• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

রঙিন পুঁতিতে স্বপ্ন বুনছেন সাথী

রঙিন পুঁতিতে স্বপ্ন বুনছেন সাথী
সংগৃহীত ছবি

হাবিবুর রহমান, মধুপুর

‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ জাতীয় কবির কবিতার মতো দেশের নারীরা আজ আর পিছিয়ে নেই। গ্রামের সাধারণ নারীরা পিছিয়ে থাকবে কেন? তারাও স্বামীর সংসারে গিয়ে কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। গ্রামের এই সাধারণ নারীরা আজকাল হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল পালনের পাশাপাশি ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে কাজ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার দড়িহাতীল (তালুকপাড়া) গ্রামের পল্লী চিকিৎসক মো. শফিকুল ইসলামের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম সাথী তারই উদাহরণ। ঘরে বসেই পুঁতির ব্যাগ তৈরি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। গ্রামের অন্য নারীদেরও এ কাজে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলছেন। সংসার পরিচালনা ও সন্তান পালনের পাশাপাশি রঙ-বেরঙের পুঁতি দিয়ে মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ,পার্টস (হাত ব্যাগ) ও ফুলদানি তৈরি করে বিক্রি করছেন। পুঁতির ব্যাগ তৈরি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাথী আজ অনেকটাই স্বাবলম্বী। তাকে আর স্বামীর কাছে সংসার খরচের জন্য হাতপাততে  হয় না, উল্টো তিনি স্বামীকেই অনেক সময় সহযোগিতা করতে পারেন।

মধুপুর থানা মোড় থেকে চাপড়ি রোডের তালুকপাড়া নামক পাকা রাস্তার পশ্চিম পাশে গোয়ালাবাড়িতে ‘সাথীর পুঁতির ব্যাগ তৈরির সেন্টার’ চোখে পড়বে। এখানেই সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চলে পুঁতির ব্যাগের কাজ ও প্রশিক্ষণ। সুমাইয়া ইসলাম সাথীকে ঘিরে আঁখি খাতুন, আমিনা খাতুন, রাহিমা বেগম, নার্গিস আক্তার, হাজেরা বেগম, লিজা খাতুন, তানিয়া আক্তার, নূরজাহান বেগমসহ ১০-১৫ নারী কাজ করছেন। সাথী তাদের হাতে-কলমে দেখিয়ে দিচ্ছেন আর বাকিরা সে অনুযায়ী পুঁতি গাঁথছেন। তারা বেশিরভাগ ভ্যানিটি ব্যাগ ও পার্টস তৈরির কাজ শিখছেন। কেউ পুঁতি গাঁথছেন, কেউ পাতলা কাপড় লাগাচ্ছেন আবার কেউ ব্যাগের মধ্যে জিপার লাগাচ্ছেন।

কথা হয় উদ্যোক্তা সুমাইয়া ইসলাম সাথীর সঙ্গে। সাথী জানান, ৫-৬ বছর আগে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে পুঁতির ব্যাগ তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই ঘরে বসে কাজ শুরু করেন। এ কাজে আস্তে আস্তে সফলতাও আসতে থাকে। সাথীর এ কাজে সার্বিক সহযোগিতা করেন তার স্বামী মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ঘাটাইল ও মধুপুর থেকে ভ্যানিটি ব্যাগ এবং পার্টস তৈরির সরঞ্জাম পুঁতি, প্লাস্টিকের সুতা, পাতলা কাপড় ও জিপার কিনে এনে দেন। তৈরিকৃত ভ্যানিটি ব্যাগ ও পার্টস আশপাশের গ্রামের মেয়েরা কিনে নেয়। অবশিষ্ট ভ্যানিটি ব্যাগ ও পার্টস মধুপুরের বিভিন্ন কসমেটিক্সের দোকানে পাইকারি বিক্রি করেন। প্রতিটি ভ্যানিটি ব্যাগ ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা এবং প্রতিটি পার্টস ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। খরচ বাদে সাথীর মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সুমাইয়া ইসলাম সাথী জানান, পুঁতির ব্যাগের কাজ শিখলে একদিকে নিজের সংসারও চলে; অপরদিকে অবসর সময়টুকু কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয়ও করা সম্ভব। সাথীকে দেখে ওই গ্রামের অনেক মেয়ে আজ পুঁতির ব্যাগের কাজ শেখার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তারা অবসর সময়টুকু অবহেলায় না কাটিয়ে পুতির ব্যাগ তৈরির কাজে লাগাচ্ছেন।

প্রশিক্ষণার্থী আবিদা সুলতানা আঁখি  জানান, পুঁতির ভ্যানিটি ব্যাগ ও পার্টস তৈরির কাজ শিখলে আমরা নিজেদের ব্যবহারের জন্য নানা ডিজাইনের ব্যাগ নিজেরাই বানাতে পারব, যা বাজার থেকে অধিকমূল্যে কিনতে হতো। তা ছাড়া নিজে ব্যাগ তৈরি করতে পারি এটা আত্মীয়-স্বজন জানলে তারাও ব্যাগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করবেন।

সাথীর স্বামী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বাড়িতে থেকেও মেয়েরা অনেক কাজই করতে পারেন। কুটির শিল্পের কাজ কোনো অংশেই অসম্মানের নয়। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আমজাদ হোসেন সরকার জানান, ঘরে বসে না থেকে মেয়েদের সাথীর মতো ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে কাজ করা উচিত।

মধুপুর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মোসা. আমিনা আক্তার জানান, আজকের মেয়েরা বাবা বা স্বামীর সংসারের বোঝা নয়, তারা অনেকেই আত্ম-কর্মসংস্থানে নিজেদের নিয়োজিত করছেন। তিনি আরো জানান, সাথীর মতো আত্মনির্ভরশীল কাজ করলে সমাজ থেকে বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন অনেকটা কমে যাবে।