• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১০ মহররম ১৪৪০
BK

ঋণের ৯০ হাজার কোটি টাকা কাগজে নিয়মিত!

ঋণের ৯০ হাজার কোটি টাকা কাগজে নিয়মিত!
প্রতীকী ছবি

ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে তফসিলি ব্যাংকের ৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ আদায়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বড় গ্রাহকরা এই বিপুল পরিমাণ ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করেছেন। কিন্তু আদায় হচ্ছে না। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে ঋণের পুনঃতফসিল হার। কাগজে নিয়মিত এই ঋণের পরিমাণ ব্যাংক খাতে মোট ঋণের প্রায় ৮ ভাগের একাংশ। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করে নিয়ে গেছেন গ্রাহকরা। ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে ন্যূনতম পরিমাণ পরিশোধ করে গ্রাহককে ঋণ নিয়মিত করে দেয় ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পুনঃতফসিল করা ঋণের অর্ধেকের বেশিই একসময় খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। কিছু গ্রাহক সাময়িক ব্যবসায়িক লোকসানে পড়ে আইনি এই সুযোগ নিলেও বেশিরভাগ গ্রাহক এটিকে ফায়দা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন।

২০১৭ সালে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়ে গেছেন ব্যবসায়ীরা। যা বিগত কয়েক বছরে সর্বোচ্চ। ২০১৩ সালের পর থেকে এত বড় অঙ্কের ঋণ আর কোনো একক বছরে পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুশাসনের ঘাটতি ও যাচাই-বাছাই না করে বেপরোয়াভাবে ঋণ বিতরণ করছে ব্যাংকগুলো। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে বর্তমানে একই চিত্র, যা উদ্বেগজনক। ঋণ বিতরণে অনিয়মে ব্যাংক খাতে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংকের বড় বড় গ্রাহকরা ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না। গ্রাহকদের অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের দায় পরিশোধ করছেন না। অনেকে সঠিক ব্যবসায়িক নীতি না মানায় লোকসানে পড়ছেন। তখন বাধ্য হয়ে ওইসব গ্রাহকের ঋণ ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত করতে হয়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকা। যার ৬৫ হাজার কোটি টাকা মন্দ ঋণ। মন্দ ঋণের বড় অঙ্কই আদায় হয় না। আর এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের হিসাবের খাতা থেকে রাইট অফ করতে হয়েছে।

২০১৩ সালে ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন গ্রাহক ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ ন্যূনতম কিস্তি পরিশোধ করে নিয়মিত করে নেন। পরের বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় এই সুযোগ কমে যায়। ফলে কমে যায় ঋণের পুনঃতফসিল হার। ২০১৪ সালে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল করার অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে মোট ১৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিলে বড় উল্লম্ফন হয়েছে ২০১৭ সালে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণের পুনঃতফসিল করে নিয়েছেন গ্রাহকরা।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ঋণের সবচেয়ে বেশি পুনঃতফসিল হয় তৈরি পোশাক খাতের। মোট পুনঃতফসিল ঋণের ৫ ভাগের একাংশ এই খাতে। অথচ দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে এই খাতের মাধ্যমে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। প্রায় ৩০ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় এসেছে পোশাক খাতের মাধ্যমে। তৈরি পোশাক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। যার ১০ হাজার কোটি টাকা অবশ্য খেলাপি হয়ে পড়েছে।

হিসাব বলছে, পোশাক খাতের মোট ঋণের ১৫ শতাংশ হারে প্রতি বছর পুনঃতফসিল করে নেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। আর ঋণের পুনঃতফসিল হার সবচেয়ে কম চলতি মূলধনের জোগান হিসেবে প্রদত্ত অর্থে। ঋণ পুনঃতফসিলের অর্ধেকই করা হয়ে থাকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে। মোট পুনঃতফসিল ঋণের ৫১ শতাংশ করে থাকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ এ ব্যাপারে বলেন, ব্যাংক খাতে একধরনের অদৃশ্য প্রভাব তৈরি হয়েছে। একটি বড় বলয় নিয়ন্ত্রণ করছে এই খাতকে। এটি ভাঙতে হবে। তা না হলে ব্যাংক থেকে টাকা বেরিয়ে যাবে। ব্যাংকের ভল্টে সেই টাকা আর ফিরবে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগটি একটি আইনি সুযোগ। এটি যদি কোনো গ্রাহক অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে সেটি আসলে শনাক্ত করা কঠিন।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি বছরের শেষ দিকে ঋণ পুনঃতফসিল করার হিড়িক শুরু হয়। বড় অঙ্কের ঋণ এ সময় হালনাগাদ করে নেন ব্যবসায়ীরা। ব্যাংকগুলোও নিজেদের আর্থিক অবস্থা ভালো দেখাতে ব্যবসায়ীদের ছাড় দিয়ে থাকে।