারকে হতে হবে দৃঢ়। শিশুসন্তানরা রাস্তায় নেমেছে, তারা ট্রাফিকের কাজ করিয়ে দেখিয়েছে— এগুলো একপ্রকার ক্ষোভের বহির্প্রকাশ। এর স্পন্দন দলমত নির্বিশেষে ভাবতে হবে। তবে সরকারের দায়িত্ব সবার ওপর। সেটা এক্ষুণি করা দরকার। ফলদায়ক কিছু করে দেখাতে হবে। অন্তত, এই নির্বাচনের আগে।

অন্যটি কোটা সংস্কার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কমিটি করেছেন। কাজও হচ্ছে। তবে এই নিয়ে জনমনে সন্দেহ আছে। দুটো পক্ষও মনে হয় তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ কোটা সংস্কারের পক্ষে (যদিও সংস্কার নিয়ে অনেক মত, পথ, যুক্তি আছে)। অন্য একটি অংশ বিপক্ষে। আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের অর্জনকে সম্মান দেখিয়ে যে সুবিধা বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাতে সততা তেমন ছিল না, বরং পুঁজি করা হয়েছে— তাতে একটা ‘সংস্কৃতি’ দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই জানি, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও এখন পরিষ্কার নয়। এই নিয়ে নানা সময় একধরনের তামাশা হয়েছে। দ্বিধা-বিভক্ত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা, দলবাজির খপ্পরে পড়েছেন। আসলে পঁচাত্তরের পরে মুক্তিযুদ্ধের সবকিছুর ওপর তো কালিমা লেপন করার চেষ্টা হয়েছে এবং তাতে সফলও হয়েছে। ফলে এই লেজেগোবরে পরিণতির ফল ভালো হয়নি। কোটা নিয়ে সরকারের ‘ভয়’ হয়তো আছে। কিন্তু গ্রহণযোগ্য ও সমর্থনযোগ্য একটি সমাধানের পথ শিগগির সরকারকে বের করতে হবে। তার কারণ, যে আন্দোলনটি জমাটবদ্ধ ছিল এবং দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল তা জনমতের প্রতিফলনস্বরূপ। এটা আমলে নিয়ে যথাযোগ্য সমাধান বের করা দরকার এবং তা করাও বোধ করি অসম্ভব কিছু নয়। পার্লামেন্টে কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো রকমের সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

এ দুটো বিষয়ে সরকার ইতিবাচক ও যথোপযুক্ত হলে, ভবিষ্যতে সে আস্থার আলোটা কাজে লাগাতে পারবে। এটা ‘সাবমিসিভ’ হওয়া নয়, অবশ্যই জনগণের আস্থা তৈরির পদক্ষেপ। সেটি ছুড়ে ফেলে দিলে বিপরীত হতে পারে। যে সুযোগ আন্দোলনের সময়ে অন্যদের নিতে দেখা গেছে। ফলে রাজনীতিতে অন্যকে সুযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এ দুটো বিষয়ে সরকার এখনো নাখোশ। মনে হয় যেন অপাপবিদ্ধ সরকার কোনো পাপ নিতে চাইছে না! আসলে কি তাই?

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়