• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭
বিএনপিতে বিদ্রোহের শঙ্কা

ছবি : সংগৃহীত

রাজনীতি

বিএনপিতে বিদ্রোহের শঙ্কা

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ০৯ মে ২০১৯

শীর্ষনেতাদের ভুলের সাগরে ভাসছে বিএনপি। ভুল আছে কিন্তু সংশোধনের উদ্যোগ নেই দলটিতে। ফলে নানা ইস্যুতে বিশেষ করে শপথ ও খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে বিএনপির উচ্চপর্যায়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। তৈরি হয়েছে একাধিক গ্রুপ। দলের বিভক্তির ছাপ পড়েছে ২০ দলীয় জোট এবং জিয়া পরিবারেও।

নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি এখনো প্রকাশ্যে না এলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি না মিললে বিদ্রোহ প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে জোট ছেড়েছে এক শরিক। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সংক্ষুব্ধ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 

তবে দলে আসন্ন বিদ্রোহের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপিতে বিদ্রোহের বিষয়টি শুধুই গুঞ্জন। কোনো বিদ্রোহ নেই। দল ঐক্যবদ্ধ আছে এবং থাকবে। জোটে মান-অভিমান আছে, অচিরেই এর অবসান ঘটবে।

বিএনপি সূত্রমতে, শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্তের পরে বিএনপিতে যেমন বিভক্তি স্পষ্ট হয়েছে তেমনি জিয়া পরিবারের মধ্যেও বিভাজন দেখা দিয়েছে। দলের ও জিয়া পরিবারের অনৈক্যের কারণ হিসেবে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া দলের কেউই শপথের সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। অন্যদিকে চার নির্বাচিত এমপি শপথ নেওয়ার ব্যাপারে ছিলেন নাছোড়বান্দা। তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন জিয়া পরিবারের এক সদস্য। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ছিল যে এমপিরা মিলে বিএনপি ভেঙে ‘নতুন দল’ ঘোষণার দ্বারপ্রাপ্তে চলে গিয়েছিলেন। বিষয়টি জানতে পারেন তারেক রহমান। তাই দলের ভাঙন ঠেকাতে অনেকটা বাধ্য হয়েই এমপিদের শপথে রাজি হন তারেক রহমান।

অন্য একটি সূত্রমতে, দলের প্রধান খালেদা জিয়ার ‘জামিন’ বা ‘প্যারোলে’ মুক্তি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে একটি ‘অলিখিত সমঝোতা’ হয়েছে। বিএনপির এমপিরা শপথ নেওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। খুব শিগগিরই খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পেতে পারেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণের পর থেকে বিএনপিতে এখন কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। দু-একটি গ্রুপের নেতারা তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলের ওপর ক্ষুব্ধ। তারা নেতৃত্বে পরিবর্তনের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দলের একটি অংশ মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে নতুন নেতাকে মহাসচিব করার কথা ভাবছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহাসচিবের ওপর ক্ষোভও ঝাড়ছেন। মির্জা ফখরুলের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারলেও এসব নেতা তারেক রহমানের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারছেন না। কিন্তু তৎপরতা থামিয়ে রাখেননি। এছাড়া খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথিকে নিয়ে দলের ছোট একটি অংশ মাঠে নেমেছে। এ অংশটি তারেক রহমানকে মাইনাস করে সিঁথিকে নেতৃত্বে আনার ‘স্বপ্ন’ দেখছে। শীর্ষনেতা হিসেবে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকে সামনে আনার বিষয়টিও একটি অংশের চিন্তায় আছে। এসবের বাইরে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার স্বার্থে জিয়া পরিবারের বাইরের কাউকে দলের প্রধান করার কথাও ভাবছে দলের একটি প্রভাবশালী অংশ।

বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, নির্বাচিত এমপিদের শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে দলের স্থায়ী কমিটির নেতারা একমত ছিলেন। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এককভাবে শপথের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিএনপিতে ক্ষোভ দেখা দেয়। শুধু নীতিনির্ধারক ফোরামই নয়, তৃণমূলের পাশাপাশি শরিকরাও এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক কোনো ভূমিকা পালন করে কি না তা দেখতে নীতিনির্ধারক নেতাদের পাশাপাশি সর্বস্তরের নেতাকর্মী প্রকাশ্যে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাননি। তবে শপথের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যারা নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেছেন তাদের ঘরোয়া আলোচনায় হুমকি-হুশিয়ারি দেওয়া থেকে বিরত রাখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণও ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, শপথ নেওয়ার দলীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েকদিন পরে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য মহাসচিবের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তির দিনক্ষণ জানতে চান। এ ব্যাপারে সদুত্তর না পেয়ে স্থায়ী কমিটির ওই সদস্য মির্জা ফখরুলকে নাজেহাল করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি চিন্তা করে অনেক অন্যায় সিদ্ধান্ত সহ্য করে আসছেন। যদি দলীয় প্রধানকে মুক্ত করা না যায় তবে অন্যায় সিদ্ধান্তের কড়া জবাব দেবেন নেতাকর্মীরা।  সেজন্য প্রস্তুত থাকুন।

বিভিন্ন মহলে বিএনপির বিদ্রোহ নিয়ে আলোচনার বাস্তবতা প্রসঙ্গে স্থায়ী কমিটির এক নেতা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, অনেক নাটকীয় সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন দেখা গেলেও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। যদি মুক্তি না হয়, তবে কেন এই শপথ? এখন দল কী করবে? এমন নানা প্রশ্নে জর্জরিত বিএনপির অভ্যন্তরে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। দিনে দিনে এসব প্রশ্ন বাড়ছে। সঙ্গে দলের মধ্যে ক্ষোভ ও সমস্যা বাড়ছে। আর এ সমস্যা ও ক্ষোভ থেকে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম হতে পারে যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে শীর্ষনেত্রী মুক্ত না হন।

শপথের সঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তির সমঝোতার আলোচনা এবং দলের বিদ্রোহর গুঞ্জনের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিএনপি সমঝোতার রাজনীতি করে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বত্র সোচ্চার থাকে। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাইরের পাশাপাশি সংসদের ভেতরে কথা বলার জন্য শপথের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তবে একথা বলা যায়, সরকার অন্যায়ভাবে আর বেশি দিন খালেদা জিয়াকে আটকে রাখতে পারবে না। দ্রুত সময়ে আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন বলে আশা করেন বিএনপি মহাসচিব।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads