• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

জাটকা ও জেলেজীবনের অন্তর-কথা

জাটকা ও জেলেজীবনের অন্তর-কথা
সংগৃহীত ছবি

১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভারতীয় উপমহাদেশে ভূমি মালিকানার বিষয়টি আইনগত ভিত্তি লাভ করে। তবে এর আগেও স্থানীয় ও ব্যক্তিপর্যায়ে সমঝোতা এবং শক্তির ভিত্তিতে ভূ-সম্পত্তির সীমারেখা নির্ধারিত হতো। কিন্তু জলাভূমি ছিল সবার জন্য অবারিত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জলাভূমিগুলো জমিদারির আওতায় পড়লো বটে, কিন্তু ভূখণ্ডের মতো খাজনার কড়াকড়ি সেখানে প্রতিষ্ঠিত হলো না। তবে হাজার বছর ধরে চলে আসা জেলেদের সামাজিক সম্পত্তির ধারণা তখনও অটুট থাকলো। কিন্তু ১৯৫১ সালে পূর্ববাংলা সরকার প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে সব জমিদারি অধিগ্রহণ করে। তখন থেকে সরকার রাজস্ব বিভাগ ও কালেক্টরদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিল, হাওর, নদী বা মৎস্য ক্ষেত্রসমূহ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে ইজারা দিত। এর ফলে প্রথমবারের মতো জেলেরা তাদের সামগ্রিক সম্পত্তিতে অবাধ বিচরণের অধিকার হারায়। আবহমান কাল থেকে নিজের জীবন ও জীবিকার জন্য প্রকৃতি প্রদত্ত মাছ আহরণের যে ঐতিহ্য জেলেদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, এই আইনের মাধ্যমে সেটাও দারুণভাবে খর্ব হয়। সুতরাং জেলেদের শ্রমক্লিষ্ট উপার্জনে রাজস্ব বিভাগ নামে নতুন এক ভাগীদার যুক্ত হলো এবং এরই সঙ্গে ইজারাদার নামে নতুন এক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে এ দেশের জল ও জালের রাজ্যে।

এরই ধারাবাহিকতায় পাক-ভারত উপমহাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে এ দেশের জেলে সম্প্রদায়ের জীবনচাকা। আজ তাই বাংলাদেশের জেলে সম্প্রদায় ঐতিহ্যগতভাবেই দরিদ্র। অধিকাংশ জেলেই সহায় সম্বলহীন। এদের ৬০ ভাগের কোনো চাষযোগ্য জমি নেই, বাসস্থানের গড় আয়তন মাত্র ০.০৭ একর। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের বাসস্থানও নেই। ৬০ ভাগের বেশি লোক নিরক্ষর, তারা সম্পদহীন ও নিম্ন-আয়ের শ্রেণিভুক্ত। পূর্বপুরুষের অর্জিত পেশা বলেই বিকল্প কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করাও অধিকাংশের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজেই জীবিকা নির্বাহ তথা বেঁচে থাকার জন্য তারা ইলিশের জাটকা ও অন্যান্য মাছের পোনা ধরে থাকে।

জনপ্রিয়তার দিক থেকে বাংলাদেশের মিঠা ও লোনাপানির কোনো মাছই ফেলনা নয়। তবে এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ইলিশের নাম করতে হয়। এমনকি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গেও অতি প্রাচীনকাল থেকেই ইলিশ মাছ সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। সম্প্রতি বাংলাদেশের গৌরব সুন্দরবন, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, পাটশিল্প ও জামদানির মতো ইলিশ এখন কেবল বাংলাদেশের। সেই স্বত্ব অর্জন করেছি আমরা পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতরের কাছ থেকে। জামদানির পর বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পেল রুপালি ইলিশ। আমাদের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশ পরিগণিত হয়ে থাকে। এই জিআই স্বত্ব সেই অবস্থানকে জোরালো করলো। বাংলার প্রাচীন সাহিত্য ও লোকজ সংস্কৃতিতে ইলিশ মাছের স্বাদ, খাওয়ার পদ্ধতি এবং সংরক্ষণের বিষয়ে নিদর্শন রয়েছে। এদেশের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির সঙ্গে ইলিশের সম্পৃক্ততা যুগ যুগ ধরে। বাংলাদেশের ১০০টি নদীতে এই মাছ পাওয়া যায়। তার মধ্যে মেঘনা নদীর ঢালচর, মনপুরা, মৌলভীরচর ও কালিচর দ্বীপ সংলগ্ন এলাকার মোট ৫১৯ কিলোমিটারব্যাপী নদীতে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যায়। আমাদের জাতীয় সম্পদ ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বেশ কয়েক বছর ধরে জাটকা নিধন বন্ধে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সরকার ইলিশের চারটি অভয়াশ্রম এলাকা ঘোষণা করে, যেমন— চাঁদপুর জেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার, ভোলা জেলার চর ইলিশা থেকে চর পিয়াল, ভোলা জেলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চর রুস্তম এবং পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার সমগ্র আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত। এ জন্য প্রতি বছর সরকার নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে। তার মধ্যে অভয়াশ্রম এলাকার একমাত্র আন্ধারমানিক নদীতে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এবং বাকি তিনটি অভয়াশ্রম এলাকায় মার্চ-এপ্রিল এই দুই মাস মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

কিন্তু দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত এদেশের জেলেরা যে ইলিশের জাটকা ধরে থাকে, তাকে ইলিশ মাছের নতুন প্রজন্মের প্রবেশন স্তর হিশেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। ৯ ইঞ্চি পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের ইলিশকে ‘জাটকা’ নামে অভিহিত করা হয়। সুতরাং বলা যায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলিশের নাম জাটকা। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী-ইলিশ পদ্মা, মেঘনাসহ বড় বড় নদীর উজানে গিয়ে স্রোত-প্রবাহে ডিম ছাড়ে। ছয় থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যে এরা জাটকায় পরিণত হয়। ইলিশ সারা বছর ডিম পাড়লেও সবচেয়ে কম পাড়ে ফেব্রুয়ারি-মার্চে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। কিন্তু এই অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ইলিশের বৃদ্ধির সময়। সুতরাং প্রাকৃতিকভাবে নদীতে ইলিশ হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি জাটকা আহরণের কারণে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ইলিশ মাছের সহনশীল উৎপাদন ও ইলিশের পরিবেশ সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সব থেকে নিগৃহীত ও অসহায়-বঞ্চিত জেলেরা জীবনযাপনের এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা স্বীকার করেছেন, এর ফলে প্রতিবছরই স্বল্প পরিসরে হলেও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা ছাড়া জেলেদের সঙ্গে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষও মনে করে, একদিনেই সব জেলেকে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের আওতায় আনা সম্ভব নয়, তবে সরকারের আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, সরকার ঘোষিত ইলিশপ্রধান মোট ২০ জেলার অধিকাংশ জেলেই সরকারের জাটকা রক্ষা কর্মসূচির আওতায় গৃহীত কার্যক্রমের ফলে মানবেতর জীবনযাপন করে থাকে। দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ জেলেই দিনমজুরি করেন, অনেকেই বেকার হয়ে পড়েন এবং এই জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ সংসার চালাতে গিয়ে মহাজনী ঋণের অক্টোপাসে জড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। ফলে এদের সামাজিক অবস্থান ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে দুর্বল অর্থনীতির অতলে। জেলে সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বিচার-বিশ্লেষণে জেলে সম্প্রদায়ের ব্যবহারিক জীবনের মৌল অংশগুলো যেন বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে আমাদের জাতীয় সম্পদ ইলিশ শুধু যে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে তা-ই নয়, বরং বাঙালির রসনা বিলাসেও সংযোজন করেছে অভিনব মাত্রা, দিয়েছে নতুন স্বাদ। তেমনি ভাঁটি বাংলার জনজীবনের সঙ্গে ‘নদী ও জেলে’ মিশে আছে রূপ-ঐতিহ্যের অংশীদার হয়ে। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ত্রিশের দশকে বাংলার জেলেজীবনের যে ছবি এঁকেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে, ঠিক তার চার দশক পরে যখন সমাজ থেকে কলোনি যুগ অন্তর্হিত এবং বিপরীতে পুঁজিবাদ ও ধনতন্ত্রের নব্য বিকাশ চারদিকে, সেই তখন সত্তরের দশকে পশ্চিম বাংলায় সমরেশ বসু তাঁর ‘গঙ্গা’ উপন্যাসে উন্মোচন করলেন আরেক জেলেজীবনের অন্তর-কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে, দুই দশকে লিখিত দুই প্রজন্মের কথাশিল্পীর রচনাতেই শত বছর ধরে চলে আসা জেলেজীবনের শোষণ-বঞ্চনার একই হাহাকার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে দেখি। প্রাকৃতিক, অপ্রাকৃতিক নানা বিরূপতা আর বাধা ঠেলে জেলেসম্প্রদায় তাদের শ্লথ জীবনচাকা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আজ অবধি। আর এ কারণেই আমাদের জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি এ দেশের ভূমিহীন হতদরিদ্র জেলেদেরও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছুকাল ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। যার দরুন বর্তমানে আমাদের জাতীয় সম্পদ ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিসহ জেলেরাও আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন।

সরকারের এই উদ্যোগের ফলে বিগত কয়েক বছর ধরেই ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের মৎস্যসম্পদের মোট ১০ শতাংশ এবং জিডিপির ১ শতাংশ ইলিশ থেকে আসে। এখন জিআই স্বত্ব অর্জনের ফলে ইলিশ রফতানিতে আমরা বেশি দাম পাব বলে মনে করছি, যা আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাকাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর এ জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলিশ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং মেঘনা ও দৌলতদিয়া ঘাটকে ইলিশ প্রসেসিং জোন হিসেবে ঘোষণা করে ইলিশের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও এর রফতানিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ইলিশ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে জেলেদের সম্পৃক্ত করে এ-সংক্রান্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা আবশ্যিক বলে মনে করছি। উপরন্তু আমাদের মৎস্যসম্পদের বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষতিকর জাল হিসেবে চিহ্নিত কারেন্ট জাল, বিন্দি জাল, মশারি জাল প্রভৃতির উৎপাদন, মজুত ও বিক্রি বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এখন এই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে আমাদের মৎস্যসম্পদ ও জেলেসম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা প্রয়োজন।

লেখক : কবি, সাংবাদিক