• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ সফর ১৪৩৯
BK

শিক্ষকের আচরণ ও আনন্দদায়ক শিক্ষা

শিক্ষকের আচরণ ও আনন্দদায়ক শিক্ষা
আর্ট : রাকিব

পড়াশোনায় ভালো করার মূল সূত্র হলো শিক্ষার্থীর ভালো করার ইচ্ছা ও শেখার আগ্রহ। অর্থাৎ শেখার আনন্দটাই আসল। ‘রিডিং ফর প্লেজার’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ওষুধ মুখে ভালো না লাগলেও তা খেলে রোগ ভালো হতে পারে; কিন্তু যে বিষয়টি পড়তে ভালো লাগে না, তা পড়লে শিক্ষার্থীর খুব একটা কাজে আসে না। বিষয়টি ব্যক্তিজীবনে আমরা অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছি। পরীক্ষায় পাস করার জন্য আমরা অনেক কিছু পড়ে এসেছি; কিন্তু এখন তা মনেও নেই। বাস্তবজীবনে কাজেও লাগতে পারছি না। একাডেমিক ক্ষেত্রে পড়া ভালো লাগুক আর না-ই লাগুক— ওষুধের মতো শিক্ষার্থীকে তা গলাধঃকরণ করতে হয়, পরীক্ষা দিতে হয় এবং সার্টিফিকেট নিতে হয়। অর্থাৎ কোনো বিষয় ভালো না লাগলেও তা পড়তে হয়। আর এখানেই হয়েছে সমস্যা। তাই শিক্ষা-বিজ্ঞানী, শিক্ষা-গবেষক সবাই জোর দিচ্ছেন একাডেমিক পড়াটাকে কীভাবে আনন্দের মধ্য দিয়ে পড়ানো যায়। এটি করা গেলে শিক্ষার্থীরা প্রভূত উপকৃত হবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শিক্ষার্থীদের শেখার আনন্দটাকেই মাটি করে দেয় শিক্ষকের খিটখিটে মেজাজ ও প্রতিকূল আচরণ। ফলে শিক্ষার্থীর শেখার ইচ্ছা ও পরীক্ষার ফল— দুটির ওপরই অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

‘কমিউনিকেশন এডুকেশন জার্নালে’ গবেষণার এই ফল প্রকাশিত হয়। প্রায় পাঁচশ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে এক দলের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ক্লাস লেকচারে অংশগ্রহণ করানো হয়। অন্যদের এমন কিছু ক্লাসে হাজির করানো হয়, যেখানে শিক্ষকের কাছ থেকে খিটখিটে মেজাজ, ভর্ৎসনা, পক্ষপাতিত্ব সমালোচনামূলক আচরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। এরপর ক্লাসে পড়ানো লেকচারের ওপর শিক্ষার্থীদের বহুনির্বাচনী প্রশ্নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়। দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী খিটখিটে শিক্ষকের ক্লাস করে এসেছে, তারা অন্যদের তুলনায় গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ নম্বর কম পেয়েছে। এছাড়া তাদের মধ্যে শেখার আগ্রহ দেখা গেছে অনেক কম। শুধু তা-ই নয়, খিটখিটে শিক্ষকের কাছ থেকে পরবর্তী সময়ে শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে ব্যাপক অনীহা লক্ষ করা গেছে।

শিক্ষকের খিটখিটে মেজাজ যে পুরো শিক্ষাদানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, সেটি সহজেই অনুমেয়। আমরা এবং আমাদের আগে যারা পড়াশোনা করেছেন, তাদের অনেককেই এ ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তখনকার দিনে শিক্ষকদের আধুনিক কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। তবে তারা ছিলেন নীতিতে অটল, কাজে ডেটিকেটেড, অর্থের প্রতি তাদের তেমন কোনো মোহ ছিল না। শিক্ষার্থীদের তারা স্নেহও করতেন, আদরও করতেন আবার শাসনও করতেন। তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ মনে করতেন, শিক্ষার্থীরা তাদের যতটা ভয় করবে তারা ততটাই সফল শিক্ষক। এ যুগে এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। এ যুগে শিক্ষকদের ডেডিকেশন কমে গেছে, অর্থের চাহিদা বেড়েছে তবে তারা আধুনিক যোগাযোগের সুবাদে বিশ্বের বহু দেশের শিক্ষা ও শিক্ষক সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শুরু হয়েছে অনেক প্রশিক্ষণ। তারপরেও আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষাদানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত। প্রতিটি পর্যায়ের শিক্ষাদান হতে হবে আনন্দদায়ক। উচ্চশিক্ষায় আনন্দদানের সঙ্গে থাকবে চ্যালেঞ্জিং সিচুয়েশন, মুখস্থ বা অন্যের অন্ধ অনুকরণ নয়। নয়তো বড়ভাইদের নোট দেখে পরীক্ষার খাতায় তুলে দেওয়ার বিষয়টি। এখানে থাকবে নিজে বা গ্রুপে সমস্যা সমাধান করার মধ্যে আনন্দ।

শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে একজন সাইকোলজিস্টের মতো। বহু বছর শিক্ষকতা করার পর বিষয়টি বুঝেছি। আসলেই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু বিষয় পড়ানো নয়, কারণ বিষয়ই জীবনের সবকিছু নয়। জীবনের বিষয়গুলো সার্বিকভাবে দেখতে হয়। জীবন হচ্ছে শিক্ষাগ্রহণ, শিক্ষাদান, সামাজিকতা, আনুষ্ঠানিকতা, উপার্জনক্ষমতা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি বহু কিছুর সমন্বয়। এর প্রতিটি বিষয় যদিও শ্রেণিকক্ষে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শেখানো সম্ভব নয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলো সযত্নে তাদের শেখাতে হবে। যে শিক্ষক এগুলো পারেন, তিনিই প্রকৃত শিক্ষক। সেই শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা বহুদিন, এমনকি জীবনব্যাপী মনে রাখে। এ ধরনের উদাহরণ আমরা চারদিকে তাকালেই দেখতে পাই।  

একজন শিক্ষকও একজন মানুষ। তবে তিনি একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। কারণ তিনি তার লোভ, লালসা, হিংসা, দ্বেষ, ক্রোধ, রাগ নিয়ন্ত্রণে রেখে যখন যেভাবে প্রয়োজন, তখন ঠিক সেভাবেই পরিমিত ব্যবহার করেন। তার এ ধরনের কোনো আবেগই ঋণাত্মকভাবে শিক্ষার্থীদের জীবন প্রভাবিত করবে না। তিনি জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের সামনে একজন মডেল। তার সবকিছু শিক্ষার্থীরা অনুকরণ, অনুসরণ করবে। শিক্ষক নিজেই যদি বদমেজাজি ও খিটখিটে মেজাজের হন, তাহলে তার কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?

লেখক : প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি