• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
ads

রাজনীতি

আ.লীগের দিকে ঝুঁকছে ইসলামী দলগুলো

# লক্ষ্য এমপি হওয়া # জাতীয় পার্টির সঙ্গে সখ্য রাখছে অনেকেই

  • কামাল মোশারেফ
  • প্রকাশিত ১১ অক্টোবর ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক ইসলামী দলগুলো ক্ষমতায় ভাগ বসাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে এসব ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠন জোট ও ফ্রন্ট গঠন করতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে সখ্য গড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কয়েকটি ইসলামী দল ও সংগঠন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি জোট না করে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটের শরিক হয়েছে। কোনো কোনো দল ক্ষমতাসীন দলের মার্কায় নির্বাচনের পরিকল্পনা করেও এগোচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১২টি ইসলামী দল রয়েছে। এই দলগুলো হচ্ছে- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও জাকের পার্টি। এর বাইরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে এই দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটে রয়েছে ইসলামী দল বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি জোটে না থাকলেও বেশ কয়েকটি ইসলামী দল তাদের সঙ্গে জোটগত নির্বাচন করার আগ্রহ নিয়ে এগোচ্ছে। এমন দলের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মান্নান), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (বাহাদুর শাহ), বাংলাদেশ জমিয়াতুল উলামা (ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ) ও বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট (মিছবাহুর) ও খাদেমুল ইসলাম (মুফতি রুহুল আমিন)। এর বাইরে ২০১৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে আসা ইসলামী ঐক্যজোটের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক বেশ ভালো। সে সময় আলোচনা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই বিএনপি ত্যাগ করেছে দলটি। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে একটি চিঠি দেয় ইসলামী ঐক্যজোট। চিঠিতে তারা অন্তত ২০টি আসন দাবি করে। এই দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি জোটবদ্ধ কিংবা মিনার প্রতীকে নির্বাচন করতে চায়। খেলাফত আন্দোলনও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

কওমি মাদরাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের বড় একটি অংশের সরকারের প্রতি মৌন সমর্থন রয়েছে। ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমর্যাদা ঘোষণা করে সরকার। ওইদিন গণভবনে আলেমদের এক অনুষ্ঠানে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ) চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমদ শফীর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘোষণা দেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিল পাস হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান হেফাজতের আমির।

অন্যদিকে ২০-দলীয় জোটে ৪টি নিবন্ধিত ইসলামী দল রয়েছে। দলগুলো হলো- খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট (একাংশ) ও ইসলামিক পার্টি (একাংশ)।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে ঘিরে চুলচেরা হিসাবনিকাশ শুরু করেছে। কোন দলের সঙ্গে জোট করলে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পাওয়া যাবে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা কাদের বেশি সেই অঙ্ক কষছে ইসলামী দলগুলো। যদিও ভোটের ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর না হলেও ধর্মভিত্তিক ইসলামী দলগুলোর সমর্থন নির্বাচনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব দলের মাঠপর্যায়ে যে সমর্থন রয়েছে তা একজন প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখে। এ কারণে আওয়ামী লীগ-বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি এই দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ রাখছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ হচ্ছে বেশ কিছু ইসলামী দল ও সংগঠন। অনেকেই মনে করছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইসলামী দল ও সংগঠনগুলোর বিভিন্ন দাবিদাওয়া মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় পার্টি ইতোমধ্যে ইসলামী ঘরানার বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে নতুন জোটও গঠন করেছে।

সম্প্রতি ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (আইডিএ) নামে ১৫টি দলের একটি জোট আত্মপ্রকাশ করে। এ জোটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দলগুলো হলো- বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, গণতান্ত্রিক ইসলামিক মুভমেন্ট, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাপ ভাসানী গ্রুপ, বাংলাদেশ ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ জনসেবা আন্দোলন, ন্যাশনাল লেবার পার্টি। দলগুলোর কোনোটিরই নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নেই। এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী ও তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব লায়ন এম এ আউয়াল। তরিকত ফেডারেশন সরাসরি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক।

অন্যদিকে সরাসরি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করতে না পারায় অনেক ইসলামী দল ও সংগঠন জাতীয় পার্টির মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছে। জাতীয় পার্টি নেতৃত্বাধীন জোট ইউনাইটেড ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের (ইউএনএ) অন্যতম প্রধান শরিক দল ইসলামী ফ্রন্ট। এ ছাড়া ২৫টি অনিবন্ধিত ইসলামী দল ও সংগঠন নিয়ে গঠিত ইসলামী মহাজোট ইউএনএ জোটের অন্যতম শরিক। খেলাফত মজলিস সম্প্রতি এইচ এম এরশাদের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করেছে।

সম্প্রতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদও ‘সম্মিলিত ইসলামী মহাজোট’ নামে একটি ৩৪-দলীয় মোর্চার সঙ্গে জোট করেন। এই জোটের উল্লেখযোগ্য দল ও সংগঠন হচ্ছে- বাংলাদেশ ইসলামী জনকল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ ইউনাইটেড ইসলামী লীগ, গণ ইসলামিক জোট, বাংলাদেশ ইসলামিক লিবারেল পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, মুসলিম জনতা পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী পার্টি, খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তুল ওলামা পার্টি, জাতীয় ইসলামিক মুভমেন্ট। এরপর গত ১১ আগস্ট প্রয়াত শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা চুক্তি করেন এরশাদ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, আমরা জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করেছি। এর আগে খেলাফত মজলিস ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাঁচ দফা চুক্তি করেছিল। কিন্তু বিভিন্ন দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ তা পরবর্তী সময়ে প্রত্যাহার করে নেয়।

জামায়াতের পরই দেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অবস্থানে আছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন। এই দলটি এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। তারা কোনো নির্বাচনী জোটে যাবে না উল্লেখ করে দলটির মহাসচিব মাওলানা ইউনূছ আহমাদ বলেন, নির্বাচনের মৌসুম এলে ছোট দলগুলো দৌড়ঝাঁপ করে, ক্ষমতার অংশীদার হওয়া যায় কি না, চেষ্টা-তদবির করে। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এসব মতলবি জোট বেশি দিন টেকে না। তিনি আরো বলেন, ইসলামী আন্দোলন এ দেশের মানুষের শেষ সম্বল। এটা শেষ করতে চাই না। এজন্য কোনো দুর্নীতিবাজের সঙ্গে আমরা জোট করি না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads