• সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে  নির্বাচন চায় আ.লীগ

লোগো আ.লীগ

রাজনীতি

বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে  নির্বাচন চায় আ.লীগ

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ১৫ মার্চ ২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মতো দেশের সব স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজে নির্বাচন চায় আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নানা কারণে বন্ধ হয়ে আছে ছাত্র সংসদের এসব নির্বাচন। সব দলের ছাত্র সংগঠনের অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিতর্কমুক্ত রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দেখাতে চায় ক্ষমতাসীন দল। দেশের রাজনীতিতে শিক্ষিত নেতৃত্ব তুলে আনা ও শিক্ষার্থীদের মৌলবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া রোধ নিশ্চিত করতে ডাকসুর মতো অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিয়মমতো নির্বাচনের পক্ষে আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র বাংলাদেশের খবরকে এসব তথ্য জানায়।

দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্র মতে, প্রায় তিন দশক পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং প্রায় সব দলের ছাত্রসংগঠনের এতে অংশ নেওয়ার বিষয়গুলোকে আওয়ামী লীগ দল ও সরকারের জন্য ইতিবাচক মনে করছে। বিভিন্ন সরকারের আমলে বন্ধ থাকায় ডাকসুর সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচন আয়োজনের কৃতিত্ব এ সরকারের পক্ষে যাচ্ছে। দেশের ‘দ্বিতীয় সংসদ’ হিসেবে খ্যাত এ নির্বাচন গণতন্ত্রকে সুসংহত ও নেতৃত্ব তৈরির জন্য অপরিহার্য বিবেচনায় ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। রাষ্ট্রপতির আহ্বান, বিশেষজ্ঞদের দাবি, উচ্চ আদালতের নির্দেশ, সরকারের আন্তরিকতা ও ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাদের বিভিন্ন আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় ডাকসুর কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন।

সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ সচল থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখর ছিল। প্রায় প্রতিদিনই হল সংসদে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান থাকত। ছাত্র সংসদ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আগের মতো নেই। বেসরকারি কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি চর্চা থেকে একেবারেই দূরে সরে আছে। সুস্থ সাংস্কৃতিক আয়োজনের শূন্য জায়গা কোথাও কোথাও দখল করে নিচ্ছে ধর্মীয় মৌলবাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে উগ্র মৌলবাদে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কৃতি চর্চাকে নিয়মিত করতে ছাত্রলীগের প্রতি নির্দেশ আছে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে।

সূত্রমতে, দলের ওই নির্দেশের কথা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ঢাকার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে নির্দেশগুলো  জানানো হয়। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, দুই সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের সঙ্গে ওই দিন বৈঠক করেন ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক কয়েক শীর্ষ নেতা।

দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন। সেখানে আওয়ামী লীগের ও সরকারের হস্তক্ষেপ করার কিছু নেই। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে সেসব নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নানা দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিতে পারে। দলের দায়িত্বশীল নেতারা আলোচনা করে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করে প্রার্থী মনোনীত করতে পারেন। এর বাইরে দলের কারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।

সূত্র জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্রলীগ নেতাদের আবারো নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক আট শীর্ষ নেতা গত মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাদের এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত রাখতে চেয়েছে আওয়ামী লীগ। ছাত্রলীগকে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিতর্কে না জড়াতে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কড়া নির্দেশও দেওয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সহযোগী ছাত্রদলসহ সব দলের সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক আচরণ করতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তফসিল ঘোষণার আগেই বলা হয়। এর প্রতিফলনও দেখা গেছে নির্বাচনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগের আচরণ ও কর্মকাণ্ডে। ভোটের দিন ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে নির্বাচনে দায়িত্বশীল কয়েক শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে। ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়নি। ফল ঘোষণার পর সহসভাপতি (ভিপি) পদে পরাজিত ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন কোলাকুলি করেন একই পদে জয়ী নূরুল হক নূরের সঙ্গে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডাকসু নির্বাচনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের স্বায়ত্তশাসিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও। কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদের কোনো বিধানই এখন পর্যন্ত যোগ করা হয়নি। ডাকসুর আদলে গঠনতন্ত্র তৈরির চিন্তাভাবনা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকতা ও  কর্মচারীসহ সবার নির্বাচন হলেও ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অনেক বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে কোনো সংসদ ছিল না। নির্বাচনের প্রক্রিয়াও অনেক বিস্তৃত। ডাকসু নির্বাচনের আদলেই ছাত্র সংসদ নীতিমালা করব। একই আদলে গঠনতন্ত্র তৈরি করে একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে পাস করে তা অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে পাঠাব।’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচন বন্ধ থাকলেও এখন উপাচার্য বলছেন, ‘বাকসু নির্বাচনের বিষয়ে ভাবছেন তারা।’ বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মতে, বাকসু নির্বাচন এখন সময়ের দাবি। উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী আকবর জানান, ‘প্রশাসন কখনো বাকসু নির্বাচনের বিরোধী নয়। শিক্ষার্থীরা চাইলে অবশ্যই নির্বাচনের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাকসু নির্বাচন হলে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ইস্যু সহজেই সমাধান করা সম্ভব হবে।’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নিয়মিতই হতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। সবশেষ ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় বাকসু নির্বাচন। কিন্তু গত দুই দশকে নির্বাচন না হওয়ার পরও ছাত্র সংসদ খাত দেখিয়ে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন না হওয়ায় একদিকে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পথও নিশ্চিত হচ্ছে না। নির্বাচন বন্ধ থাকায় গণতন্ত্রের যে চর্চা হওয়া দরকার, সেটি হচ্ছে না। নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়ার নির্দিষ্ট সংগঠন বা প্ল্যাটফর্মও নেই।

ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠান রাজনৈতিক অঙ্গনের মতো নতুন প্রেরণা ও উদ্যমে আলোচনার উত্তাপ ছড়াচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। ডাকসুর আদলে ছাত্র সংসদের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা (ইউজিসি)। ডাকসুর আদলে ছাত্র সংসদ চালু করে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচন ও রাজনীতিতে দক্ষ নেতা সৃষ্টির বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও করছে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। দেশে এখন অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শতাধিক। সেসব প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নিষিদ্ধ ও ছাত্র সংসদ না থাকায় নানা সঙ্কট নিয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই, এমন অভিযোগ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকও করে থাকেন।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads