• শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৫
ads
কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের শীতল দ্বন্দ্বে দেবর-ভাবি

সংগৃহীত ছবি

রাজনীতি

জাপায় ভাঙনের আলামত

কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের শীতল দ্বন্দ্বে দেবর-ভাবি

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ২৪ জুলাই ২০১৯

দলীয় প্রধানের নানামুখী কর্মকাণ্ডে দেশের সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত রাজনৈতিক দল এইচএম এরশাদের ‘সরকারি রাজনৈতিক দল’ জাতীয় পার্টি। সামরিক শাসক এরশাদ জীবিত থাকতেই দলটি পাঁঁচ খণ্ডে খণ্ডিত হয়েছে। এরশাদ বিদায় নিলেও পার্টির নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব-বিবেধ রেখা মোছেনি। উল্টো পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, আধিপত্য বিস্তার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দলটিতে দেখা দিয়েছে আরেক দফা ভাঙনের আলামত।

পার্টির অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর, দেবর-ভাবির নেতৃত্বের ঠান্ডা লড়াই তপ্ত হয়ে উঠছে। রওশন এরশাদ পার্টির কো-চেয়ারম্যান, তিনি বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা আর এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের ছিলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এরশাদ বিদায়ের পর তিনিই চেয়ারম্যান। কিন্তু পরস্পরকে মানতে নারাজ রওশন-কাদের। পার্টির শীর্ষ দুই নেতার দ্বন্দ্বে বিভক্তি রেখা পড়েছে তাদের অনুসারী, সমর্থকের মধ্যেও।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ড. দিলারা চৌধুরী বাংলাদেশের খবরকে বলছেন, জাতীয় পার্টি যতবারই খণ্ডিত হয়েছে তার আগের আলামতের সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটের মিল রয়েছে। পরিস্থিতি চলমান থাকলে এরশাদের জাতীয় পার্টির ষষ্ঠ খণ্ড দেখতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক। যদিও পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, এরশাদের আদর্শকে ধারণ করে তার পার্টি অখণ্ড থাকবে।

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এইচএম এরশাদ আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ আরো কয়েকটি দল থেকে নেতা টেনে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠন করেছিলেন ‘সরকারি রাজনৈতিক দল’ জাতীয় পার্টি। নির্বাচন কমিশনে এইচএম এরশাদের নামে লাঙল প্রতীক নিবন্ধিত জাতীয় পার্টি। এ ছাড়া আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি) নিবন্ধিত বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে, নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নিবন্ধিত গরুর গাড়ি প্রতীক নিয়ে। নাজিউর রহমান মঞ্জুরের মৃত্যুর পর তার ছেলে ব্যএরপর এরশাদের দলে আরেক দফা ভাঙন ধরিয়ে নতুন জাতীয় পার্টি করেন কাজী জাফর আহমদ। তিনিও মারা গেছেন। তার দল নিবন্ধিত নয়, প্রতীকও নেই। এর বাইরে কাঁঠাল প্রতীকে তাসমিনা মতিনের নামেও জাতীয় পার্টির নিবন্ধন আছে। জাতীয় পার্টির নেতা এমএ মতিনের নেতৃত্বে এ অংশটি আলাদা হয়েছিল।

গত ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যু হয়। শেষ জীবনে দলের কাণ্ডারি হিসেবে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন এরশাদ। যাতে তার মৃত্যুর পর জাপা থাকে অখণ্ড। তখন থেকেই জাপায় রওশন এরশাদ অনুসারী বলে পরিচিত কয়েকজন সিনিয়র নেতা তা মেনে নিতে পারেননি। এরশাদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর পর কয়েক দিন এ বিষয়ে কোনো আলোচনা না হলেও তার কুলখানির পর বিষয়টি অনেকের নজরে আসে। যদিও এরশাদের মৃত্যুর পরদিন থেকেই জাপার বেশির ভাগ নেতাকর্মী জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে সম্বোধন করে আসছেন। গত ১৮ জুলাই জাপার বনানী কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করলে অসন্তুষ্ট হন রওশনপন্থিরা। ২০ জুলাই ভাবি রওশন এরশাদের মান ভাঙাতে তার গুলশানের বাসভবনে যান জিএম কাদের। এ সময় দেবরকে দোয়াও করে দেন রওশন এরশাদ। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা না পেরোতেই গত সোমবার গভীর রাতে জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান নন বলে একটি বিবৃতি পাঠান। যদিও বিবৃতির নিচে রওশন এরশাদ ও যেসব নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাতে তাদের স্বাক্ষর নেই। দেবর-ভাবির এমন টানাপড়নে অস্থিরতায় ভুগছে জাপার নেতাকর্মীরা। পার্টির চেয়ারম্যান, বিরোধী দলের নেতা ও রংপুর-৩ আসন থেকে দল থেকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তেই আসতে পারছে না দলটির শীর্ষ নেতারা।

এ বিষয়ে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, পার্টি চলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী। দলের চেয়ারম্যান জীবিত অবস্থায় তার অবর্তমানে দল পরিচালনা করার জন্য গঠনতন্ত্রের ২০/১-ক ধারা মোতাবেক তার অনুজ জিএম কাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন এবং বলেছেন তার অবর্তমানে জিএম কাদেরই হবেন পার্টির চেয়ারম্যান। একই গঠনতন্ত্রে রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের উপনেতা বানানো হয়েছে। উনি (রওশন) বিরোধী দলের নেতা হবেন-এটাই স্বাভাবিক। এখানে ভুল বোঝাবুঝির কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। পার্টির সবাইকে বলব, আসুন ঐক্যবদ্ধ হয়ে এরশাদের দলকে শক্তিশালী করে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাই।

পার্টির অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান, রওশন এরশাদ বিরোধী দলের নেতা। তাদের যৌথ নেতৃত্বেই পার্টি পরিচালিত হবে। এর বাইরে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করার জন্য পার্টির দু-একজন নেতা চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করছেন। দলের তৃণমূলে তাদের ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা নেই।

প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রফেসর দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে সবাই যদি জিএম কাদেরকে আমরা চেয়ারম্যান ঘোষণা করতাম তাহলে আমরা সবাই সম্মানিত হতাম।

সার্বিক বিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, রওশন এরশাদ আমার মাতৃতুল্য, আমার অভিভাবক। তার পরামর্শক্রমেই দল পরিচালিত হবে। রওশন এরশাদের বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উনি এমন বিবৃতি দিতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস হয় না। দুই দিন আগেও ভাবির বাসায় গিয়েছি। আবারো যাব। আমাদের মাঝে কোনো বিরোধ নেই। এদিকে রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads