• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১১ মহররম ১৪৪০
BK

অপার সম্ভাবনার মাশরুম চাষ

অপার সম্ভাবনার মাশরুম চাষ
সংগৃহীত ছবি

ড. আহমেদ ইমতিয়াজ

কৃষিতে সেকেলে চাষ পদ্ধতির কারণে বাংলাদেশ তথা পৃথিবীতে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় খাদ্য চাহিদা মোকাবেলায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা বিবেচনার পাশাপাশি জলবায়ু উপযোগী উচ্চ ফলনশীল খাদ্যের সম্ভাবনাকে বেশি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু শর্করাসমৃদ্ধ খাদ্যের সরবরাহই এ সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না। বরং এমন একটি সুষম আদর্শ খাদ্য চাই যা সত্যিকারেই প্রয়োজনীয় পুষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যবস্তুতে শর্করার পাশাপাশি থাকতে হবে পর্যাপ্ত আমিষ, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ।

মাশরুমই হতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত আদর্শ খাদ্য। কারণ মাশরুমের পুষ্টি ও ঔষধি গুণ অপরিসীম যা আন্তর্জাতিক গবেষণায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। বহুবিধ জটিল ও কঠিন রোগ প্রতিরোধ এবং নিরাময়ের পাশাপাশি এই উদ্ভিদে রয়েছে অতি সুসহনীয় মাত্রার কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন, ফাইবার এবং মিনারেলসহ অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য ও ঔষধি উপাদান, যা মানুষের শারীরিক গঠন, বিকাশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অতুলনীয় তথা অত্যন্ত কার্যকরী।

উল্লেখ্য, মাশরুমের পুষ্টিমান সবজি এবং মাংসের মাঝামাঝি। তাইতো মাশরুমকে সবজি আমিষ তথা গরিবের মাংসও বলা হয়। এখন প্রশ্ন হলো মাশরুম কী? সহজ কথায় মাশরুম হলো অপরিসীম পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন বিশেষ ধরনের এক প্রকার সবজি জাতীয় উদ্ভিদ (ছত্রাক), যা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া ধুলাহীন পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঘরের মধ্যে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ করা হয় এবং শতভাগ হালাল ও বেহেশতি খাবার। ধারণা করা হয়, পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যে মান্না বা মান (আসমান থেকে আগত খাদ্য বিশেষ) পরিভাষা/শব্দ ব্যবহূত হয়েছে সেই মান্না বা মান হলো মাশরুম। ঔষধি গুণসমৃদ্ধ, পুষ্টিমাণে ভরপুর, বলবর্ধক তথা রোগ প্রতিরোধী উদ্ভিদ হওয়ায় মাশরুম অভিজাত, রাজকীয় ও আদর্শ খাদ্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সমন্বিত পুষ্টিসমৃদ্ধ অতি উন্নত খাদ্য হওয়ায় মাশরুম ভেজিটেরিয়ানদের জন্যও আদশ্য খাদ্য।

মাশরুমের ঔষধি গুণাগুণ অপরিসীম হওয়ায় এর কবিরাজি ব্যবহারও বহু বছরের ঐতিহ্য। তথাপি বিগত দুই দশকে মাশরুমের ঔষধি প্রয়োগ নিয়ে গবেষণায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। হাইপারটেনশন, হাইপারকোলেসটেরোলমিয়া এবং ক্যানসারের মতো ভয়ঙ্কর রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে মাশরুমের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। সাম্প্রতিক গবেষণায় মাশরুমে এমন কতকগুলো ঔষধি উপাদান পাওয়া গেছে যাদের ইমুনোমোডিউলেটরি, কার্ডিওভাসকুলার, লিভার প্রোটেকটিভ, অ্যান্টিফাইব্রোটিক, অ্যান্টিইনফ্লামেটরি, অ্যান্টিডায়াবেটিক এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা আছে। মাশরুম থেকে এমন কতকগুলো উপাদান পৃথক করা সম্ভব হয়েছে যা এইডসের জীবাণু এইসআইভি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব গুণের জন্যই মাশরুম সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ঔষধি উপাদানের উৎস ছাড়াও শিল্প-কারখানায় ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উদ্ভিদ হওয়ায় মাশরুমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বহুবিধ প্রয়োগ থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে মাশরুমের গবেষণা, উৎপাদন ও ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত।

পরিসংখ্যান মতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে যা এই অঞ্চলের খাদ্য সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে বহু গুণ। কারণ, অপর্যাপ্ত আয় এবং পৃথিবীতে সবকিছুর মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিশ্ববাসী ইতোমধ্যে চরম অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। তদুপরি বৈশ্বিক পরিবর্তন, নানাবিধ রোগ-বালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের দরুন মানুষ একদিকে যেমন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তেমনি বিকল্প ও নতুন পুষ্টিময় খাদ্যের সন্ধানে উদগ্রীব। এমনিতেই মাথাপিছু ফসলি জমির পরিমাণ একেবারেই নগণ্য, তথাপি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কৃষি জমি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশে মাশরুম চাষ একটি সম্ভাবনাময় উপায় হতে পারে।

মাশরুম চাষের কতকগুলো উল্লেখযোগ্য দিক হলো— মাশরুম চাষের জন্য তেমন জায়গা জমির প্রয়োজন হয় না। বসতবাড়িতে এবং বাড়ির আশপাশেই কুঁড়েঘরেও মাশরুম চাষ সম্ভব। মাশরুম চাষের জন্য সবল সামর্থ্যবান শ্রমিকও প্রয়োজন হয় না। নারী পুরুষ, স্কুলগামী ছেলেমেয়ে এবং বৃদ্ধরাও সফলভাবে এই কৃষি কাজ করতে সক্ষম। সুতরাং পরিবারের সবাই তাদের স্ব-স্ব কাজের পাশাপাশি মাশরুম চাষ করতে পারে। বাংলাদেশে মহিলারা সাধারণত বাড়ির অভ্যন্তরে কাজ করতে অভ্যস্ত। তাদের জীবনযাত্রা বিবেচনা করলে বলা যায়, মাশরুম চাষ এই অঞ্চলের মহিলাদের জন্য খুবই উপযোগী। ফলে এই কৃষির মাধ্যমে সময়কে কাজে লাগিয়ে বাড়তি রোজগার করা সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান বিশ্বে যত সমস্যা আছে পরিবেশ বিপর্যয় তার মধ্যে অন্যতম। কৃষি কাজে ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার পরিবেশকে ক্রমেই হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আশার বাণী হচ্ছে মাশরুম চাষ করতে রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার একেবারেই শূন্য, তাই মাশরুম চাষ খুবই পরিবেশবান্ধব।

আপরদিকে ধান এবং গম হলো আমাদের প্রধান দুটি অর্থকরী ফসল। উল্লেখ্য, মাশরুম চাষ ধান এবং গম চাষের তুলনায় লাভজনক। ক্রয়কৃত বীজে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে বসতবাড়িতেই মাশরুম চাষ সম্পন্ন করা যায়। ধান বা গম চাষে যে সময় লাগে সেই সময়ে চার চালান মাশরুম চাষ করা যায়। ফলে অন্যান্য ফসল চাষের তুলনায় মাশরুম আবাদের মাধ্যমে তাড়াতাড়ি কৃষকের হাতে অর্থ ফিরে আসে। তাই এই কৃষির দ্বারা খুব দ্রুত কৃষি ঋণ পরিশোধ করে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করা সম্ভব।

অন্যদিকে মাশরুম চাষে ব্যবহূত সাবস্ট্রেট পরিত্যক্ত হলে তা অন্যান্য কৃষি কাজে উৎকৃষ্ট সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সাবস্ট্রেট উদ্ভিজ্জ পদার্থ হওয়ায় এবং রাসায়নিক উপাদান না থাকায় আদর্শ জৈব সার হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। মালনিউট্রিশন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য ক্রয় করা দরিদ্র মানুষের পক্ষে অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। মাশরুম ছাড়া প্রায় সব রকমের ফসল চাষের জন্য নানা ধরনের কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, হার্বিসাইডসহ ভয়ঙ্কর সব রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় যা খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে তিলে তিলে আমাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিষময় খাদ্যের বিভীষিকা থেকে আত্মরক্ষার একমাত্র ও বিকল্প সবজি মাশরুম অন্ধকারে আলোকবর্তিকার মতো দারুণ কার্যকর। 

বাংলাদেশে মাশরুম নিয়ে বড় পরিবর্তন আনতে চাইলে উন্নতজাতের মাশরুম চাষ করতে হবে। আর উন্নত জাতের মাশরুম চাষ করতে হলে এই কৃষিতে চাই আধুনিকতার ছোঁয়া ও দীর্ঘমেয়াদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা। একজন মাশরুম গবেষক হিসেবে উন্নত দেশগুলো আমি যেহেতু মাশরুম শিল্পকে খুব কাছ থেকে দেখেছি সেক্ষেত্রে আগ্রহী উদ্যমী বড় কোনো শিল্প উদ্যোক্তা এগিয়ে এলে নতুন শিল্পের পাইওনিয়ার তৈরিতে আমি আমার সাধ্যমতো সার্বিক সহযোগিতা করতে পারব। সার কথা হলো, সুপরিকল্পিত মাশরুম শিল্প আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা হতে পারে।    

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ই-মেইল : imtiaz269@yahoo.com