• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৬ সফর ১৪৩৯
BK

ওরা ১২ জন কোথায়?

ওরা ১২ জন কোথায়?
ছবি : বাংলাদেশের খবর

রাজধানীর মহাখালী, তেজকুনিপাড়া ও বিজি প্রেস এলাকা থেকে গত ৫ সেপ্টেম্বর পুলিশ পরিচয়ে ৩১ শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। এরপর অনেককে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলেও খোঁজ নেই ১২ শিক্ষার্থীর। নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, আটকদের আদালতে তোলার নিয়ম থাকলেও এখনো তা করা হয়নি। এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করে কিছু বলা হচ্ছে না।

সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে গতকাল রোববার দুপুরে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ১২ শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা। টাঙ্গাইলের করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজের নিখোঁজ ছাত্র সাইফুল্লাহ বিন মানসুরের বাবা মানসুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ৫ সেপ্টেম্বর ডিবি সদস্যরা ৩১ জনকে তুলে নিয়ে যায়। এক দিন পর (৬ সেপ্টেম্বর) ১২ জনকে আটকে রেখে বাকিদের মুচলেকা নিয়ে মিন্টো রোডের ডিবি অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওইদিন ডিবি কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা আমাদের জানান, ৭ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার ছাত্রদের আদালতে হাজির করা হবে। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তাদের আদালতে হাজির করা হয়নি।

মানসুর আরো বলেন, তার দুই সন্তান সাইফুল্লাহ ও সিফাতকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সাইফুল্লাহর সম্প্রতি একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি হয়েছে। ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নিতে সে ঢাকায় এসে ছোট ভাই সিফাতের মেসে ওঠে। ডিবির কাছ থেকে ফিরে আসার পর সিফাত বলেছে, ডিবি অফিসে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হচ্ছে। তাদের জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তারা নিরাপদ সড়ক ও কোটা আন্দোলনে জড়িত ছিল কি না।

তিনি আরো জানান, গত চার দিনে পুলিশ কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে আশ্বাস দিচ্ছেন আবার গ্রেফতারের কথা অস্বীকারও করছেন। অভিভাবকরা বলেন, আমরা সন্তানদের নিয়ে শঙ্কিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার দাবি করছি।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলামের বাবা মাহবুব আলম বলেন, গত বুধবার বিকালে তার ছেলের মেস থেকে একজন ফোন করে জানান, ভোরে ডিবি সদস্যরা মুজাহিদকে নিয়ে গেছে। এই খবরে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় এসে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে যান। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর আরো অভিভাবকদের সঙ্গে তাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়। পুলিশ তখন তাদের আশ্বস্ত করে যে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছাত্রদের ছেড়ে দেওয়া হবে। বিকাল নাগাদ দু-তিনজন করে বের হতে শুরু করলেও তার ছেলে আসেনি। পুলিশ তাকে আদালতে যোগাযোগ করতে বলে। তবে শনিবার পর্যন্ত আদালতে ছেলেকে পাঠানো হয়নি। মাহবুব আরো জানান, গতকাল (রোববার) মুজাহিদের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা ছিল।

সারাদিন ডিবির ফটকে অপেক্ষা করেও ছেলের কোনো খবর না পেয়ে আরেক অভিভাবক এনামুল হক তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করতে যান। থানা জিডি নেয়নি। এনামুল হকের ছেলে জহিরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন।

মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন এমন এক শিক্ষার্থীর স্বজন জানান, পুলিশ সন্দেহের বশে তার এক আত্মীয়কে আটকে রেখেছিল। আটকে রেখে কী জিজ্ঞাসা করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তুলে নিয়ে যাওয়ার সময়ই পুলিশ চড়-থাপ্পড় মারে। জানতে চায় তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক, সাথী না কর্মী। প্রশ্ন করা হয় তার বেশভূষা নিয়েও। কোটা সংস্কার আন্দোলন বা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সম্পৃক্ততা ছিল কি না- তাও জানতে চাওয়া হয়। খোঁজখবর শেষ হওয়ার পর তার আত্মীয়কে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুচলেকায় কী লেখা ছিল- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাকে কোনো কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। তবে যতদূর মনে পড়ে, সরকারবিরোধী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন এই সন্দেহ থেকে আটক করা হয়েছিল- এ ধরনের কিছু একটা লেখা ছিল।

‘নিখোঁজ’ ১২ শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়া হয় তেজকুনিপাড়ার ইউসুফ কুটির থেকে। ইউসুফ কুটিরের বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে অভিভাবকরা জানান, ঘটনার দিন ভোরে হাতকড়া পরা এক ব্যক্তিসহ ৮-১০ জন পুলিশ সদস্য কুটিরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যায়। পুলিশের কাছে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল না।

ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছয়জন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের। তারা হলেন ইফতেখার আলম (বাবা জয়নাল আবেদীন), জাহাঙ্গীর আলম (বাবা জালাল উদ্দিন), রায়হানুল আবেদিন ওরফে জুয়েল (বাবা রফিক উদ্দিন), তারেক আজিজ (বাবা খোরশেদ আলম), মাহফুজ আহমেদ (বাবা মুজিবুর রহমান) ও মেহেদী হাসান রাজিব (বাবা হযরত আলী)। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলাম (বাবা মাহবুবুর রহমান), টাঙ্গাইলের করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজের সাইফুল্লাহ বিন মানসুর (বাবা মানসুর রহমান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম ওরফে হাসিব (বাবা এনামুল হক), আল আমিন (বাবা মৃত মুজাহিদ শেখ), গাজী মো. বোরহানউদ্দীন (বাবা গাজী মো. আবদুল মোতালেব) ও তারেক আজিজ (বাবা আইয়ুব আলী) ডিবির হাতে আটক রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।