• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ চান এ কে খন্দকার

ছবি : সংগৃহীত

রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ চান এ কে খন্দকার

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ০২ জুন ২০১৯

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নিজের বইয়ে সংযোজিত বিতর্কিত ও অসত্য তথ্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বীর উত্তম। নানা বিতর্কের জন্ম দেওয়া ওই বইয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মনগড়া তথ্য প্রকাশের পর থেকে তিনি ‘মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ’ বলে তার পরিবারের দাবি। তিনি চরম আত্মপীড়নেও ভুগছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চাওয়ার আগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ ওঠায় নিজের বইয়ের সেই বিতর্কিত অংশটুকু প্রত্যাহার করার ঘোষণাও দেন তিনি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্রিদেশীয় সফর শেষে দেশে ফেরার পর তার সাক্ষাৎ চাইবেন এ কে খন্দকার। বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমা করে দিলে তিনি ‘আত্মপীড়ন ও অনুশোচনা’ থেকে মুক্তি পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার আগে তিনি গতকাল শনিবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে বিতর্কিত তথ্যের জন্য পুরো জাতির কাছে ক্ষমা চান। বইটির বিতর্কিত অংশের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার কাছেও ক্ষমা চান তিনি।

বিতর্কিত বই নিয়ে এতদিন পর মুখ খোলার পেছনে স্বার্থগত কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না-এ কে খন্দকারের, এমন প্রশ্নও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতার। তারা মনে করেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের টাকায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে তিনি এ বই লিখেছেন। বইটিকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। বইটিকে কেন্দ্র করেই বঙ্গবন্ধুর গড়া দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় এ কে খন্দকারের। তিনি এ দলের টিকিটেই ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে জয়ী হলে মন্ত্রিসভায়ও ঠাঁই পান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের প্রবীণ এক নেতা বাংলাদেশের খবরকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকে বেগবান করতে মুক্তিযুদ্ধের জীবিত সেক্টর কমান্ডারদের নিয়ে ২০০৭ সালে গঠিত হয় সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম। এ কে খন্দকার তখন থেকেই এর নেতৃত্বে ছিলেন। তার বইটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম থেকে তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। সেদিন তিনি সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম থেকে পদত্যাগ করেন। অথচ নিজের বইয়ের ভুল তথ্য নিয়েও চুপ থাকেন।’

এ কে খন্দকারের সহধর্মিণী ফরিদা খন্দকার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বইটি প্রকাশের আগে আমরা এর প্রুফ দেখিনি। ফলে এ ভুল তথ্য ছাপা হয়ে যায়। বইয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসত্য তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এ কে খন্দকার মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি কথা বলারও শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এখন কিছুটা সুস্থ হওয়ায় বিবেকের তাড়নায় তিনি এ ভুল তথ্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করেন।’

বইয়ে উল্লিখিত ভুল তথ্যটিকে সারা জীবনে করা ভুলের মধ্যে বড় ভুল উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে এ কে খন্দকার বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৯০ বছর। আমার সমগ্র জীবনে করা কোনো ভুলের মধ্যে এটিকেই আমি একটি বড় ভুল বলে মনে করি। গোধূলি বেলায় দাঁড়িয়ে পড়ন্ত সূর্যের মতো আমি আজ বিবেকের তাড়নায় দগ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মার কাছে এবং জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আশা করি, প্রথমা প্রকাশনী আমার বইয়ের ৩২ পৃষ্ঠার বিতর্কিত অংশটুকু বাদ দিয়ে পুনর্মুদ্রণ করবে।’

তিনি বলেন, ‘এ তথ্যটুকু যেভাবেই আমার বইতে আসুক না কেন, অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার। বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে কখনোই জয় পাকিস্তান শব্দটি বলেননি। তাই আমি আমার বইয়ের ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লিখিত বিশেষ অংশযুক্ত পুরো অনুচ্ছেদটুকু প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। একই সঙ্গে আমি জাতির কাছে ও বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চাইছি।’

তথ্যমতে, ২০১৪ সালে প্রকাশিত এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বইটির একটি অংশে তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তখনকার রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু নিজের ভাষণ শেষ করে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন। বইটি প্রকাশের পর ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লিখিত এ বিশেষ অংশ এবং বইয়ের আরো কিছু শব্দ ও বাক্যচয়ন নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সে সময় বইটি নিষিদ্ধ করারও দাবি ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এ পরিকল্পনামন্ত্রীর বিচারও দাবি করেন অনেকে।

২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বইটি নিয়ে জাতীয় সংসদেও তোলপাড় হয়। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সেদিন ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ দাঁড়িয়ে অনির্ধারিত আলোচনায় বলেন, এ কে খন্দকার ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ও অসত্য তথ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছেন। তারা বইটি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে তিনি এ বই লিখেছেন। অনির্ধারিত আলোচনায় সাবেক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ সংসদে বইটির প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল ও জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads