• মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬
ads

রাজনীতি

ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছাত্রলীগের ঐতিহ্য ও সুনাম ফিরিয়ে আনাসহ নানা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব। সদ্য বাদপড়া কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের চাঁদাবাজি, পদবাণিজ্য, মাদকসেবন, টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের আদর্শবিরোধীদের পদ দেওয়া ও বিলাসী জীবনযাপনের অভিযোগের কারণে সংগঠনের ভাবমূর্তি যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সেখান থেকে সংগঠনকে বের করতে শুরু থেকেই নতুন নেতৃত্বকে বিশেষ দায়িত্বশীল হওয়ার চাপের মুখোমুখি থাকতে হচ্ছে। ভুলত্রুটি শুধরে সংগঠনের বিতর্কিত এবং নানা কারণে অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাকর্মীদের নিয়ে সংগঠনকে গতিশীল করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হতে হচ্ছে নতুন নেতৃত্বকে। মাত্র ১১ মাসের মধ্যে সংগঠনের সব কমিটি নির্বাচন করার চাপও থাকছে নতুন নেতৃত্বের সামনে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়াসহ নেতাকর্মীদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে নতুন নেতৃত্বকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে বলেও মনে করেন সংগঠনটির সাবেক নেতাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।

নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতির পদ থেকে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে গোলাম রাব্বানীকে গত শনিবার রাতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই রাতেই সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। দলের সর্বোচ্চ ফোরামের বৈঠক শেষে শোভন ও রাব্বানীর পদ হারানোর তথ্য গণমাধ্যমকে জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র জানায়, শোভন ও রাব্বানী কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১০ মাস আগেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাদের পদ হারালেন, যা দেশের ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠনের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তীব্র বিতর্কের মুখে তারা যেভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র তেরো মাসের মাথায় কেন্দ্রীয় কোনো সম্মেলন ছাড়া অব্যাহতি পেলেন তারা। দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক মাস পর থেকেই তারা নানা ইস্যুতে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা আর টাকার বিনিময়ে কমিটি গঠন তাদের আয়ের প্রধান উৎস বলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছেও অভিযোগ আছে। তাদের একের পর এক নেতিবাচক ঘটনায় বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। তারা দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র ১৩ মাসের মাথায় যত অভিযোগের মুখোমুখি হন, সংগঠনটির অতীতের কোনো কমিটিকে নিয়ে এত বেশি বিতর্ক হয়নি।

সূত্রমতে, রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে পদচ্যুত করাকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা দেখছেন ‘কড়া বার্তা’ হিসেবে। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় ছাত্রলীগের কেউ নিজেদের আইন-আদালতের ঊর্ধ্বে মনে করার সুযোগ যে নেই, তার প্রমাণ ওই দুজনের পদচ্যুতি। দলের প্রধান শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থান ওইসব নেতার কাজে লাগাম টানবে। তাই ভুলত্রুটি শুধরে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে সংগঠন। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠনকে আরো গতিশীল করতে পারবে নতুন নেতৃত্ব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে গড়া ছাত্রলীগের সংগঠনের হারানো ঐতিহ্য ও সুনাম ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট কিছু নির্দেশনা আছে। সংগঠনটির বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের চার নেতাকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংগঠনটিকে এগিয়ে নেবে নতুন নেতৃত্ব, এমন প্রত্যাশা অন্যদের। শোভন ও রাব্বানীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে খুশি সংগঠনটির নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। ছাত্রলীগের অভিভাবক শেখ হাসিনার নির্দেশে নতুন কমিটিতে যোগ্য ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ছাত্রনেতাদের ঠাঁই হবে বলে তারা আশাবাদী।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশে এই প্রথম শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তাদের  বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করানো হয়েছে। দেশের অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। শোভন-রাব্বানী দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। এ জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘যত চ্যালেঞ্জ আসুক, ছাত্রলীগকে এগিয়ে নিয়ে যাব। প্রধানমন্ত্রীর দেখানো নির্দেশনা অনুযায়ী ছাত্রলীগ এগিয়ে যাবে। যে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে ছাত্রলীগ, তা কাটিয়ে উঠবে। হাতে ১১ মাসের মতো যে সময় আছে, সেই সময়ের মধ্যে দেশের সব কমিটি দেওয়া হবে।’ তিনি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির বিষয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

সূত্র জানায়, ২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আড়াই মাস পর গত বছরের ৩১ জুলাই শোভনকে সভাপতি ও রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষিত হয়। গত বছরের ১১ ও ১২ মে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি সাতদিনের মধ্যে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে গত ১৫ এপ্রিল নির্দেশ দিলেও নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে শোভন-রাব্বানীর নেতৃত্ব ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। তাদের দ্বন্দ্বই এর মূলে বলে অনেকের ধারণা। নানা আলোচনা ও সমালোচনার পর পুরো কমিটি করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের চার নেতাকে। সম্মেলনের এক বছরেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মিলে কমিটি করতে না পারায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ওই চার নেতাকে এ দায়িত্ব দেন।

কেন্দ্রীয় সম্মেলনের এক বছর পর গত ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগ। এ কমিটিতে বিতর্কিতদের রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিতর্কিতদের বাদ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের ১৩ দিনের মাথায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মাত্র ১৯ জনের পদ শূন্য ঘোষণা করার কথা জানায় ছাত্রলীগ। গত ৭ সেপ্টেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত দলের মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় ছাত্রলীগের কমিটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উপস্থিত নেতাদের সমালোচনার একপর্যায়ে কমিটি ভেঙে দিতে বলেন শেখ হাসিনা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads