• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
জাতীয় ঐক্যে শনির দশা

জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগে শনির দশা কিছুতেই কাটছে না

সংরক্ষিত ছবি

রাজনীতি

জাতীয় ঐক্যে শনির দশা

নেতৃত্ব নিয়ে টানাপড়েন কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগে শনির দশা কিছুতেই কাটছে না। নানা পক্ষের প্রভাব বাড়ানোর লড়াই শুরু হয়েছে সেখানে। ঐক্যের ভিত গড়ে উঠতে না উঠতেই সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখাদেখি শুরু হয়েছে। কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে চাচ্ছেন, কেউ রাষ্ট্রপতি। আবার ক্ষমতার সময়সীমাও নির্ধারণও করা হচ্ছে। এমন হিসাব-নিকাশকে সামনে রেখে ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে শরিকরা।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, সীমা ছাড়িয়ে গেলে জাতীয় ঐক্য হবে না। তবে তার এই সতর্কবার্তার সমালোচনাও হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এমন বক্তব্য সরকারের সঙ্গে সখ্যেরই বহিঃপ্রকাশ। জোট শরিকদের সঙ্গে কথা বলে শোনা গেছে হতাশার সুর। একে তারা জাতীয় ঐক্যের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা হিসেবেই দেখছেন।

এ প্রসঙ্গে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, জাতীয় ঐক্য গড়তে হলে চাওয়া-পাওয়ার চিন্তা বাদ দিতে হবে। দেশ-জাতির স্বার্থ সমুন্নত রেখে ঐক্য গড়লে সেটা টেকসই হবে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং রাজপথে থাকা বিএনপিসহ তাদের মিত্রদের বাইরে রেখে তৃতীয় শক্তি নাম ধারণ করে গড়ে উঠছিল ড. কামালের জাতীয় ঐক্য। আস্থা-বিশ্বাসের ঘাটতি থাকায় এক ধরনের সমঝোতার মাধ্যমে তাতে যোগ দিয়েছে সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট। তাদের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগও তাতে শামিল হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে শর্ত সাপেক্ষে। আলোচনার ভিত্তিতে এই জোটের সঙ্গে চলার ইচ্ছা জানিয়েছে ২০-দলীয় জোটের প্রধান বিএনপি। স্বাধীনতাবিরোধীদের বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য আরো জোরালো করতে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে ১০ দফা, ৭ দফাসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনার পাণ্ডুলিপি নিয়ে। তবে কিছুই চূড়ান্ত হয়নি এখনো।

এরই মধ্যে গত ৫ সেপ্টেম্বর মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের ডাকা মঞ্চে উঠেছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রধান ড. কামাল হোসেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিকল্পধারার বি. চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির প্রধান আ স ম আবদুর রব, কল্যাণ পার্টির প্রধান মেজর জেনারেল ইব্রাহিমসহ ডজন খানেক মিত্র। বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল সব মহলে। এদিকে রাজনৈতিক এই জোট গঠনকে প্রথমে আওয়ামী লীগ এবং পরে বিএনপিও স্বাগত জানায়। গণমাধ্যমেও শিরোনাম হয় ড. কামাল-বি. চৌধুরীর জোট।

জোটের বয়স বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতৃত্বাধীন বড় দুই জোটের সঙ্গে দর কষাকষি। বিএনপিকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করলে অন্তত দুই বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করবে জোটটি। গতকাল এক সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জাতীয় ঐক্য গড়তে হলে সবাইকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে। তার এই বক্তব্যের আগেই সংবাদ সম্মেলন করে নিজ অবস্থান স্পষ্ট করেছে ২০-দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এলডিপি। ২০ দলের মধ্যে ৮ দল নিয়ে রয়েছে তার অঘোষিত উপ-জোট। ওইসব দলের ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। মিত্রদের নিয়ে তিনি দেয়াল তুলেছেন জাতীয় ঐক্যের মাঝখানে। জাতীয় ঐক্য গঠনের কারিগরদের উদ্দেশে তিনি কিছু সুপারিশ রেখেছেন আর বিএনপিকে করেছেন সতর্ক। গতকাল শনিবার এক সভায় তিনি বলেছেন, জনভিত্তিহীন-আসনবঞ্চিত নেতা, রাজনৈতিক দালাল ও বিতর্কিত সুশীলদের তৎপরতা বাড়ছে। বিএনপিকেও অধিকতর কৌশলী এবং বাস্তববাদী হতে হবে। জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে এসব করে কোনো সুফল আসবে না। এলডিপির যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেছেন, প্রায় ৬ বছর ধরে আমরা সব ধরনের লোভ লালসাকে উপেক্ষা করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলে আছি। কিন্তু এখানে দেখছি হঠাৎ করে কেউ নিজেকে প্রধানমন্ত্রী, কেউ রাষ্ট্রপতি দাবি করে বসে আছেন। এমন নাটক চললেও বিএনপির পক্ষ থেকে জোরালো কোনো বক্তব্য পাচ্ছি না।

এদিকে জাতীয় ঐক্যের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঐক্যের ডাক দিয়েছেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ড. কামাল হোসেন। রাজধানীর বেইলি রোডে তার বাসায় বৈঠক করেছেন সমমনারা। তবে ছিলেন না কাদের সিদ্দিকী।

গতকাল শনিবার কাদের সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় ঐক্য এখনো গঠন হয়নি। এ নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে। জাতীয় ঐক্যের স্তম্ভ কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ তৈরি করেছে। আমাদের বাদ দিয়ে ঐক্য হতে পারে না। একই ধরনের দাবি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও। দলটির সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে কোনো জাতীয় ঐক্য হতে পারে না। কিন্তু তাতে সায় দিচ্ছেন না ড. কামাল-বি. চৌধুরীসহ বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, দেশের মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলবে।

জাতীয় ঐক্যের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মিত্রদের মধ্যেও। ঐক্যের নেতারা যে ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন তাতে মিল আছে বিএনপির দাবি-দাওয়ার সঙ্গে। সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, প্রশাসনে রদবদল, খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ গুচ্ছ দাবি তুলেছে জাতীয় ঐক্যমঞ্চ।

ড. কামাল হোসেনসহ যুক্তফ্রন্টের নেতাদের বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে কাদের সিদ্দিকী বলেন, এটা তাদের নিজস্ব বক্তব্য। জাতীয় ঐক্যই হয়নি। ঐক্য গঠন হলে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। তবে সীমা ছাড়িয়ে গেলে জাতীয় ঐক্য হবে না। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সমদূরত্বে রেখে জাতীয় ঐক্য গঠন করা হোক। এখানে যদি বিএনপিকে টানা হয়, তাহলে আওয়ামী লীগও চলে আসতে পারে। এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যথার্থই বলেছেন (আওয়ামী লীগকে ছাড়া জাতীয় ঐক্য হবে না)।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads