• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৮ মহররম ১৪৪০
BK

বিসমিল্লায় গলদ কাম্য নয়

বিসমিল্লায় গলদ কাম্য নয়
প্রতীকী ছবি

কেউ কেউ বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন ভোটার নির্বাচনকালীন কয়েক দিনের বাদশা মাত্র। তার কাছে আছে অমূল্য এক ভোট। আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। এই ভোটের আরেক নাম ইচ্ছা বা পছন্দ, পিপলস উইল। কে বা কারা নেতৃত্ব দেবেন, সরকার চালাবেন, পার্লামেন্টে জনমতের প্রতিধ্বনি করবেন, তার নির্ণায়ক এই পিপলস উইল। একজন ভোটার কাকে পছন্দ করবেন, তা একান্তই তার নিজস্ব। কারো কিছু বলার নেই। এ জন্যে তার কোনো জবাবদিহিতাও নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এতটা সার্বভৌমত্বের অধিকারী আর কোনো পদাধিকারী নন, কোনো প্রতিষ্ঠানও নয়। প্রতিষ্ঠানটি সাংবিধানিক হলেও না। কেননা সর্বক্ষেত্রেই আছে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। সংবিধানই সেই ভারসাম্যের শৃঙ্খল বেঁধে দেয়। পক্ষান্তরে একজন ভোটার; গোপন ব্যালটে তার ইচ্ছার চিহ্ন এঁকে দেওয়ার সময় কারো পরোয়া করার দরকার হয় না। যতই বলা হোক না কেন, এই বাদশাহী একদিনের বা কিছু সময়ের জন্যে মাত্র, আদতে তা ব্যাপকার্থক। যারা শাসন করেন, বারণ করেন, আখেরে তাদের জনগণের কাছেই ফিরে আসতে হয়। এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের অন্তর্গত সৌন্দর্য।

কালে কালে এই সৌন্দর্যটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার গণতান্ত্রিক অনেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের গাছটিকে বনসাই করে টবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর ওপর তুঘলকি করছেন শক্তিমানরা। তাদেরই ইচ্ছার অধীন করে নেওয়া হয়েছে সাধারণের ইচ্ছাকে। আধুনিক ও আদর্শ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমঝদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও জনগণের ইচ্ছা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সোভিয়েত রাশিয়ার রেজিমেন্টেড সোসাইটিতে গণতন্ত্র থাকার কথা নয়, ছিল না। আর এখন, রেজিমেন্টেশন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার পর রাশিয়ায় কায়েম হয়েছে পুতিনতন্ত্রের গণতান্ত্রিক শাসন।

এদিকে উপমহাদেশের পাকিস্তানে গণতন্ত্রের বিকার ও বিকৃতি বিশ্বসমাজ দেখছেন দশকের পর দশক ধরে। প্রতিবেশী ভারতে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকলেও এই রাষ্ট্রব্যবস্থা তার সব বৈভব নিয়ে সেখানে বিকশিত হয়েছে কি-না, তা প্রশ্নাতীত নয়। সেখানেও এমনসব ঘটনা ঘটে, যা গণতান্ত্রিক সমাজে বিসদৃশ। তাহলেও অনস্বীকার্য যে, অজস্র আগাছার মধ্যেও গণতন্ত্রের গাছটি মাথা উঁচু করে সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অন্তত রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের জন্যে সেখানে ইলেকশনের এখনো কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ নির্বাচনে মানুষের ভোটের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা হরণ করে নেওয়ার কোনো কৌশল কেউ করেনি অথবা করতে পারেনি। কিন্তু এটাই যে গণতন্ত্রের শেষকথা নয়, তা কমবেশি সবাই জানেন। আসলে গণতন্ত্র চায় সর্বক্ষেত্রে জনগণের ইচ্ছার যথার্থ প্রতিফলন।

এই অবস্থাটিকে বাস্তব করে তোলার জন্যে প্রয়োজন অনেক উপাদানের অব্যাহত মিথষ্ক্রিয়া। সেই উপাদানগুলো কী কী, তার একটি দীর্ঘ তালিকা হতে পারে। কিন্তু পত্রিকার একটি ছোট কলাম সেই তালিকা দেওয়ার উপযুক্ত জায়গা নয়। তবু মোটাদাগে কয়েকটি উপাদানের কথা বলে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। সেগুলোর মধ্যে সবার আগে আসা উচিত সাধারণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি। দ্বিতীয়ত প্রয়োজন সুসংগঠিত একাধিক রাজনৈতিক দলের বিকাশ, যাতে মানুষ বহুমত ও পথ থেকে যাচাই-বাছাই করে নিতে পারেন। ভোটের বাজারে মনোপলি বা একচেটিয়া কারবারের কোনো সুযোগ যাতে সৃষ্টি না হয়, তার জন্যেও এটা দরকার। কোনো দল যদি অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে, তাহলে দেশে কায়েম হতে পারে ব্রুট মেজরিটির শাসন, যার পক্ষে ডিকটেটরিয়াল শাসনের নিকটবর্তী হয়ে যাওয়ার আশংকা প্রবল। ব্রুট মেজরিটির শাসন যে কতটা নিকৃষ্ট ও নির্দয় হতে পারে, গণতান্ত্রিক বিশ্ব-মানচিত্রে তার দৃষ্টান্ত মোটেও বিরল নয়। উপমহাদেশেও তার উদাহরণ রয়েছে। ষোলোআনা গণতন্ত্রের জন্যে আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো স্টেটক্রাফটের ভারসাম্য। রাষ্ট্রযন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ— নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে ভারসাম্য রক্ষাকারী আরেকটি স্তম্ভ হচ্ছে সংবাদপত্র, বৃহৎ পরিসরে গণমাধ্যম। কাজেই গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশের পথ হতে হবে অবশ্যই বন্ধনহীন।

পূর্ণশশী গণতন্ত্রের জন্যে এ সবই দরকার। দরকার আরো অনেক কিছু। কিন্তু সবার আগে চাই ভোটদানের স্বাধীনতা। একটি অবাধ সাধারণ নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের ওপেনার। একটি সরকারের মেয়াদ শেষে নতুন মেয়াদে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রথম পদক্ষেপ ত্রুটিপূর্ণ হলে যাত্রানাস্তির সমূহ আশংকা। বিসমিল্লায় যাতে গলদ না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? সরকারের নাকি বিচার বিভাগের? এ দায়িত্ব কি নিতে পারে কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা সব দল মিলে? নাকি এই গুরুদায়িত্ব পালন করবেন ভোটার নিজেই? এই কাজের দায় আসলে নির্বাচন কমিশন ছাড়া আর কারো নয়। স্বীকার্য, নির্বাচনী আইন ও নির্দেশনা মেনে সহযোগিতা করার দায়িত্ব কমবেশি সব পক্ষেরই রয়েছে। যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশের শাসনতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনকে অঢেল ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচন কমিশন আইনত সম্পূর্ণ স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। শাসনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ না করা পর্যন্ত কমিশনের স্বাধীনতা অবাধ এবং প্রশ্নাতীত।

বন্ধ্যা গণতন্ত্রের দেশগুলোতে এসব নেহাতই কেতাবি কথা। বইয়ে লেখা স্বাধীনতা আর তাকে কার্যে পরিণত করা— এই দুইয়ের ব্যবধান দুস্তর। অপরিণত গণতন্ত্রের দেশগুলো সাধারণত সেই লোকদেরই ডেকে এনে নির্বাচন কমিশনে বসানো হয়, যারা ক্ষমতাসীনদের চোখে গুডবয়। এই শ্রেণির মানুষের স্বাধীনতা চাই না, চাই ক্ষমতার আশীর্বাদ। বোধগম্য কারণেই এদের মেরুদণ্ড যারপরনাই নমনীয়। ফলে কেতাবের কথা কেতাবে আছে, তা নিয়ে মোটেও এরা ভাবিত নয়। অতঃপর যা ঘটার, তা-ই ঘটে যাচ্ছে বামন গণতন্ত্রের দেশগুলোতে। কিন্তু ভারতের টিএন সেশান নব্বই দশকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নিয়ে দেখিয়ে দিলেন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কাকে বলে! সেশান সিইসির দায়িত্ব লাভ করেন ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে। এই পদে ছিলেন তিনি ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তার এই পাঁচ বছরের মেয়াদকালে ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দুটি। একটি ১৯৯১ সালে, আরেকটি ১৯৯৬ সালে। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ভারত যে লোকসভাটি পেয়েছিল, দুই বছরের মধ্যে সেটির দম ফুরিয়ে যায়। ফলে ’৯১-এ নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস হারানো ক্ষমতা ফিরে পায়। প্রধানমন্ত্রী পদে বৃত হন পিভি নরসীমা রাও। ১৯৯৬ সালের একাদশ সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস ক্ষমতা হারালেও দেশে আবারো তৈরি হয় একটি অসংবদ্ধ পার্লামেন্ট। দুই বছরের বেশি ওই পার্লামেন্ট টিকতে পারেনি। আর এই দুই বছরের মধ্যে ভারতের জনগণ প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন তিনজন। সেই তিনের একজন অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রিত্ব করতে পেরেছিলেন মাত্র ষোলো দিন। অবশ্য ১৯৯৮ সালের ইলেকশনে বাজপেয়ীর নেতৃত্বে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে পেরেছিল। সে যা-ই হোক না কেন, টিএন সেশান নিজের মেয়াদকালে অনুষ্ঠিত দুটি সাধারণ নির্বাচনে ভোটার সাধারণের ইচ্ছা তদার্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি ভারতে প্রথম ভোটার আইডি কার্ড প্রবর্তন করেন। নির্বাচনী ব্যয়সীমা বেঁধে দেন, নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার এবং উপাসনালয়ে প্রচারণা নিষিদ্ধ করেন। টাকা দিয়ে ভোট কেনা, চালাকি, জালিয়াতি কঠোরহস্তে দমন করেন। নির্বাচনী আইন মেনে চলার প্রশ্নে মন্ত্রী মিনিস্টার কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি তিনি। সবধরনের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সংঘশক্তির যাবতীয় চাপ উপেক্ষা করে ভোটার নিজে বিচার-বিবেচনা করে তার পছন্দের প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোট দেবেন— এই বিষয়টি নিশ্চিত করাই ছিল সেশানের মিশন। এই মিশনে তিনি সফলও হয়েছেন। এ জন্যে তাকে লড়তে হয়েছে, বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়েছে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির বিপরীত স্রোতে। এই প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে সরকারের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে যেতেও তিনি পিছপা হননি। প্রধান নির্বাচন কমিশনের রাশ টেনে ধরার জন্যে সরকার হঠাৎ দুজন নতুন কমিশনার নিয়োগ দিলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, টিএন সেশান ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আবর্জনামুক্ত করেন। একটি পত্রিকায় তখন সম্পাদকীয় স্তম্ভে সেশানকে গড অফ ইন্ডিয়ান ডেমোক্র্যাসি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

টিএন সেশান ভারতের ভোট প্রক্রিয়ায় যে স্বচ্ছতা এনে দিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত আছে কি-না, সেটা সংশয়াতীত নয়। তা না হলেও তিনি দেখিয়ে দিতে পেরেছিলেন যে, নির্বাচন কমিশন চাইলে যাবতীয় প্রতিকূলতা অতিক্রম করে মানুষের ভোটের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়।

বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে নির্বাচন প্রশ্নে যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা নিরসন করতে ইলেকশন কমিশন চাইলে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকাই মুখ্য। নির্বাচনী আইন প্রয়োগে কমিশনের সামনে যদি কোনো বাধা থেকে থাকে, তাহলে সেটাও আলোয় আনতে হবে। প্রয়োজন হলে সেই জায়গাটায় আইনি সংস্কার করে নিতে হবে। জাতীয় নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ কখনোই আশা করা যায় না।

ফা ই জু স  সা লে হী ন

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিক

ংধষবযববহভধ—মসধরষ.পড়স