• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

উচ্চতা কমবেশি হওয়ার কারণ ও চিকিৎসা

উচ্চতা কমবেশি হওয়ার কারণ ও চিকিৎসা
ছবি : ইন্টারনেট

Untitled

অধ্যাপক ডা. এম এ জলিল আনসারী

কোনো শিশু বড় হয়ে কতটা লম্বা হবে, তা জন্মের পরপরই সঠিকভাবে বলা না গেলেও মা-বাবার উচ্চতা মেপে চিকিৎসকরা একটা আন্দাজ করতে পারেন। কোনো অসুখ না থাকলে ষোলো সতেরো বছর পর্যন্ত মানুষ লম্বা হয়ে থাকে। এরপর পঁচিশ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২/১ সেন্টিমিটার উচ্চতা বাড়তে পারে, এরপর আর নয়। মেয়েদের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ছেলেদের চেয়ে এক বছর আগেই শেষ হয় বলে তাদের গড় উচ্চতা পুরুষের চেয়ে কিছুটা কম। সাবালক হওয়ার পর ছেলে অথবা মেয়ে কারো লম্বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। কোনো শিশু জন্মের সময় ২০ ইঞ্চি লম্বা হলে প্রাপ্ত বয়সে যদি ৬ ফুট (৭২ ইঞ্চি) উচ্চতা হতে হয়, তাহলে তাকে ১৪ বছরে আরো ৫০ ইঞ্চি লম্বা হতে হবে। গড়ে প্রতিবছর ৪ ইঞ্চি করে। বাস্তবে সবসময় একই হারে উচ্চতা বৃদ্ধি পায় না। জন্মের পরপর কয়েক বছর ও সাবালক হওয়ার প্রক্রিয়া চলাকালীন দ্রুত উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। অভিজ্ঞ মা-বাবারা অনেকেই তা জানেন। প্রাপ্ত বয়সে অনেক কম এবং অনেক বেশি উচ্চতা নিয়ে অনেকেরই সমস্যা হয়। চিকিৎসকের দৃষ্টিতে উচ্চতা কমবেশি হওয়ার কারণে কারো  শারীরিক সমস্যা বা মৃত্যুঝুঁকির সম্ভাবনা বাড়ার উল্লেখযোগ্য কারণ নয়।

উচ্চতা কমবেশি হওয়ার কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বংশগত। তবে অনেক রোগ, বিশেষ করে হরমোনজনিত রোগে কারো কারো উচ্চতা অস্বাভাবিক রকম কম বা বেশি হয়, যা রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে জানামতে সবচেয়ে খর্বাকৃতি মানুষের উচ্চতা মাত্র ২১ ইঞ্চি এবং সবচেয়ে লম্বা মানুষের ১০৭ ইঞ্চি- প্রায় পাঁচগুণ তফাৎ! আশ্চর্যজনক বটে। কেন এমন হয় তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

জানা গেছে, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে পিটুইটারি নামক হরমোন নিঃসরণকারী গ্রন্থি থেকে গ্রোথ হরমোন নামক একধরনের হরমোন তৈরি হয় আর দেহাভ্যন্তরে এই হরমোনের মাত্রা কমবেশি হওয়ার কারণেই কেউ অস্বাভাবিক রকম খাটো অথবা লম্বা হয়ে থাকে। এই হরমোন কমবেশি আছে কি-না এবং এর কারণ কী, তা চিকিৎসকরা নির্ণয় করতে পারেন এবং সাবালক হওয়ার আগেই তা জানা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব। গ্রোথ হরমোন ছাড়াও আরো কিছু কারণে শৈশব অবস্থায় কারো উচ্চতা বিঘ্নিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সুষম খাদ্যের অভাব, থাইরয়েড হরমোনের অভাব, কিডনির রোগ, ভিটামিন ডির অভাব, পরিপাকতন্ত্র ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি অসুখ ইত্যাদি। চিকিৎসকরা এসব নির্ণয় করে চিকিৎসা দিলে সাধারণত প্রাপ্তবয়সে স্বাভাবিক উচ্চতা লাভ করা যায়। তবে কম উচ্চতা নিয়ে কেউ ১৪-১৫ বছর পার হলে চিকিৎসা করেও উচ্চতা আর বাড়ানো সম্ভব হয় না।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকে যে রোগের জন্য কেউ অস্বাভাবিক খাটো বা লম্বা হয়ে থাকে, তার গুরুত্বই বেশি। সামাজিক ক্ষেত্রে অতি লম্বা বা অতি খাটো হওয়া নানা কারণে বিব্রতকর হওয়ায় উচ্চতার জন্য অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে দেখা যায়, দেহের উচ্চতা বাড়ার প্রধান অঙ্গ হাত-পায়ের লম্বা অস্থিসমূহের প্রান্তের কাছাকাছি অবস্থিত গ্রোথ প্লেট নামক অপেক্ষাকৃত নরম কার্টিলেজগঠিত অংশ থেকেই উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। অস্থির এই গ্রোথ প্লেট নামক অংশেই গ্রোথ হরমোনের ক্রিয়ায় অস্থি বৃদ্ধি পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে দেহের উচ্চতা বাড়তে থাকে। মস্তিষ্কে অবস্থিত ক্ষুদ্রাকার পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোন, যাকে গ্রোথ হরমোন বলা হয়, সেটাই মূলত আইজিএফ নামক অপর একটি হরমোনের মাধ্যমে উচ্চতা বৃদ্ধির কাজটি করে থাকে। উচ্চতা বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া ১৪-১৫ বছর বয়সে সাবালক হওয়ার পর আর থাকে না; কারণ তখন অস্থির গ্রোথ প্লেট অস্থির সঙ্গে মিলিয়ে যায়।

উচ্চতার সঙ্গে অন্যান্য হরমোনেরর যোগসূত্র থাকলেও গ্রোথ হরমোনের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। গ্রোথ হরমোন বাইরে থেকে ওষুধের আকারে প্রয়োগ করে উচ্চতা বৃদ্ধি করা যায় তবে এখানে শর্ত হলো, যত কম বয়সে প্রয়োগ করা যায় ততই ফল ভালো হয়ে থাকে। দশ বছরের পরে এর প্রয়োগে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এ ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে বেশি বয়সে অনেকেই লম্বা হওয়ার জন্য চিকিৎসা করাতে চান যা প্রায় অসম্ভব। বেশি বয়সে কেবল শল্যচিকিৎসার (সার্জারি) মাধ্যমেই কিছুটা লম্বা হওয়া সম্ভব।

কোনো শিশুর রক্তে গ্রোথ হরমোন কম থাকলে শিশুটি তার সমবয়সী স্বাভাবিক বাচ্চার তুলনায় অনেক কম উচ্চতাপ্রাপ্ত হয়। মা-বাবারা অনেক সময় তা খেয়াল করেন না বা বুঝতে দেরি করেন। শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক হচ্ছে কি-না, তা গুরুত্বসহকারে লক্ষ করা উচিত। অন্তত প্রতি তিন মাস পর শিশুর উচ্চতা মেপে লিখে রাখা প্রয়োজন। কোনো শিশু বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে শিশুর দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক কি-না, তা পরীক্ষা করে নিলে সবচেয়ে ভালো হয়। অতীতে গ্রোথ হরমোন ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা যেত না, এর দামও অনেক বেশি ছিল; তাই এর ব্যবহারও ছিল সীমিত।

আজকাল গ্রোথ হরমোন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি হয়, মানও ভালো এবং সব দেশেই পাওয়া যায় অথচ সচেতনতার অভাবে এর সুফল থেকে অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন বলে ধারণা করা যায়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এখনো এর দাম কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। তবে সঠিক সময়ে অর্থাৎ আগেভাগেই  বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা গেলে উচ্চতা নিয়ে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে এ ধরনের অনেক শিশুই পরিণত বয়সে এ সমস্যাকে এড়াতে পারেন। গ্রোথ হরমোন দিয়ে চিকিৎসায় আর্থিক ব্যয় বেশি হওয়া ছাড়াও কিছু শারীরিক সমস্যা কদাচিৎ লক্ষ করা যায়। তাই চিকিৎসাকালীন কোনো হরমোন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকা বাঞ্ছনীয়।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিভাগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ