• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১২ মহররম ১৪৪০
BK

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সুুুগন্ধি ধান চাষ

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সুুুগন্ধি ধান চাষ
সংগৃহীত ছবি

কৃষিবিদ মো. গোলাম মাওলা ও কৃষিবিদ এম আবদুল মোমিন

সুদীর্ঘ কাল থেকে গ্রাম বা শহরে ধনী কিংবা গরিব সবার ঘরোয়া কোনো উৎসবে, গায়ে হলুদ, বিয়ে, ঈদ, পূজায় অতিথি আপ্যায়নে সুগন্ধি চালের পোলাও, বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, জর্দা, পায়েশ, ফিন্নি, পিঠাপুলিসহ নানান মুখরোচক খাবার বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ। হাজার বছর ধরে কৃষকরা আমন মৌসুমে প্রচলিত জাত কাটারিভোগ, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, চিনি আতপ, বাদশাভোগ, খাসকানী, বেগুনবিচি, তুলসীমালাসহ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি ধান চাষ করে আসছে। প্রচলিত এসব জাত চাষাবাদে ফলন কম হওয়ায় অনেক কৃষক সুগন্ধি ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো, দেশি উন্নতমানের সুগন্ধি চাল সম্পর্কে ধারণা ও প্রচারের অভাবে দেশের নামিদামি হোটেল, রেস্তোরাঁয় আমাদের জনপ্রিয় সুগন্ধি চালের পরিবর্তে বিদেশি চাল ব্যবহার হচ্ছে। অথচ অধিক পরিমাণে সুগন্ধি ধান চাষাবাদে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি রফতানিরও সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে আমাদের সুগন্ধি চালের ব্যাপক চাহিদা।  সেই আলোকে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনায় আধুনিক উচ্চফলনশীল সুগন্ধি ধানের এলাকা ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট জেলাভিক্তিক চাষ হওয়া সুগন্ধি ধানের চাষাবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে কৃষক সমাবেশ, মাঠ দিবসের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে সুগন্ধি ধানচাষে আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি করা হবে। এভাবে বিদেশি সুগন্ধি জাতের চালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলামতিসহ দেশীয় সুগন্ধি চালের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর নতুন নতুন আকর্ষণীয় খাবারের প্রতি উৎসাহিত করতে পারলেই সুগন্ধি ধানের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে।

আশার খবর হচ্ছে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম ও দীর্ঘ গবেষণায় সুগন্ধি ধানের স্বাদ ও গন্ধ অক্ষুণ্ন রেখে বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ সুগন্ধি ধান উৎপাদনের উপযোগী। বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর, নওগাঁ ও রাজশাহী জেলায় সুগন্ধি ধান বেশি উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে স্থান করে নিয়েছে সুগন্ধির চালের খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ এমনকি পাঁচতারকা হোটেলে কোনো উৎসব কিংবা সেট মেন্যুতে। বেশকিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল ১৩৬টি দেশে রফতানি করছে। ক্রমেই সুগন্ধি ধানের উৎপাদন বাড়ছে, দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে রফতানির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে কৃষিবিদদের আশাবাদ।

আমরা জানি, ধান চাষের তিনটি মৌসুমের মধ্যে আমন ও বোরো মৌসুম সুগন্ধি সরু বা চিকন ধান চাষের উপযুক্ত মৌসুম। সুগন্ধি জাতের মধ্যে রয়েছে আমন মৌসুমে বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, বিনা ধান১৩। এ ছাড়া রয়েছে বিইউ সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১। বিইউ সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১ এর সুবিধা হচ্ছে আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেও চাষ করা যায়। ব্রি ধান৩৪ জাতের ধান চিনিগুঁড়া বা কালিজিরার মতোই অথচ ফলন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কৃষকরা এ ধানের আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন। তা ছাড়া আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় এই জাতটি আমনে বন্যাপ্রবণ এলাকায় নাবিতে রোপণ উপযোগী। ব্রি ধান৭০ ও ব্রি ধান৮০ আমন মৌসুমের উচ্চফলনশীল ধান এবং আলোক অসংবেদনশীল। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ টন, যা প্রচলিত জাত কাটারিভোগের চেয়ে দ্বিগুণ। ব্রি ধান৭০ ধানের চাল দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগের চেয়ে আরো বেশি লম্বা। আর ব্রি ধান৮০ থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় জেসমিন ধানের মতো, সুগন্ধিযুক্ত এবং খেতেও সুস্বাদু। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে সুগন্ধিযুক্ত আধুনিক জাত হচ্ছে ব্রি ধান৫০ যা বাংলামতি নামে পরিচিত। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ টন। বাংলামতি ধান বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন জাতের ধানের চেয়ে দাম অনেক বেশি হওয়ায় লাভ বেশি হয়। এ জাতের চালের মান, স্বাদ, গন্ধ, বাসমতি চালের মতোই।

আশা জাগাচ্ছে বাংলামতি

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উঁচু জমি এবং সেচ সুবিধা ভালো এমন জমির জন্য ব্রি ধান ৫০ অনুমোদন করেছে। এটি ২০০৮ সালে বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ব্রি ধান৫০ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের জনপ্রিয় নাম বাংলামতি। বাসমতি ধানের সমমানের বাংলামতি নতুন জাতের উচ্চ ফলনশীল সুগন্ধি ধান। এই সুগন্ধি ধান এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘সুপার ফাইন এরোমেটিক রাইস’ যার ফলন বেশি। সব ধরনের মাটিতেই সুগন্ধি ধানের চাষ করা যায়। তবে দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটি সুগন্ধি ধান চাষাবাদের জন্য বেশি উপযোগী। আশার খবর হলো, বিখ্যাত বাসমতি ধানের স্থান দখল করে নিতে যাচ্ছে এই বাংলামতি। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বাংলামতি ধান এখন সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে দেশের দক্ষিণের জেলা খুলনা-যশোর অঞ্চলে। এই ধানের চাষ দক্ষিণাঞ্চল থেকে ক্রমেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাসমতি চালের মতো বাংলাদেশের বাংলামতি চাল রফতানির ক্ষেত্রেও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। আমদানিকৃত বিদেশি বাসমতি চালের চেয়ে দাম অনেক কম, দেশি অন্যান্য সুগন্ধি জাতের ধানের চেয়ে ফলন বেশি হওয়ায় দিন দিন বিদেশ থেকে আমদানি করা বাসমতি চালের স্থান দখল করে নিচ্ছে বাংলামতি চাল। বাংলামতি ধানচাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন নে বাড়ছে।

লেখকদ্বয় : ফার্ম ব্রডকাস্টিং অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর