• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৬ সফর ১৪৩৯
BK

সমাজের মৌলিক রূপান্তর : প্রেক্ষিত নির্বাচন

সমাজের মৌলিক রূপান্তর : প্রেক্ষিত নির্বাচন
আর্ট : রাকিব

খুব ছোট্ট মেয়ে, এখন সে নবম শ্রেণিতে পড়ে। অনেক বই তার। অনেক শিক্ষকও আছেন। কৌতূহলের বশে মাঝে মাঝে পাঠ্যবইগুলো নেড়েচেড়ে দেখার সুযোগ ঘটে। বাংলা বই, সমাজ, বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি কত কী! তবে যেগুলো উল্লেখ করলাম, সবই প্রায় মৌলিক সাবজেক্ট। এর মধ্যে পাঠ্যসূচি দেখি, লেখক নির্বাচন দেখি, বিবরণগুলো পড়ি। খুব আশ্চর্য লাগে, টেক্সট বুক বোর্ডের কিছু কাজকর্ম (অবশ্যই কিছু ভালো তো আছেই)। অন্য সব ছেড়ে দিয়ে, বাংলা ভাষা বা বাংলায় সমাজ-বিজ্ঞান বা অন্য সব বিষয় পাঠদানের ক্ষেত্রে ছাত্র-শিক্ষকের (বা বই ও শিক্ষার্থীর) যে যোগাযোগের প্রক্রিয়া, কেমন তার ভাষা, পঠন ইত্যাদি দেখার চেষ্টা করি। যখন আমরা ক্লাসে পড়াই তখন ছাত্র কী চায়, কোনটা ছাত্র নিতে সক্ষম- সেই মাপে বক্তৃতা করি, পাঠ দিই বা ভাববার চেষ্টা করি। সেক্ষেত্রে নবম শ্রেণির বাংলা বই বা সমাজবিজ্ঞান পাঠদান কেমন হবে, কোন স্তরের বিষয় নির্ধারণ বা ভাষাযোগ হবে, তা নির্ণয় করা জরুরি। কিন্তু পাতা উল্টে আমি রীতিমতো হতাশ এবং শিক্ষিত-বিবেকবান যে কেউ হতাশ হবেন। এ হতাশার কারণ, বিষয় নির্বাচন ও ভাষা-ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। ফররুখ আহমদ পাঠ্য নেই, মহীউদ্দিন, মোহাম্মদ মামুন, আবুল ফজল, সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হাসান পাঠ্য নেই। সমাজ বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ের ভাষা-বাক্য বেশ দীর্ঘ ও আড়ষ্ট। পড়া যায় না, পড়ে বোঝাও কঠিন। ছোট্ট বাচ্চাদের বা মফস্বলের ছেলেমেয়েদের এসব বোঝা বেশ কঠিন বলে মনে হবে। এককথায়, পড়াশোনাটা আনন্দময় করার উপায় সেখানে নেই। ইতিহাসের বইয়ে ইতিহাসের পাঠ আনন্দময় নয়। ভাষা ও বাক্য নির্মাণে সহজবোধ্যতা নেই। এগুলো মনে হয় জাতীয় পর্যায়ে একটা বড় সমস্যা। কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম সামনের বছর প্রাথমিক স্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হবে কি হবে না, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ে টানাপড়েন চলছে। কারণ, কেউ মূল্যবান ‘খাসি’ বিক্রি করতে চায় না! এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়ে কী ছাড়বে আর কী দেবে তার লাভক্ষতির ঐকিক হিসাব কষছে। তারপর কী হয় না হয়— সে প্রশ্ন! মাঝখানে অভিভাবক-শিক্ষার্থীর যা হয় হোক। ভুক্তভোগীদের এসব সমস্যা কে আমলে নেবে? এগুলো একপ্রকার উদাহরণ! এ রকম অনেক জাতীয় সমস্যা আমাদের জীবনে টানতে হচ্ছে। যার খবর রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরাও রাখেন না বা জানেন না। অথচ, এটাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে পরিগণিত হওয়ার কথা। কারণ, জাতি গঠন বা মানব সম্পদ উন্নয়নের চেয়ে রাষ্ট্রের আর বড় কাজ কী হতে পারে! এখন যখন নির্বাচন তখন ভাবছি, সমাজের জন্য কল্যাণ কে করবে? কল্যাণমুখী সমাজের চিন্তা কোন্ রাজনীতিবিদ করে, কাকে দিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তন হবে, কে রাষ্ট্রকে শোষণ-নির্যাতনের বদলে সৃজনশীল করে দিতে পারবে কিংবা যিনিই আসুন, তিনি কেনই বা করবেন, আর করতে চাইলেই কী করতে পারবেন বা কীভাবে করা সম্ভব! নির্বাচন নিয়ে জোট-জট হচ্ছে; গণতন্ত্র রক্ষার কথা হচ্ছে, বড় বড় বুলির শেষ নেই, কোনো পক্ষই এতে পিছিয়ে নেই, কিন্তু দেশ-জাতির মৌলিক পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কে কী করবেন তা তো বলছেন না কেউই। গত দশ বছরে বিরোধীরা সরকারের ত্রুটির কী কোনো চার্ট করেছে? আবার সরকারও কী বিরোধীদের দুএকটা যৌক্তিক সমস্যার ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে তা আমলে নিয়েছে (যদিও বিরোধীরা সরকারের একটিও ভালো কিছু দেখেনি)! এসব গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ তো! এই নিয়ে সময় বুঝে সবাই কথা বলেন। এটা নিশ্চয়ই কোনো গণতন্ত্র নয়। উন্নয়নও নয়। ফলে আমাদের উন্নয়ন ও মৌলিক পরিবর্তন নির্বাসনে গেছে। এখন নির্বাচন, নিছকই আশা আর স্বপ্ন বুননের সময়। এসব দিবাস্বপ্ন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা না-থাকার মধ্যেই সবকিছু ঝুলে আছে যেন। ক্ষমতাই যেন সবকিছুর ক্যারিশমা। ফলে এর বিপরীতে মৌলিক পরিবর্তন, সত্যিকারের দেশ এগিয়ে নেওয়ার কথা কীভাবে বলা বা বাস্তবায়নযোগ্য করে তোলা যায়- সেটাই প্রশ্ন। জনগণ মূল চালিকাশক্তি, সবাই তা বলছে। বিশেষজ্ঞরাও আছেন, তারাও এর অংশীদার। কিন্তু সমস্যা হলো, পাওয়ারের কাছে, এখনকার প্রথম প্রজন্মের উঠতি মধ্যবিত্ত বাঙালি খুব সহজেই বিক্রি হয়ে যায়। চোখের মণি আলু-পটোলের মতো বিক্রি করে ফেলে। এটা এখনো পরিশুদ্ধ হয়নি। আমাদের সমাজস্তরে এটা খুব তীব্র এখন। বিক্রি হওয়া বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার সব— কে নয়! আর পাশাপাশি স্তাবকতা, তোষামোদির বাহাস করে চলছে। কে কত করতে পারবে। ফলে সমাজের স্তরের পরিবর্তন, মৌলিক চিন্তার ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণ, ছোট ছোট এসব সমস্যা কিন্তু বাস্তবায়ন করলে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী— এটা কেউ বুঝতে চায় না। এমনকি আমজনতার মধ্যেও এ বোধ এখনো পয়দা হয়নি। ফলে সমস্যাগুলোও তেমন সমস্যা হয়ে উঠছে না। বিপরীতে বরং সবার মধ্যে ইনডিভিজ্যুয়ালিটি বেড়েছে। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। ফলে সামষ্টিক পরিবর্তনটা নেই এখন, চোখেও পড়ে না তেমন। যেন একটা বখে যাওয়া সমাজ। যেভাবে এখানে বলা শুরু করেছি, একটি পাঠ্যপুস্তক জাতির জন্য, জাতির মেরুদণ্ড গঠনের জন্য কতটা জরুরি— তা কে না জানে! কিন্তু সে কাজটি অবহেলিত। এখানে কী পড়ানো হয়, কেন পড়ানো হয়, কীভাবে তা পরিবেশিত হচ্ছে, কোনটি তার ভাষা— এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা নেই, মাথাব্যথাও নেই। হ্যাঁ, উচ্চপর্যায়ে ওয়ার্কশপ হয়তো হয়, বিদেশ থেকে অভিজ্ঞতার নামে অনেক কিছু আনা হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় কী! এটা কোনো দায়বদ্ধতা নয়। দুর্নীতিও। ক্রাইম বটে। অথচ এ দিকে কারো নজর নেই।

যা হোক, দেশকে তো পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে আমরা কেউ নই। কিন্তু নিজেরটা আগে। এই নিজের, ব্যক্তিগত অনেক কিছু ঠিক রাখতে গিয়ে চলছে ক্ষমতার তোষামোদি আর ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের প্রবণতা। এখন এটাই মূল। আর সেটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠের সব কাজ সাজানো রয়েছে, সমাজের যে যার নিজের মতো করে তৈরি। এখন প্রশ্ন, সে প্রক্রিয়ারই একটি ফেজ বা অংশ কি এই নির্বাচন (শুধু এই নির্বাচন নয়, অতীতের বা ভবিষ্যতের যেকোনো নির্বাচন)! এই দিয়ে জনগণের কী হবে? এই রুটিন ওয়ার্ক তো চলছেই। তা কতকাল চলবে আর জনগণ কত দেখবে? যদি সমাজের পরিবর্তন না আসে, তবে রাজনীতি কোথায় যায়, জাতি-রাষ্ট্র কোথায় যায়! প্রশ্নগুলো অনেকের, তাই বুঝি বলেও না কেউ! কেন? সমাজের অনেক কথাই এখন মূল্যহীন। যতই ব্যক্তির প্রসার ঘটুক সামষ্টিক উন্নয়ন না করে কি সমাজকে নিরাপত্তা দেওয়া যাবে? আর সমাজের নিরাপত্তা না থাকলে ব্যক্তির উন্নতি, ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক, বিভিন্ন সমাজের চলকের সঙ্গে ব্যক্তির সংযুক্তি কোনোটাই কি ঘটবে? ঘটার কি কোনো পথ আছে?

অনেক দিন আগের কথা। তখন জিয়া সরকারের নির্বাচন হচ্ছিল। দেশটির এত কর্মব্যস্ততা তখন ছিল না। অনেক ফাঁকা প্রান্তর ছিল, মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা কম ছিল, যোগাযোগের মাধ্যম কিছু ছিল না। তখন ভোট হলে, কিছু না-বোঝা না-জানা বোকা মানুষ নির্ধারিত ব্যক্তির পেছনে পেছনে ঘুরত। নির্বাচনের আমেজ পড়ে যেত। রাস্তাঘাট তখন তেমন ছিল না। দুর্গম এলাকায় জনসংযোগ, খবরাখবর নেওয়া কঠিন ছিল। তখন জনসভা হলে, প্রাক্তন মন্ত্রীরা এলে প্রচুর লোকসমাগম হতো। মানুষের হুজুগ ছিল। খুব স্বল্পেও তারা তুষ্ট ছিল। ভোট নিয়ে যে ভাগ্যের উন্নয়ন হবে তা নয়, ততদূর চিন্তা করার শক্তিও ছিল না। কিন্তু মনে একপ্রকার পাগল সুখ ছিল। অশান্তি ছিল না। বিনাখরচে একটা কনস্টিটিউয়েন্সি ঘুরে বেড়াতেও মজা ছিল তাদের। দুবেলা খাবারও মিলত তাতে। কিন্তু এখন কী? আমার মনে হয় মানুষের তৎপরতা এখনো আছে, কিন্তু মৌলিক পরিবর্তনের জায়গাগুলো খুব একটা বদলায়নি। ব্যক্তি বদলেছে, সমষ্টি বদলায়নি। ব্যক্তি এসব নির্বাচন, পার্টি, নেতা, উন্নয়ন, কেন্দ্র থেকে আসা পুঁজি সব মিলে যে ভাগবাটোয়ারা তাতে ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা আছে। সমষ্টির কিছু নেই। আগেও ছিল না। আমাদের ছেলেমেয়ে মানুষ হওয়ার জন্য ভালো পাঠ্যপুস্তক পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, আমজনতার কোনো সরকারি মেডিকেলে চিকিৎসার নিরাপত্তা নেই, নদীভাঙা মানুষের স্থায়ী বসতি নেই, কৃষকের ফসলের দাম নেই, ভালো মানুষ হওয়ার জন্য স্কুল-কলেজে কালচারাল পরিবেশ নেই, জেলে-মুটে-মজুর ইচ্ছে করলেই ইলিশ বা রুই কিনতে পারে না, বড় বড় বিল বাঁওড়গুলোর পরিচর্যা বা জনউপকারের কর্মক্ষম করে তোলার সুযোগ নেই। এ রকম সামষ্টিক বা বৃহত্তর উন্নয়নের কিছু কোনো এমপি, জনপ্রতিনিধি বলে না। শুধু করপোরেট উন্নতি চোখে পড়ে। কীভাবে? শো রুম হয়েছে, বিউটি পার্লার হয়েছে, অনেক ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকান হয়েছে, মোটরসাইকেলের শোরুম আছে, আছে মোড়ে মোড়ে ঝলসিত লাইটপোস্ট। এই পরিবর্তনগুলো মৌলিক নয়, উপর-পাটাতনের। সেটা সর্ব শ্রেণিস্তরের মানুষের জন্য নয়। কিছু কিছু মানুষের। সুতরাং প্রান্তিক মানুষদের ভাগ্য যে রকম ছিল কার্যত একটা বৃহৎ অংশের মানুষের খুব বড় রকমে তা বদলেছে বলে মনে হয় না। বদলগুলো যা চোখে পড়ে, তা বদল নয়। অনেক মানুষ এখন পড়ালেখার জন্য উদ্যমী। ঠেলাগাড়িওয়ালার ছেলে সেও এমএ পাস করে স্বপ্ন দেখছে চাকরির। এটা কোন চাকরি, কীভাবে চাকরি হবে, কোন ধরনের লেখাপড়া তার আছে— সেসব আমাদের ঢের জানা (অনেকেই জানেন, অন্তত মাস্টারি পেশায় যারা আছেন)। আর ওর স্বপ্ন যে কত মরীচিকা সেটা কে না জানে! তাহলে এটা কী পরিবর্তন না বোঝা। এই ছেলেটি যে স্তরের তাতে তার আজকালকার কোনো রাজনৈতিক দলে জুড়ে গিয়ে গলাবাজি করে কিছু করতে পারবে, কিন্তু তা দিয়ে দেশ ও দশের কী হবে! এটা তো উন্নয়ন নয়। এভাবে অনেক বেকার এখন ‘শিক্ষিত’ নামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই নির্বাচনে তারা কাজ করবে। মোটরসাইকেল পাবে। হয়তো পরিবারও কিছু পাবে। কিন্তু নিট ফল কী? এটা কী প্রবৃদ্ধি? প্রশ্নগুলো সেকাল আর একালের নির্বাচনের মুখে এই চলতি সমাজকে ঘিরে। তবে বদল কি হয়েছে? মানুষ পোশাকে বদলেছে, মনুষ্যত্বে বদলায়নি। সংস্কৃতিতে বদলায়নি, সাংস্কৃতিক হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তবে সমাজের মৌলিক পরিবর্তন কোথায়, কাকে মৌলিকত্ব বলব? নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া হোমরাচোমরা ডুগডুগি বাজানো ব্যক্তিরা কী বলবেন? তাদের ওই একই কথা, নির্বাচনটা করে নিই আগে তো! তাহলে তো আগের মতোই সব স্থির— নাকি!

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়