• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads

রাজনীতি

১৪ দলেও চলবে শুদ্ধি অভিযান

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ০১ নভেম্বর ২০১৯

দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযান শুধু আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতেই আটকে থাকছে না। ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের মহাজোট ও ১৪ দলের জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের টানা দুবারের সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকা অন্তত দুজনসহ বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য আছেন অভিযানের তালিকায়। দখল, মাদক, জুয়া ও চাঁদাবাজিসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শরিক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা আছেন গোয়েন্দা নজরদারিতে।

তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমলে নিয়ে সরকার বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। কারো কারো ব্যাংক হিসাবও তলব করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনেককে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শরিক দলের কয়েকজনের বিরুদ্ধে শিগগিরই কঠোর সিদ্ধান্ত আসছে বলেও সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র বাংলাদেশের খবরকে জানায়।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলেন, চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কোনো দল, গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক জোটের বিরুদ্ধে নয়। অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সব দলের পদধারীদের তালিকা সংগ্রহ করছে দুদক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সারা দেশের অসংখ্য নেতাকর্মী অভিযানের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে আছেন। আওয়ামী লীগ অভিযান শুরু করেছে নিজের ঘর থেকে, যেন রাজনৈতিক মিত্র ও জোটের শরিক কারো মধ্যে অভিযানের বিষয়ে বিন্দুমাত্র ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ না থাকে। আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাবে- এমন ঘোষণা দেয়। অভিযানের মধ্য দিয়ে সরকারের ওই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তবায়ন হচ্ছে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রমতে, মহাজোট ও ১৪ দলের শরিকদের বিরুদ্ধেও অভিযান প্রথমে চলবে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। পরে তৃণমূলেও অভিযান নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে দিয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা দলের অন্য সহযোগী সংগঠন হয়ে মূল দলে পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পাশাপাশি দলের তৃণমূল পর্যায়েও অভিযান বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার পক্ষে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে আজারবাইজানে যাওয়ার আগে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নির্দেশ দেন, তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি থেকেও বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার জন্য চিঠি দিতে।

দলীয় প্রধানের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অক্টোবর থেকে সারা দেশের সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কাছে দলকে বিতর্কমুক্ত করার কঠোর নির্দেশনাসংবলিত চিঠিও পাঠায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের তৃণমূলও দল থেকে বিতর্কিতদের বাদ দিতে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা। কেন্দ্রীয় সম্মেলন সামনে রেখে দলে অনুপ্রবেশ ও দুষ্কৃতকারীদের তালিকা তৈরি করেছে আওয়ামী লীগ এবং জেলা থেকে শুরু করে প্রতিটি সম্মেলনে তালিকা ধরে অনুপ্রবেশকারীদের দল থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার জানান ওবায়দুল কাদের।

সূত্র বলছে, আগামী ২০২০ সালের আগে যথাসম্ভব শুদ্ধ রাজনৈতিক দল চায় আওয়ামী লীগ। জাতির পিতা ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গড়া এ দলের নেতৃত্বে সরকার আগামী বছর তার জন্মশতবছর ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে রাষ্ট্রীয় বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবছর ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের পদে বিতর্কিতদের না রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। নতুন বছর শুরুর আগেই দলকে নতুন করে সাজিয়ে বিতর্কমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যেই শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশে দলে সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান চলছে।

একই সঙ্গে দলের নেতৃত্বে জোটের কোনো নেতা অনিয়ম করে থাকলে তা প্রশ্রয় না দেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্তও নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যে কারো অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান কঠোর। আওয়ামী লীগের বিতর্কিত, অভিযুক্ত ও দুর্নীতিতে জড়িত নেতাদের শুদ্ধি অভিযান এবং মূল দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর আসন্ন সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছেঁটে ফেলা হবে। আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনগুলোর পর বিতর্কিত ও নিষ্ক্রিয়দের মন্ত্রিসভা থেকেও সরিয়ে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক, দুইভাবেই কঠোর থাকার বার্তা দিয়েছেন। আগামী বছর শুরুর আগে জোটের শরিক দলগুলোর অভিযুক্ত নেতাদের অভিযান ও আইনের আওতায় আনা হবে। সরকারি দল, জোট ও সরকারের নীতিনির্ধারক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ করে ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে নানাভাবে উঠে আসে ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের নাম। তার প্রশ্রয়ে ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো গড়ে ওঠে বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন হয়। ওই ক্লাবের ক্যাসিনো থেকে মেনন প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন বলেও অভিযোগ ওঠে। শরিকদের দিকে শুদ্ধি অভিযান গড়ালে জোটের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যে কয়েকজন শুরুতেই ফেঁসে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাদের তালিকায় শীর্ষে আছে মেননের নাম।

ওয়ার্কার্স পার্টির সূত্র জানায়, গত ১৯ অক্টোবর রাশেদ খান মেননের দেওয়া বক্তব্যের (একাদশ সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি) জন্য ১৪ দলের পক্ষ থেকে তাকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়। শরিক দলের কাউকে লিখিত কারণ দর্শানোর বিষয়টি ১৪ দলের এখতিয়ারে নেই। বরং আলোচনার টেবিলেই এটির সমাধান সম্ভব ছিল বলে মনে করে ওয়ার্কার্স পার্টি। দলের ভেতর তাই মত ছিল, কারণ দর্শানোর চিঠির জবাব না দেওয়ার। কিন্তু রাশেদ খান মেনন জবাব দেওয়ার পক্ষে মত দেন। জোট ধরে রাখার স্বার্থে ও শুদ্ধি অভিযানের গন্তব্যের চিন্তা মাথায় রেখে শেষ পর্যন্ত মেনন জবাব দেন। তবে ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ১৪ দলের জোটের যে বৈঠকে রাশেদ খান মেননকে তার বক্তব্যের জন্য কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে ওয়ার্কার্স পার্টির কাউকে ডাকা হয়নি।

মহাজোটের শরিক দল বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব ও মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাহী বি চৌধুরী এবং তার স্ত্রী আশফাহ হকের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের একটি ব্যাংক হিসাবের অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তর গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে স্থগিত করা হয়েছে। বিদেশে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ৪ আগস্ট মাহী বি চৌধুরী ও তার স্ত্রী আশফাহ হককে তলবি নোটিশ পাঠায় দুদক।

ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযানের মধ্য দিয়ে নাম আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মহাজোটের আরেক শরিক জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩১ নম্বর ওয়ার্ড (সাধারণ) কাউন্সিলরের। রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়া চক্রে ক্যাসিনো চালুর সঙ্গে তিনি জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি। সেন্টু এখন বিদেশে পলাতক। তার বিষয়েও বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads