• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৭ সফর ১৪৩৯
BK

বন্যার শঙ্কায় সতর্ক বাংলাদেশ

বন্যার শঙ্কায় সতর্ক বাংলাদেশ
সংগৃহীত ছবি

উজানে ৫০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে ব্রহ্মপুত্র নদের পানির উচ্চতা। চীনের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই নদ নিম্নাঞ্চলের অববাহিকায় অকাল বন্যার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে ভারতের অরুণাচল ও আসাম রাজ্যের বেশ কিছু এলাকা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের তরফ থেকে সতর্ক করা হয়েছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, উজানের এ পানিতে দেশে বন্যার ঝুঁকি নেই। তবে এই পানির সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় ভারী বর্ষণ হলে সে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে না। সে জন্য সতর্কও রয়েছে বাংলাদেশ।

হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের কাছের জিমা ইয়ংজং হিমবাহ থেকে সৃষ্ট এই নদের বেশিরভাগই চীনের মধ্যে। ইয়ারলুং সাংপো নামে দেশটির তিব্বত এলাকার প্রায় ১৬২৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে অরুণাচল হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে নদটি। ভারতে ব্রহ্মপুত্র নামে ৯১৮ কিলোমিটার যাত্রা শেষে এর পানি বাংলাদেশে আরো ৩৬৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যমুনা-পদ্মা-মেঘনা হয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে।

ভারত ও চীনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, চীনের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ‘ভয়ঙ্কর’ রূপ ধারণ করেছে ব্রহ্মপুত্র। চীন ও ভারত মনে করছে, নদটির বিপুল পরিমাণ পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ নেই। বন্যার আশঙ্কায় চীন ইতোমধ্যে জাংমু ড্যাম থেকে পানি ছাড়তে শুরু করেছে। এ জন্য প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে দিল্লিকে সতর্ক করে চিঠিও দিয়েছে বেইজিং। তাতে জানানো হয়েছে, গত বুধবার ভোররাতে জাংমু ড্যাম থেকে ৯০২০ কিউসেক (প্রতি সেকেন্ডে প্রবাহিত পানির পরিমাণ) পানি ছেড়েছে। তার ফলে প্লাবিত হয়েছে অরুণাচল ও আসামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা।

গত সপ্তাহে নদটির ভারত অংশে অস্বাভাবিক ঢেউ দেখা দেওয়ায় সতর্কতা জারি করা হয়। বুধবার সেখানে অস্বাভাবিক ঢেউয়ের কবলে পড়ে নৌডুবিতে প্রাণ হারায় অন্তত ২০ জন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অরুণাচল ও আসামবাসীকে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকতে বললেও উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আর গত বুধবার বাংলাদেশকে পাঠানো এক চিঠিতে ভারত জানিয়েছে, চীনে টানা বর্ষণের কারণে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদটির চীন অংশে পানির উচ্চতা ৫০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। এ কারণে জাংমু ড্যাম থেকে পানি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে চীন। সে বিষয়ে তারা ভারতকে সতর্ক করেছে। চীনের সেই সতর্কতা অনুসরণ করেই ভারতের কেন্দ্র্রীয় সরকার অরুণাচল ও আসামে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ভারত সরকার আশঙ্কা করছে, চীন যদি আরো পানি ছাড়ে তবে ব্রহ্মপুত্রের নিম্নাঞ্চল বন্যার কবলে পড়তে পারে। ভারতের ওই দুই রাজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশেও দেখা দিতে পারে অকাল বন্যা।

ভারতের দুই নদী গবেষক চিন্তন শেঠ ও অর্নিবাণ দত্ত রায়ের করা এক গবেষণা বলছে, গত কয়েক কয়েক বছরে তিব্বত এলাকায় ভূমিকম্পে ভূমিধসে ইয়ারলুং সাংপোতে সৃষ্ট কয়েকটি প্রাকৃতিক ড্যাম নদটিতে রেকর্ড পানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। নদটির কোনো কোনো জায়গায় ৬ থেকে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে পানিপ্রবাহ। বাড়তি বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে প্রাকৃতিক ড্যামগুলো ধসে পড়লে নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরো বাড়বে।

তবে ভারতের অরুণাচল ও আসাম রাজ্যে বন্যা দেখা দিলেও আগামী এক সপ্তাহে বাংলাদেশে তার প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। অবশ্য ব্রহ্মপুত্রসহ বেশ কয়েকটি নদ-নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তারা। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি স্থিতিশীল ছিল। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় পানি বাড়তে পারে। অন্যদিকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও তা বিপদসীমার নিচেই রয়েছে। আর এই নদ-নদীর পানি বাড়ার প্রবণতা আরো ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে পাউবো। পাউবোর পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, মেঘনা অববাহিকার মনু, খোয়াই ও ডালাই নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অববাহিকার প্রধান প্রধান নদীর পানির উচ্চতা আগামী ২৪ ঘণ্টা স্থিতিশীল থাকতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পাউবোর ৯৪টি পর্যাবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৫২টির পানির উচ্চতা বেড়েছে। অন্যদিকে ৫টির অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও কমেছে ৩৬টি স্টেশনের পানির উচ্চতা।

পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে অর্থাৎ চীন অংশের সাংপো নদে রেকর্ড পরিমাণ পানি বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অরুণাচল ও আসাম রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। ভারত এ বিষয়ে বাংলাদেশকেও একটি সতর্কীকরণ চিঠি দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির যে প্রবণতা রয়েছে, তাতে আগামী এক সপ্তাহেও বন্যার আশঙ্কা নেই। তারপরও আমরা সতর্ক রয়েছি।

ভারতের ওই চিঠির পর সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার এক চিঠিতে বলেছেন, ভারত জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের পানি ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এ কারণে নদের নিম্নাঞ্চলের অববাহিকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শেষ অবধি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। এ সম্পর্কে অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান খন্দকার বাংলাদেশের খবরকে বলেন, প্রধান প্রধান নদ-নদীর উজানে অর্থাৎ ভারতের অংশে অতিবৃষ্টির ফলে বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। এ সময় বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নিলেও আসামের ওপর বিরাজ করতে পারে। ফলে ওই অঞ্চলে বর্ষণের আশঙ্কা থাকবে।